বিষয়ের ভূমিকা

গণতন্ত্র মানে কেবল জনগণের দ্বারা সরকার নির্বাচন করা নয়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত শাসকদেরও কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন এবং পদ্ধতির মধ্য দিয়ে চলতে হয়। তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কাজ করতে হয়। নবম শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চতুর্থ অধ্যায় 'সংস্থার কার্যপ্রণালী' (Working of Institutions) আমাদের শেখায় যে কীভাবে একটি দেশের সরকার গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সেই সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে কার্যকর করা হয়। এই অধ্যায়টি মূলত ভারতের তিনটি প্রধান গণতান্ত্রিক অঙ্গ—আইন বিভাগ (Legislature), শাসন বিভাগ (Executive) এবং বিচার বিভাগ (Judiciary)—এর কার্যকারিতা এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করে। এই নিবন্ধে আমরা অত্যন্ত সহজ ভাষায় এবং বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব কীভাবে আমাদের দেশ পরিচালিত হয়।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. একটি সরকারি আদেশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া

ভারতের শাসনব্যবস্থায় কোনো একটি বড় সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়, তা বোঝার জন্য এনসিইআরটি বইতে ১৯৯০ সালের 'অফিস মেমোরেন্ডাম' (Office Memorandum)-এর উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। এটি ছিল ২৭% সরকারি চাকরি 'সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে অনগ্রসর শ্রেণি' (SEBC)-র জন্য সংরক্ষণের একটি আদেশ।

  • মণ্ডল কমিশন: ১৯৭৯ সালে বি.পি. মণ্ডলের নেতৃত্বে দ্বিতীয় অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন ১৯৮০ সালে তাদের রিপোর্ট জমা দেয় এবং ওবিসি (OBC) সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষণের সুপারিশ করে।
  • রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত: দীর্ঘ সময় পর ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে জনতা দল তাদের ইশতেহারে এই সুপারিশ কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দেয়। নির্বাচনে জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী ভি.পি. সিং এটি কার্যকর করার উদ্যোগ নেন।
  • সংসদ ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা: রাষ্ট্রপতির ভাষণে এটি উল্লিখিত হয় এবং মন্ত্রিসভা এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়।
  • বিতর্ক ও বিচার বিভাগ: এই আদেশের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রবল প্রতিবাদ শুরু হয়। সুপ্রিম কোর্টে 'ইন্দিরা সাহানি বনাম ভারত সরকার' মামলা দায়ের করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে এই আদেশকে বৈধতা দেয়।

২. রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা কেন?

একটি দেশে সুশাসন বজায় রাখার জন্য কিছু নির্দিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয়। কোনো এক জন ব্যক্তি একনায়কের মতো সব সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

  • প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চিত করে যে সমস্ত সিদ্ধান্ত আলোচনার মাধ্যমে এবং নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে নেওয়া হয়েছে।
  • এতে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়, কারণ এটি বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে যাচাই করা হয়।
  • প্রধান তিনটি বিভাগ: আইন বিভাগ (আইন তৈরি করে), শাসন বিভাগ (আইন কার্যকর করে) এবং বিচার বিভাগ (আইন ভঙ্গ হলে বিচার করে এবং বিবাদ মেটায়)।

৩. সংসদ (Parliament)

ভারতের সংসদ হলো সর্বোচ্চ আইনসভা। ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং দুটি কক্ষ নিয়ে এটি গঠিত।

  • লোকসভা (Lower House): এটি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত। লোকসভার ক্ষমতা অনেক বেশি, বিশেষ করে আর্থিক ক্ষেত্রে এবং সরকারকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে।
  • রাজ্যসভা (Upper House): এটি রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত। এটি স্থায়ী কক্ষ, কারণ এটি কখনোই পুরোপুরি বিলুপ্ত হয় না।
  • লোকসভার শ্রেষ্ঠত্ব: কেন লোকসভা বেশি শক্তিশালী? কারণ, সাধারণ আইনের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য হলে যৌথ অধিবেশনে লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতই সাধারণত প্রাধান্য পায়। এছাড়া, অর্থ বিল (Money Bill) কেবল লোকসভাতেই পেশ করা যায়।

৪. রাজনৈতিক ও স্থায়ী নির্বাহী (Executive)

