বিষয়ের ভূমিকা
ভারতের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতা। আজ থেকে প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এক উন্নত ও সুপরিকল্পিত নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল। দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাসের এই প্রথম অধ্যায়টি আমাদের সেই প্রাচীন সময়ের স্থাপত্য, জীবনযাত্রা, কৃষি ব্যবস্থা এবং শিল্পকলা সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান করে। কেন এই সভ্যতাকে 'হরপ্পা সভ্যতা' বলা হয়? কিভাবে ধ্বংসস্তূপের নিচে ঢাকা পড়া এই বিস্ময়কর নগরীগুলি খুঁজে বের করা হলো? এই নিবন্ধে আমরা অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজব এবং NCERT সিলেবাস অনুযায়ী প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বিস্তারিত আলোচনা করব।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. সভ্যতার নামকরণ ও সময়কাল
সিন্ধু নদ ও তার উপনদীগুলির অববাহিকায় গড়ে ওঠার কারণে একে 'সিন্ধু সভ্যতা' বলা হয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রথা অনুযায়ী, সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত স্থান 'হরপ্পা'-র নামানুসারে একে হরপ্পা সভ্যতা বলা হয়। রেডিওকার্বন ডেটিং পদ্ধতি অনুসারে, এই সভ্যতার পরিপক্ক পর্যায়টি খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ অব্দের মধ্যে স্থায়ী ছিল।
২. কৃষিকাজ ও জীবিকা
হরপ্পার অধিবাসীরা কৃষিকাজে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। তাদের প্রধান খাদ্যশস্যের মধ্যে ছিল গম, যব, মসুর ডাল, ছোলা এবং তিল। গুজরাটের মতো স্থানগুলোতে ধান চাষের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
- সেচ ব্যবস্থা: আফগানিস্তানের শোর্তুগাই-তে খালের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে তারা উন্নত সেচ ব্যবস্থা ব্যবহার করত।
- পশুপালন: গরু, ভেড়া, ছাগল এবং মহিষ ছিল তাদের প্রধান পালিত পশু। কালিবঙ্গানে (রাজস্থান) লাঙল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
৩. উন্নত নগর পরিকল্পনা: মহেঞ্জোদারো
মহেঞ্জোদারো ছিল হরপ্পা সভ্যতার সবচেয়ে পরিকল্পিত নগর। এই নগরটিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- দুর্গ (Citadel): এটি নগরের পশ্চিম দিকে একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্মিত ছিল। এখানে প্রশাসনিক ভবন এবং শস্যাগার ছিল।
- নিম্ন শহর (Lower Town): এটি ছিল সাধারণ মানুষের বসবাসের স্থান। এটি আয়তনে অনেক বড় ছিল এবং চারপাশ থেকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল।
- নিকাশী ব্যবস্থা: হরপ্পা সভ্যতার সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর ড্রেনেজ সিস্টেম বা নিকাশী ব্যবস্থা। প্রতিটি বাড়ির নর্দমা রাস্তার ধারের মূল নর্দমার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এগুলি পোড়া ইট বা পাথর দিয়ে ঢাকা থাকত।
৪. সামাজিক জীবন ও বৈচিত্র্য
প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন যে হরপ্পা সমাজে সম্ভবত তিনটি স্তর ছিল। উচ্চবিত্ত শাসক গোষ্ঠী দুর্গে বাস করত, মধ্যবিত্ত বণিকেরা নিম্ন শহরে এবং সাধারণ শ্রমিকেরা শহরের প্রান্তে বাস করত।
- সমাধি (Burials): হরপ্পাবাসীরা মৃতদেহ সমাধিস্থ করত। কিছু সমাধিতে মৃতদেহের সাথে মৃৎপাত্র এবং গহনা পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় তারা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করত।
