প্রেম এক অদ্ভুত অনুভূতি, তাই না? এই অনুভূতির জন্য মানুষ কত কী-ই না করে! কেউ ভালোবাসার মানুষের জন্য তাজমহল গড়ে, কেউ পাহাড়ের চূড়া থেকে তার নাম ধরে চিৎকার করে, আবার কেউবা গিটার হাতে মাঝরাতে গেয়ে ওঠে ভালোবাসার গান। এই সবকিছুই আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি, ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য যেকোনো কিছুই করা যায়।

কিন্তু যদি বলি, মানুষের জগতেই শুধু নয়, পশুপাখিদের জগতেও এমন একজন প্রেমিক আছে, যে তার ভালোবাসার মানুষটিকে মুগ্ধ করার জন্য এক অদ্ভুত সুন্দর শিল্পকর্ম তৈরি করে? হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। আমাদের এই গল্পের নায়ক কোনো মানুষ নয়, বরং এক ছোট্ট পাখি, যার ভালোবাসার প্রকাশ ভঙ্গি যেকোনো মানুষের চেয়ে কম রোম্যান্টিক নয়।

কে এই প্রেমিক পাখি?

এই পাখিটির নাম বাউয়ারবার্ড (Bowerbird)। নিউ গিনি এবং অস্ট্রেলিয়ার রেইনফরেস্টে এদের বাস। আমাদের গল্পের নায়ক পুরুষ বাউয়ারবার্ডটি তার সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করার জন্য এমন কিছু করে, যা শুনলে আপনি অবাক না হয়ে পারবেন না। সে শুধু একটি বাসা তৈরি করেই থেমে থাকে না, বরং তার ভালোবাসার মানুষটির জন্য একটি আস্ত ‘ব্যাচেলর প্যাড’ বা বলা যেতে পারে একটি ‘আর্ট গ্যালারি’ তৈরি করে।

এই 'ব্যাচেলর প্যাড' আসলে তার সঙ্গিনীর মন জয় করার একটি মঞ্চ। পুরুষ পাখিটি महीनों ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে তার এই ভালোবাসার নীড় সাজিয়ে তোলে। সে বিভিন্ন গাছের ডাল, পাতা আর ঘাস দিয়ে একটি সুন্দর কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু আসল চমকটা থাকে তার সজ্জায়।

পৃথিবীতে এমন এক প্রজাতির পাখি আছে, যাদের পুরুষ সদস্যরা শুধুমাত্র সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার জন্য অদ্ভুত সুন্দর ঘর তৈরি করে এবং নীল রঙের জিনিস দিয়ে তা সাজিয়ে তোলে।

হ্যাঁ, এই বাউয়ারবার্ডদের কিছু প্রজাতি, যেমন স্যাটিন বাউয়ারবার্ড (Satin Bowerbird), নীল রঙের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করে। পুরুষ পাখিটি তার বানানো ঘরটিকে সাজানোর জন্য দূর-দূরান্ত থেকে নীল রঙের বিভিন্ন জিনিসপত্র সংগ্রহ করে আনে। এর মধ্যে থাকতে পারে নীল ফুল, নীল ফল, নীল পালক, শামুকের খোল, এমনকি মানুষের ফেলে দেওয়া নীল রঙের বোতলের ছিপি, কলমের ঢাকনা বা প্লাস্টিকের টুকরো। সে অত্যন্ত যত্ন সহকারে এই জিনিসগুলো তার ঘরের প্রবেশদ্বারে সাজিয়ে রাখে, যাতে তার সঙ্গিনী এলেই মুগ্ধ হয়ে যায়।

শুধু তাই নয়, এই প্রেমিক পাখি একজন দক্ষ ইন্টিরিয়র ডিজাইনারও বটে! সে তার বাড়ির দেওয়াল রাঙানোর জন্য ফলের রস বা কাঠকয়লার গুঁড়োর সাথে লালার মিশ্রণ ব্যবহার করে, যাকে এক প্রকার 'পেইন্ট' বলা যেতে পারে। এই পুরো ব্যাপারটা সে একা করে, শুধুমাত্র তার ভালোবাসার মানুষটির মন পাওয়ার আশায়।

প্রেমের এই অদ্ভুত পরীক্ষা

পুরুষ বাউয়ারবার্ড যখন তার শিল্পকর্ম নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয়, তখন সে তার সঙ্গিনীকে আমন্ত্রণ জানায়। স্ত্রী পাখিটি এসে তার বানানো ঘর এবং তার সাজসজ্জা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে। সে ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকটি জিনিস খুঁটিয়ে দেখে, যেন একজন শিল্প সমালোচক কোনো শিল্পকর্মের বিচার করছেন। যদি পুরুষ পাখিটির ঘর সাজানো তার পছন্দ হয়, তবেই সে তার সাথে মিলিত হতে রাজি হয়। মজার ব্যাপার হলো, এই ঘর কিন্তু তাদের থাকার জন্য বানানো বাসা নয়। ডিম পাড়া বা ছানাদের লালন-পালনের জন্য স্ত্রী পাখিটি আলাদা করে একটি সাধারণ বাসা তৈরি করে। পুরুষ পাখিটির এই সুন্দর করে সাজানো ঘরটি শুধুমাত্র প্রেম নিবেদনের একটি মঞ্চ।

বিজ্ঞানীদের মতে, পুরুষ পাখিটির এই আচরণ তার বুদ্ধিমত্তা এবং শারীরিক সক্ষমতার পরিচয় দেয়। যে পুরুষ পাখি যত সুন্দর এবং নিখুঁতভাবে তার ঘর সাজাতে পারে, স্ত্রী পাখিটি তাকে তত বেশি যোগ্য সঙ্গী হিসেবে মনে করে। এমনকি, পুরুষ পাখিরা একে অপরের ঘর থেকে সুন্দর জিনিস চুরি করতে বা অন্যের ঘর নষ্ট করে দিতেও দ্বিধা করে না, ঠিক যেন এক প্রেমিকের সাথে আরেক প্রেমিকের প্রতিযোগিতা!

তাহলে ভাবুন একবার, ভালোবাসার জন্য এই ছোট্ট পাখিটি কতখানি পরিশ্রম করে! তার এই নিষ্ঠা, এই শিল্পকর্ম কি কোনো অংশে তাজমহলের চেয়ে কম? ভালোবাসা সত্যিই কোনো সীমানা মানে না। তা সে মানুষ হোক বা পাখি, ভালোবাসার প্রকাশ ভঙ্গি হয়তো ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার পেছনের আবেগটা সবসময়ই এক এবং অদ্বিতীয়। এরপর যখনই ভালোবাসার কোনো বড় নিদর্শনের কথা ভাববেন, তখন একবার এই ছোট্ট নীলপ্রেমী পাখিটির কথাও মনে করবেন, যে তার ভালোবাসার জন্য এক টুকরো নীল আকাশকেই যেন মাটিতে নামিয়ে আনে।