সরকারের যে অংশটি নীতিগুলো কার্যকর করে, তাদের নির্বাহী বা শাসন বিভাগ বলা হয়। এটি দুই প্রকার:

  • রাজনৈতিক নির্বাহী: এরা জনগণের দ্বারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত হন (যেমন: প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরা)। বড় বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত এরাই নেন।
  • স্থায়ী নির্বাহী (আমলাতন্ত্র): এরা দীর্ঘ সময়ের জন্য নিযুক্ত হন (যেমন: IAS, IPS অফিসার)। এরা রাজনৈতিক নির্বাহীদের সাহায্য করেন এবং প্রতিদিনের প্রশাসনিক কাজ সামলান। যদিও আমলারা বেশি শিক্ষিত হতে পারেন, তবুও গণতন্ত্রে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের (মন্ত্রী) সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়।

৫. প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী পরিষদ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারের প্রকৃত প্রধান। তিনি লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হন।

  • মন্ত্রী পরিষদ (Council of Ministers): এতে সাধারণত ৬০ থেকে ৮০ জন মন্ত্রী থাকেন। এর মধ্যে 'ক্যাবিনেট মন্ত্রী'রা হলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
  • প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা: তিনি মন্ত্রিসভার মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করেন, বিভিন্ন দপ্তরের কাজ তদারকি করেন এবং মন্ত্রীদের মধ্যে দপ্তর বণ্টন করেন। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে পুরো মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে হয়।

৬. রাষ্ট্রপতি (The President)

রাষ্ট্রপতি হলেন ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান (Head of the State)। তাঁর পদটি অনেকটা ব্রিটেনের রানির মতো অলঙ্কারিক।

  • ভারতের সমস্ত সরকারি কাজ রাষ্ট্রপতির নামে সম্পন্ন হয়।
  • তিনি সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন না, বরং সংসদ সদস্য (MP) এবং বিধানসভা সদস্যদের (MLA) দ্বারা নির্বাচিত হন।
  • তিনিই সশস্ত্র বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার। কোনো বিল আইন হওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়।

৭. বিচার বিভাগ (The Judiciary)

ভারতের বিচার ব্যবস্থা সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট এবং জেলা আদালত নিয়ে গঠিত। ভারতের বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং সংহত।

  • বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা (Judicial Review): সুপ্রিম কোর্ট সংসদের তৈরি করা যে কোনো আইনের সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষা করতে পারে।
  • মৌলিক অধিকার রক্ষা: বিচার বিভাগ নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে।
  • জনস্বার্থ মামলা (PIL): যে কোনো সাধারণ মানুষ যদি দেখেন যে জনস্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে, তবে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: লোকসভা কেন রাজ্যসভার চেয়ে বেশি শক্তিশালী?
উত্তর: লোকসভার সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। আর্থিক বিল এবং সরকারের ওপর আস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে লোকসভার ক্ষমতা একচ্ছত্র। তাই গণতান্ত্রিক কাঠামোয় লোকসভাকে অধিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন ২: ক্যাবিনেট মিশন বা ক্যাবিনেট মন্ত্রিসভা কী?
উত্তর: মন্ত্রী পরিষদের একটি ছোট দল যেখানে ২০-২৫ জন শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী থাকেন। সরকারের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত মূলত এই ক্যাবিনেট মিটিংয়েই নেওয়া হয়।

প্রশ্ন ৩: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেন জরুরি?
উত্তর: বিচার বিভাগ যদি রাজনৈতিক নির্বাহীদের অধীনে থাকতো, তবে নিরপেক্ষ বিচার পাওয়া অসম্ভব হতো। সংবিধানের ব্যাখ্যা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য।

সারসংক্ষেপ

  • গণতন্ত্রে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ পরস্পরের ওপর নজরদারি করে।
  • সংসদ আইন প্রণয়ন করে, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা দেশ পরিচালনা করে এবং বিচার বিভাগ সংবিধান রক্ষা করে।
  • এই তিনটির ভারসাম্যই একটি সফল গণতন্ত্রের চাবিকাঠি।
  • মণ্ডল কমিশনের উদাহরণ থেকে বোঝা যায় যে একটি বড় সিদ্ধান্তে সরকারের সমস্ত বিভাগের ভূমিকা থাকে।