বিষয়ের ভূমিকা
ভারতের ইতিহাসে দিল্লি শহরটি সর্বদা এক কেন্দ্রীয় গুরুত্ব পালন করে এসেছে। কিন্তু আপনি কি জানেন যে দ্বাদশ শতাব্দীর আগে দিল্লি কোনো প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল না? এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব কীভাবে দিল্লি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীতে পরিণত হল এবং কীভাবে দিল্লির সুলতানরা উপমহাদেশের একটি বিশাল অংশ জুড়ে তাদের শাসন বিস্তার করেছিলেন। সপ্তম শ্রেণির NCERT ইতিহাসের এই অধ্যায়টি আমাদের দিল্লির তোমর রাজপুত থেকে শুরু করে লোদি বংশ পর্যন্ত এক রোমাঞ্চকর যাত্রার কথা শোনায়।
দিল্লি প্রথম তোমর রাজপুতদের অধীনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এরপর দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আজমিরের চৌহানদের (চাহমান) কাছে তোমররা পরাজিত হয়। তোমর এবং চৌহানদের অধীনেই দিল্লি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। এখানে অনেক সমৃদ্ধ জৈন ব্যবসায়ী বাস করতেন যারা অনেক মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এখানে 'দেহলিওয়াল' নামে পরিচিত মুদ্রাও তৈরি করা হতো, যার প্রচলন ছিল ব্যাপক।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. দিল্লির সুলতানদের সম্পর্কে আমরা কীভাবে জানতে পারি?
দিল্লির সুলতানদের সম্পর্কে জানার জন্য প্রধান উৎস হলো শিলালিপি, মুদ্রা এবং স্থাপত্য। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো 'তারিখ' (একবচন) বা 'তওয়ারিখ' (বহুবচন), যা ফার্সি ভাষায় লেখা হয়েছিল। ফার্সি ছিল দিল্লির সুলতানদের প্রশাসনের দাপ্তরিক ভাষা।
- তওয়ারিখের লেখকরা: তওয়ারিখের লেখকরা ছিলেন শিক্ষিত মানুষ, যেমন সচিব, প্রশাসক, কবি এবং দরবারী। তারা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করতেন, তেমনি সুলতানদের সুশাসনের গুরুত্ব সম্পর্কে পরামর্শ দিতেন।
- লেখকদের সীমাবদ্ধতা: তওয়ারিখের লেখকরা সাধারণত শহরে (বিশেষ করে দিল্লিতে) বাস করতেন, গ্রামে নয়। তারা প্রায়শই সুলতানদের কাছ থেকে পুরস্কার পাওয়ার আশায় তাদের ইতিহাস লিখতেন। তারা প্রায়ই জন্মগত অধিকার এবং লিঙ্গ বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে একটি আদর্শ সামাজিক ব্যবস্থা রক্ষার পক্ষে মত দিতেন।
- রাজিয়া সুলতানা (১২৩৬-১২৪০): ১২৩৬ সালে সুলতান ইলতুতমিসের কন্যা রাজিয়া দিল্লির সিংহাসনে বসেন। সেই যুগের ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ স্বীকার করেছিলেন যে রাজিয়া তার ভাইদের চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য এবং সক্ষম ছিলেন। কিন্তু একজন নারী শাসক হিসেবে তাকে মেনে নিতে দরবারীদের কষ্ট হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ১২৪০ সালে তাকে সিংহাসনচ্যুত করা হয়।
২. সুলতানি সাম্রাজ্যের বিস্তার: গ্যারিসন শহর থেকে সাম্রাজ্য
ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দিল্লির সুলতানদের নিয়ন্ত্রণ মূলত 'গ্যারিসন শহর' (যেখানে সৈন্যরা বাস করত) এবং দুর্গ সংলগ্ন এলাকাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সুলতানদের পক্ষে বাংলার বা সিন্ধুর মতো দূরবর্তী প্রদেশগুলো নিয়ন্ত্রণ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। কারণ যুদ্ধ, বিদ্রোহ এবং খারাপ আবহাওয়া যোগাযোগের পথগুলো বিচ্ছিন্ন করে দিত।
- অভ্যন্তরীণ সীমান্ত: সুলতানরা প্রথমে গ্যারিসন শহরের আশেপাশের এলাকাগুলোতে (হিন্টারল্যান্ড) নিজেদের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করার চেষ্টা করেন। গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল থেকে বনভূমি পরিষ্কার করে কৃষকদের জমি দেওয়া হয় এবং কৃষি প্রসারে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
- বহিরাগত সীমান্ত: সুলতানি সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় পর্যায়ের বিস্তার ঘটে আলাউদ্দিন খলজি এবং মুহাম্মদ বিন তুঘলকের আমলে। তারা দক্ষিণ ভারতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং প্রচুর হাতি, ঘোড়া, দাস এবং মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করেন।
৩. দিল্লির রাজবংশসমূহ
দিল্লি সুলতানিতে প্রধানত পাঁচটি রাজবংশ শাসন করেছিল:
- প্রারম্ভিক তুর্কি শাসক (১২০৬-১২৯০): কুতুবুদ্দিন আইবক, ইলতুতমিস এবং গিয়াসুদ্দিন বলবনের মতো শাসকরা এই বংশের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
- খলজি বংশ (১২৯০-১৩২০): জালালুদ্দিন খলজি এবং আলাউদ্দিন খলজি।
- তুঘলক বংশ (১৩২০-১৪১৪): গিয়াসুদ্দিন তুঘলক, মুহাম্মদ বিন তুঘলক এবং ফিরোজ শাহ তুঘলক।
