ঘটনার প্রেক্ষাপট
সাল ১৯৬৫। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর নেমে এসেছে এক অদ্ভুত শীতল নীরবতা। সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপে দুই দেশই শান্তি আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। স্থান নির্ধারিত হলো মধ্য এশিয়ার তাসখন্দ, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের উজবেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী। ভারতের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী—সেই ক্ষুদ্রকায়, শান্ত অথচ দৃঢ়চেতা মানুষটি, যাঁর "জয় জওয়ান, জয় কিষাণ" স্লোগান তখন গোটা দেশের মুখে মুখে। অন্যদিকে পাকিস্তানের নেতৃত্বে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান। জানুয়ারির কনকনে শীতে তাসখন্দের বাতাসে তখন বারুদের গন্ধের চেয়েও বেশি ভাসছিল চাপা উত্তেজনা আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ। দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে এলো সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
রহস্যের জাল
১৯৬৬ সালের ১০ই জানুয়ারি। ভারত ও পাকিস্তান ‘তাসখন্দ চুক্তি’ স্বাক্ষর করলো। দুই দেশের মধ্যে পুনরায় শান্তি স্থাপনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। সেই রাতে ভারতীয় শিবিরে ছিল উৎসবের মেজাজ। প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রী নিজেও বেশ খোশমেজাজে ছিলেন। রাত সাড়ে ন'টা নাগাদ তিনি নিজের বাসভবনে ফেরেন। পরিবারের সাথে ফোনে কথাও বলেন। জানান যে তিনি সুস্থ আছেন এবং পরদিন দেশে ফিরবেন। এরপর তিনি তাঁর রাঁধুনি জান মোহাম্মদের তৈরি করা হালকা রাতের খাবার খান এবং এক গ্লাস দুধ পান করেন, যা ছিল তাঁর প্রতিদিনের অভ্যাস।
কিন্তু এরপরই রাতের অন্ধকার যেন এক গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করে। রাত প্রায় ১টা বেজে ২৫ মিনিট নাগাদ শাস্ত্রীজির বুকে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়। তিনি কোনোমতে উঠে পাশের ঘরে থাকা তাঁর ব্যক্তিগত সচিবকে ডাকেন এবং চিকিৎসকের জন্য ছটফট করতে থাকেন। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক, ডঃ আর. এন. চুগ, ছুটে আসেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, এক বিদেশি ভূমিতে, এক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। সরকারিভাবে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘হৃদরোগে আক্রান্ত’ হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু এই সহজ ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারেনি অনেকেই, বিশেষ করে তাঁর পরিবার। পরদিন যখন প্রধানমন্ত্রীর মরদেহ দিল্লিতে আনা হলো, তখন এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য সামনে আসে। তাঁর স্ত্রী ললিতা শাস্ত্রী এবং পুত্র অনিল শাস্ত্রীর মতে, শাস্ত্রীর দেহ অস্বাভাবিক নীল হয়ে গিয়েছিল এবং তাতে সাদা সাদা ছোপ ছিল। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এটি বিষক্রিয়ার সুস্পষ্ট লক্ষণ। আরও সন্দেহ ঘনীভূত হয় যখন দেখা যায় যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন বা ভারত—কোনো দেশেই তাঁর দেহের পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত করা হয়নি। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর এমন আকস্মিক মৃত্যুর পর কেন এই আবশ্যকীয় পদক্ষেপটি এড়িয়ে যাওয়া হলো, সেই প্রশ্ন আজও ইতিহাসের আকাশে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ঝুলে আছে।
রহস্য আরও জটিল হয় যখন এই ঘটনার প্রধান দুই সাক্ষী—শাস্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডঃ আর. এন. চুগ এবং তাঁর পরিচারক রামনাথ—দু'জনেই কয়েক বছরের মধ্যে রহস্যজনক পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। কাকতালীয়? নাকি পরিকল্পিতভাবে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা? এই প্রশ্নগুলো ষড়যন্ত্রের তত্ত্বকে আরও উস্কে দেয়।
সত্যের উন্মোচন
সরকারিভাবে আজও লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগকেই দেখানো হয়। তৎকালীন সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অবনতির আশঙ্কায় কোনো গভীর তদন্তের পথে হাঁটেনি। বিভিন্ন সময়ে এই সংক্রান্ত সরকারি ফাইল প্রকাশের দাবি উঠলেও, তা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে।
তবে ষড়যন্ত্রের তত্ত্বগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কেউ সন্দেহের আঙুল তোলে পাকিস্তানের দিকে, কেউ আবার আমেরিকার সিআইএ-এর দিকে। এমনকি, সোভিয়েত কেজিবি-র ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনেকের মতে, শাস্ত্রী হয়তো এমন কিছু জেনে ফেলেছিলেন যা পরাশক্তিদের জন্য বিপজ্জনক ছিল, আর তাসখন্দ চুক্তি ছিল তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার একটি নিখুঁত অজুহাত মাত্র।
সত্যিটা কী? তাসখন্দের সেই হিমশীতল রাতে কি সত্যিই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রীর? নাকি তিনি ছিলেন এক গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার? তাঁর দেহের নীলাভ দাগ, ময়নাতদন্ত না হওয়া, এবং পরপর সাক্ষীদের রহস্যজনক মৃত্যু—এই সবকিছুর আড়ালে কোন সত্যি চাপা পড়ে আছে, তা হয়তো আর কোনোদিনই জানা যাবে না। ভারতের ইতিহাসের পাতা থেকে এক শান্তিদূতের বিদায় এভাবেই এক অমীমাংসিত রহস্যের চাদরে ঢেকে রইল।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)