ভারতবর্ষ একটি বিশাল দেশ এবং এর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য সত্যিই বিস্ময়কর। নবম শ্রেণির ভূগোলের পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা ভারতের প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। আমাদের চারপাশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য এই উদ্ভিদ এবং প্রাণীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারত বিশ্বের ১২টি প্রধান জৈব-বৈচিত্র্যপূর্ণ (Mega-biodiversity) দেশের মধ্যে একটি। কেন ভারত এত বৈচিত্র্যময় এবং এখানকার বনের ধরনগুলো কেমন, তা আমরা এই ব্লগে খুব সহজভাবে বুঝে নেব।
বিষয়ের ভূমিকা
প্রাকৃতিক উদ্ভিদ বলতে সেই সমস্ত গাছপালাকে বোঝায় যা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে। একে 'অক্ষত উদ্ভিদ' (Virgin Vegetation) বলা হয়। ভারতের এই উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈচিত্র্যের প্রধান কারণ হলো এদেশের বিশাল জলবায়ু এবং ভূ-প্রকৃতির পার্থক্য। আমাদের দেশে প্রায় ৪৭,০০০ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৯০,০০০ প্রজাতির প্রাণী পাওয়া যায়। এই অধ্যায়টি আমাদের শেখায় কীভাবে আমাদের চারপাশের বাস্তুসংস্থান (Ecosystem) কাজ করে এবং কেন বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা জরুরি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
ভারতের উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্য মূলত দুটি প্রধান উপাদানের ওপর নির্ভর করে: ত্রাণ বা ভূ-প্রকৃতি (Relief) এবং জলবায়ু (Climate)। নিচে এগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের কারণসমূহ
- ভূমি (Land): ভূমির প্রকৃতি সরাসরি উদ্ভিদের ওপর প্রভাব ফেলে। সমতল ভূমি সাধারণত কৃষিকাজের জন্য ব্যবহৃত হয়, অন্যদিকে অসমতল ভূমিতে বনভূমি এবং তৃণভূমি দেখা যায় যা বন্যপ্রাণীদের আশ্রয়স্থল।
- মৃত্তিকা (Soil): বিভিন্ন ধরনের মাটি বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদের জন্ম দেয়। যেমন—মরুভূমির বালুকাময় মাটিতে ক্যাকটাস জন্মায়, আবার নদীর বদ্বীপ অঞ্চলের পলিমাটিতে ম্যানগ্রোভ অরণ্য দেখা যায়।
- তাপমাত্রা (Temperature): হিমালয়ের উঁচু অংশে যেখানে তাপমাত্রা খুব কম, সেখানে উদ্ভিদের ধরন সমতল ভূমির তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা।
- সূর্যালোক (Photoperiod): যে অঞ্চলে সূর্যালোক বেশি সময় ধরে থাকে, সেখানে গাছপালা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
- বৃষ্টিপাত (Precipitation): ভারতে মূলত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর কারণে বৃষ্টিপাত হয়। অধিক বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে ঘন বন এবং কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে কন্টকময় ঝোপঝাড় দেখা যায়।
২. প্রাকৃতিক উদ্ভিদের প্রকারভেদ
ভারতের জলবায়ু এবং বৃষ্টিপাতের ওপর ভিত্তি করে বনভূমিকে পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
- উষ্ণমণ্ডলীয় চিরহরিৎ অরণ্য (Tropical Evergreen Forests): এই অরণ্যগুলো যেখানে ২০০ সেমির বেশি বৃষ্টিপাত হয় সেখানে দেখা যায় (যেমন—পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, লাক্ষাদ্বীপ, আন্দামান ও নিকোবর)। এখানকার গাছগুলোর উচ্চতা ৬০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই বনগুলো সবসময় সবুজ থাকে কারণ গাছগুলো একসাথে পাতা ঝরায় না। প্রধান গাছ: এবনি, মেহগনি, রোজউড।
- উষ্ণমণ্ডলীয় পর্ণমোচী অরণ্য (Tropical Deciduous Forests): এটি ভারতের সবচেয়ে বিস্তৃত বনভূমি। এদের 'মৌসুমি অরণ্য'ও বলা হয়। ৭০-২০০ সেমি বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে এগুলো দেখা যায়। গ্রীষ্মের শুরুতে গাছগুলো ৬-৮ সপ্তাহের জন্য পাতা ঝরিয়ে দেয়। উদাহরণ: সেগুন, শাল, চন্দন।