- সৈয়দ বংশ (১৪১৪-১৪৫১): খিজির খান এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
- লোদি বংশ (১৪৫১-১৫২৬): বহলুল লোদি এবং ইব্রাহিম লোদি। ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করার মাধ্যমে সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে।
৪. প্রশাসন এবং একত্রীকরণ
দিল্লি সুলতানির মতো একটি বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য দক্ষ প্রশাসক ও সুবেদারদের প্রয়োজন ছিল। ইলতুতমিস উচ্চপদস্থ অভিজাতদের পরিবর্তে 'বন্দগান' বা বিশেষ ক্রীতদাসদের সামরিক কাজের জন্য নিয়োগ করতে পছন্দ করতেন। এই ক্রীতদাসদের ফার্সি ভাষায় 'বন্দগান' বলা হতো।
- ইকতা ব্যবস্থা: খলজি এবং তুঘলক শাসকরা সামরিক সেনাপতিদের বিভিন্ন অঞ্চলের শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ করতেন। এই জমিগুলোকে বলা হতো 'ইকতা' এবং এর মালিককে বলা হতো 'ইকতারদার' বা 'মুক্তি'।
- মুক্তির দায়িত্ব: মুক্তিদের প্রধান কাজ ছিল সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এবং তাদের ইকতার মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। এর বিনিময়ে তারা সংগৃহীত রাজস্ব থেকে নিজেদের বেতন নিতেন এবং সৈন্যদের বেতন দিতেন।
- রাজস্ব ব্যবস্থা: সুলতানরা কৃষি (খরাজ), গবাদি পশু এবং বাড়ির ওপর কর আরোপ করতেন। আলাউদ্দিন খলজির সময় রাজস্ব নির্ধারণ ও সংগ্রহের দায়িত্ব সরাসরি রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসা হয়েছিল।
৫. মোঙ্গল আক্রমণ ও সুলতানদের প্রতিরক্ষা নীতি
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মোঙ্গলরা ট্রান্সঅক্সিয়ানা (আধুনিক উজবেকিস্তান) আক্রমণ করে এবং শীঘ্রই দিল্লি সুলতানিতেও তাদের ছায়া পড়ে। আলাউদ্দিন খলজি এবং মুহাম্মদ বিন তুঘলকের আমলে দিল্লিতে মোঙ্গল আক্রমণ সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়।
- আলাউদ্দিন খলজির কৌশল: তিনি একটি বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং সৈন্যদের থাকার জন্য 'সিরি' নামে একটি নতুন গ্যারিসন শহর নির্মাণ করেন। তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করেন যাতে সৈন্যরা অল্প বেতনে চলতে পারে।
- মুহাম্মদ বিন তুঘলকের কৌশল: তিনি দিল্লি-ই-কুহনার বাসিন্দাদের সরিয়ে তাদের দৌলতাবাদে (দাক্ষিণাত্য) পাঠিয়ে দেন এবং সেখানে রাজধানী স্থানান্তর করেন। তিনি টোকেন কারেন্সি বা প্রতীকী মুদ্রার প্রবর্তন করেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. তওয়ারিখের লেখকরা কেন সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে খুব কম লিখেছেন?
উত্তর: তওয়ারিখের লেখকরা মূলত সুলতানদের দরবারে থাকতেন এবং তারা রাজাদের খুশি করে পুরস্কার পাওয়ার আশায় লিখতেন। তাদের মনোযোগ ছিল রাজকীয় ঘটনাবলী, যুদ্ধ এবং সুলতানদের গুণগানের ওপর। সাধারণ কৃষকদের বা সাধারণ মানুষের জীবনের সমস্যাগুলো তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল না।
২. ইকতা ব্যবস্থা কী ছিল?
উত্তর: দিল্লি সুলতানির অধীনে সামরিক সেনাপতিদের শাসনের জন্য যে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা জমি বরাদ্দ করা হতো, তাকেই 'ইকতা' বলা হতো। এই ইকতা বা জমির মালিকদের বলা হতো 'ইকতারদার' বা 'মুক্তি'। তাদের কাজ ছিল রাজস্ব সংগ্রহ করা এবং সুলতানকে সামরিক সাহায্য প্রদান করা।
৩. আলাউদ্দিন খলজি কীভাবে বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন?
উত্তর: আলাউদ্দিন খলজি দিল্লির বাজারে প্রতিটি জিনিসের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। খাদ্যশস্য, কাপড় এবং গবাদি পশুর দাম নির্দিষ্ট ছিল। ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো এবং সরকারি আধিকারিকরা কঠোরভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ করতেন যাতে কেউ বেশি দাম না নিতে পারে।
সারসংক্ষেপ
- দিল্লি তোমর ও চৌহানদের আমলে প্রথম একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়।
- তওয়ারিখ ছিল ফার্সি ভাষায় লেখা ইতিহাস যা সুলতানদের আমল সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।
- রাজিয়া সুলতানা ছিলেন দিল্লির প্রথম এবং একমাত্র নারী সুলতান।
- ইকতা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশাল সাম্রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনা করা হতো।
- মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য আলাউদ্দিন খলজি এবং মুহাম্মদ বিন তুঘলক বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন।
- ১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দিল্লি সুলতানির সমাপ্তি ঘটে।