- বিলাসিতা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী: প্রত্নতাত্ত্বিকরা দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস (যেমন চাকতি, সূঁচ) এবং বিলাসবহুল জিনিস (যেমন ফায়েন্সের তৈরি পাত্র) আলাদা করেছেন।
৫. শিল্প ও কারুশিল্প (Craft Production)
চানহুদাড়ো ছিল পুঁতি তৈরির প্রধান কেন্দ্র। এখানে কার্নেলিয়ান, জ্যাসপার, স্ফটিক এবং তামা, সোনা ইত্যাদি দিয়ে নানা রঙের পুঁতি তৈরি হতো।
- সীলমোহর (Seals): স্টিয়াটাইট (Steatite) নামক নরম পাথর দিয়ে সীলমোহর তৈরি হতো। এই সীলমোহরে প্রাণীর প্রতিকৃতি ও লিপি খোদাই করা থাকত, যা বাণিজ্যের কাজে ব্যবহার হতো।
- ওজন ও পরিমাপ: বিনিময়ের জন্য তারা চ্যাট (Chert) নামক পাথর দিয়ে তৈরি ঘনকাকৃতি বাটখারা ব্যবহার করত।
৬. বাণিজ্যের প্রসার
হরপ্পাবাসীদের সাথে সুদূর মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক), ওমান এবং বাহরাইনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। মেসোপটেমিয়ার লিপিতে সিন্ধু অঞ্চলকে 'মেলুহা' (Meluhha) বলা হয়েছে। তারা প্রধানত তামা, সোনা, ল্যাপিস লাজুলি (নীলকান্তমণি) এবং শাঁখ আমদানি করত।
৭. সভ্যতার অবসান বা পতন
খ্রিষ্টপূর্ব ১৯০০ অব্দের পর এই উন্নত সভ্যতার পতন শুরু হয়। পতনের কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মতভেদ রয়েছে:
- অতিরিক্ত বন্যা বা নদীর গতিপথ পরিবর্তন।
- জলবায়ু পরিবর্তন ও বনভূমি ধ্বংস।
- আর্যদের আক্রমণ (যদিও এই তথ্যটি বর্তমানে বির্তকিত)।
- ভূমিকম্প বা মহামারীর প্রকোপ।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: হরপ্পা সভ্যতার লিপিকে কেন 'রহস্যময়' বলা হয়?
উত্তর: হরপ্পা সভ্যতার লিপি আজ পর্যন্ত কেউ পাঠোদ্ধার করতে পারেনি। এটি বাম দিক থেকে ডান দিকে নয়, বরং ডান দিক থেকে বাম দিকে লেখা হতো এবং এতে প্রায় ৩৭৫ থেকে ৪০০ টি চিহ্ন ছিল। এই কারণেই একে রহস্যময় লিপি বলা হয়।
প্রশ্ন ২: মহেঞ্জোদারোর 'বিশাল স্নানাগার' (Great Bath)-এর বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: এটি ছিল একটি আয়তাকার জলাশয় যা দুর্গের মধ্যে অবস্থিত ছিল। এর চারদিকে বারান্দা ছিল এবং মেঝেটি বিটুমিন দিয়ে প্লাস্টার করা হয়েছিল যাতে জল চুঁইয়ে না যায়। এটি সম্ভবত ধর্মীয় বা বিশেষ সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো।
প্রশ্ন ৩: হরপ্পাবাসীরা কি ঘোড়ার ব্যবহার জানত?
উত্তর: হরপ্পা সভ্যতায় ঘোড়ার ব্যবহারের নিশ্চিত প্রমাণ খুব কম। তবে সুরকোটাদায় (গুজরাট) ঘোড়ার হাড়ের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। তবুও বলা হয় যে, ঘোড়া তাদের দৈনন্দিন জীবনে গরুর মতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
সারসংক্ষেপ
- হরপ্পা সভ্যতা ছিল ব্রোঞ্জ যুগের একটি উন্নত নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা।
- মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা ছিল এর দুটি প্রধান কেন্দ্র।
- তাদের উন্নত নিকাশী ব্যবস্থা আজও স্থপতিদের অবাক করে।
- বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।
- প্রায় ১৮০০-১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে এই সভ্যতার অবসান ঘটে এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির সূচনা হয়।