- উষ্ণমণ্ডলীয় কন্টকময় অরণ্য ও ঝোপ (Tropical Thorn Forests and Scrubs): যেখানে ৭০ সেমির কম বৃষ্টি হয় (যেমন—গুজরাট, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ)। এখানকার গাছের পাতা ছোট এবং শিকড় মাটির অনেক গভীরে থাকে জল সংগ্রহের জন্য। প্রধান গাছ: বাবলা, ক্যাকটাস, খেজুর।
- পার্বত্য অরণ্য (Montane Forests): উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এখানে উদ্ভিদের পরিবর্তন ঘটে। ১০০০-২০০০ মিটার উচ্চতায় আর্দ্র নাতিশীতোষ্ণ বন দেখা যায়, আবার ৩০০০ মিটারের ওপরে আলপাইন উদ্ভিদ দেখা যায়।
- ম্যানগ্রোভ অরণ্য (Mangrove Forests): উপকূলীয় জোয়ার-ভাটা যুক্ত অঞ্চলে এই বন দেখা যায়। সুন্দরবন হলো পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য। এখানকার প্রধান গাছ 'সুন্দরী'।
৩. বন্যপ্রাণী (Wildlife)
উদ্ভিদের মতো ভারতের প্রাণীকুলও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভারতে বিশ্বের প্রায় ১৩% পাখি এবং ১২% মাছের প্রজাতি বাস করে। হাতি, একশৃঙ্গ গণ্ডার, সিংহ এবং বাঘ হলো ভারতের গর্ব। গুজরাটের গির অরণ্য হলো এশীয় সিংহের শেষ প্রাকৃতিক আবাসস্থল। বাঘ ও সিংহ উভয়ই পাওয়া যায় এমন একমাত্র দেশ হলো ভারত।
৪. বাস্তুসংস্থান ও সংরক্ষণ (Ecosystem and Conservation)
প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। মানুষ তার নিজের স্বার্থে গাছপালা কাটা এবং পশু শিকার করার ফলে এই ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। বিপন্ন প্রজাতিগুলোকে রক্ষা করার জন্য ভারত সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- জীবমণ্ডল সংরক্ষণ (Biosphere Reserves): ভারতে ১৮টি জীবমণ্ডল সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে (যেমন—সুন্দরবন, নীলগিরি)।
- বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন: ১৯৭২ সালে এই আইনটি কার্যকর করা হয়।
- জাতীয় উদ্যান ও অভয়ারণ্য: ১০৩টি জাতীয় উদ্যান এবং ৫৩৫টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য তৈরি করা হয়েছে প্রাণীদের নিরাপদ আবাসের জন্য।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: 'অক্ষত উদ্ভিদ' (Virgin Vegetation) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: যে সমস্ত উদ্ভিদ মানুষের কোনো প্রকার সাহায্য বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে এবং দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তাদের অক্ষত উদ্ভিদ বলা হয়।
প্রশ্ন ২: চিরহরিৎ অরণ্য কেন সবসময় সবুজ দেখায়?
উত্তর: চিরহরিৎ অরণ্যে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ থাকে। এই গাছগুলো বছরের আলাদা আলাদা সময়ে তাদের পাতা ঝরায়, তাই অরণ্যটি কোনো সময়ই সম্পূর্ণ বৃক্ষহীন বা ন্যাড়া হয় না। ফলে সারা বছরই এটি সবুজ দেখায়।
প্রশ্ন ৩: ভারতে বাঘ ও সিংহের প্রাকৃতিক আবাসস্থল কোথায়?
উত্তর: ভারতের মধ্যপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের অরণ্যে বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। অন্যদিকে, গুজরাটের গির অরণ্য হলো সিংহের একমাত্র প্রাকৃতিক বাসস্থান।
সারসংক্ষেপ
- ভারত ১২টি মেগা-বায়োডাইভার্সিটি দেশের অন্যতম।
- জলবায়ু, বৃষ্টিপাত এবং মাটির ভিন্নতার কারণে উদ্ভিদের বৈচিত্র্য ঘটে।
- প্রধান পাঁচ ধরনের বনভূমি হলো—চিরহরিৎ, পর্ণমোচী, কন্টকময়, পার্বত্য এবং ম্যানগ্রোভ।
- পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা আমাদের পরম দায়িত্ব।
- সরকার বন্যপ্রাণী রক্ষায় জাতীয় উদ্যান এবং বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ তৈরি করেছে।