বিষয়ের ভূমিকা
স্বাধীনতা অর্জন করা যেকোনো দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হয় তারপর। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়, তখন তার সামনে ছিল এক বিশাল পর্বতপ্রমাণ চ্যালেঞ্জ। ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক শোষণ ভারতীয় অর্থনীতিকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছিল। কৃষি ছিল অনুন্নত, শিল্পক্ষেত্র ছিল দুর্বল এবং দেশের অধিকাংশ মানুষ ছিল চরম দারিদ্র্যের শিকার। এই পরিস্থিতিতে, স্বাধীন ভারতের নেতাদের দায়িত্ব ছিল এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা যা কেবল দেশের উন্নয়নই করবে না, বরং কোটি কোটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
একাদশ শ্রেণির অর্থনীতির দ্বিতীয় অধ্যায়, 'ভারতীয় অর্থনীতি (১৯৫০-১৯৯০)', ঠিক এই সময়কালের কাহিনী তুলে ধরে। এই অধ্যায়ে আমরা জানব কীভাবে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং অন্যান্য নেতারা একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক মডেল গ্রহণ করেছিলেন। আমরা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, কৃষি সংস্কার, শিল্পনীতি এবং বাণিজ্যনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব। এই ৪০ বছরের যাত্রাপথ ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তাই, আজকের ভারতকে বুঝতে হলে, ১৯৫০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তার অর্থনৈতিক যাত্রাপথকে বোঝা অত্যন্ত জরুরি। চলুন, এই ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের গভীরে প্রবেশ করা যাক।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
এই অধ্যায়ের মূল বিষয়বস্তু হলো স্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং তার ফলাফল। আমরা বিষয়গুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
১. অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ধারণা এবং পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার লক্ষ্য
স্বাধীনতার পর ভারতের সামনে প্রধান প্রশ্ন ছিল - দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ কী হবে? পুঁজিবাদী (Capitalist) মডেল, যেখানে উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা মূলত বেসরকারি হাতে থাকে এবং বাজারই সবকিছু নির্ধারণ করে? নাকি সমাজতান্ত্রিক (Socialist) মডেল, যেখানে রাষ্ট্রই উৎপাদনের প্রধান উপকরণগুলির মালিক এবং দেশের কল্যাণে সবকিছু পরিকল্পনা করে?
জওহরলাল নেহরু এবং তৎকালীন নেতারা কোনো একটি চরম পথ বেছে না নিয়ে একটি মিশ্র অর্থনীতি (Mixed Economy) মডেল গ্রহণ করেন। এই মডেলে, কৃষি ও শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপ থাকবে, আবার বেসরকারি উদ্যোগকেও উৎসাহিত করা হবে। অর্থাৎ, এটি ছিল সমাজতন্ত্রেরที่ดี দিক এবং পুঁজিবাদেরที่ดี দিকের এক সংমিশ্রণ।
এই মিশ্র অর্থনীতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য 'পরিকল্পনা' বা Planning-এর সাহায্য নেওয়া হয়। ১৯৫০ সালে ভারতে পরিকল্পনা কমিশন (Planning Commission) গঠন করা হয়, যার চেয়ারপার্সন ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এই কমিশনের কাজ ছিল দেশের সম্পদ মূল্যায়ন করে সেগুলিকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার জন্য পরিকল্পনা তৈরি করা। এই পরিকল্পনাগুলি পাঁচ বছরের জন্য তৈরি করা হতো, যা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (Five-Year Plans) নামে পরিচিত। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯৫১ সালে।
প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলেও, কিছু সাধারণ দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ছিল যা প্রায় সব পরিকল্পনাতেই গুরুত্ব পেয়েছে। এই প্রধান লক্ষ্যগুলি হলো:
- বৃদ্ধি (Growth): এর অর্থ হলো দেশের পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এটিকে সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদন বা Gross Domestic Product (GDP) দিয়ে পরিমাপ করা হয়। GDP হলো একটি নির্দিষ্ট বছরে দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে উৎপাদিত সমস্ত চূড়ান্ত পণ্য ও পরিষেবার বাজারমূল্য। GDP বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়ক। এই বৃদ্ধি মূলত তিনটি ক্ষেত্র থেকে আসে - কৃষি ক্ষেত্র, শিল্প ক্ষেত্র এবং পরিষেবা ক্ষেত্র। পরিকল্পনাবিদদের লক্ষ্য ছিল এই তিনটি ক্ষেত্রেই উৎপাদন বৃদ্ধি করা।
- আধুনিকীকরণ (Modernisation): এর দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। যেমন, কৃষিক্ষেত্রে ট্রাক্টর বা উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার বা শিল্পক্ষেত্রে নতুন যন্ত্রপাতির প্রয়োগ। দ্বিতীয়ত, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। যেমন, নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং পুরনো প্রথা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক চিন্তাভাবনাকে গ্রহণ করা। আধুনিকীকরণ ছাড়া কোনো দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না।
- আত্মনির্ভরতা (Self-reliance): ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা থেকে ভারতের নেতারা বুঝেছিলেন যে অন্য দেশের উপর, বিশেষ করে খাদ্যশস্য এবং প্রয়োজনীয় الصناعية পণ্যের জন্য নির্ভরশীল থাকা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই, আত্মনির্ভরতা একটি প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এর অর্থ ছিল, যে সমস্ত পণ্য বিদেশে তৈরি হয়, সেগুলি দেশেই উৎপাদন করার চেষ্টা করা এবং আমদানির উপর নির্ভরশীলতা কমানো। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভারী শিল্পের ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর হওয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।
- সমতা (Equity): শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। সেই বৃদ্ধির সুফল যাতে দেশের সকল মানুষের কাছে, বিশেষ করে দরিদ্র এবং পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাও একটি বড় লক্ষ্য ছিল। এর অর্থ হলো আয় এবং সম্পদের বৈষম্য কমানো। সমতা নিশ্চিত করার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেকের আয় সমান হবে, বরং এর অর্থ হলো প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা যেমন - খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য - পূরণ করার সুযোগ থাকবে। পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার এই লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করত।
২. কৃষি क्षेत्रातील পরিবর্তন (১৯৫০-১৯৯০)
স্বাধীনতার সময় ভারতের প্রায় ৭0-৭৫% মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে কৃষিক্ষেত্র ছিল সবচেয়ে অবহেলিত। উৎপাদনশীলতা ছিল খুব কম, এবং জমিদারি প্রথার কারণে কৃষকরা শোষিত হতো। তাই, কৃষিক্ষেত্রের সংস্কার ছিল পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার একটি প্রধান অংশ।
ক) ভূমি সংস্কার (Land Reforms)
কৃষিক্ষেত্রে সমতা আনার এবং উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ভূমি সংস্কারের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। এর প্রধান দুটি অংশ ছিল:
- মধ্যস্বত্বভোগী বা জমিদারদের বিলুপ্তি (Abolition of Intermediaries): ব্রিটিশ আমলে সরকার ও প্রকৃত কৃষকের মাঝে জমিদার, জোতদারদের মতো অনেক মধ্যস্বত্বভোগী ছিল। তারা কৃষকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ খাজনা আদায় করত, কিন্তু জমির উন্নয়নে কোনো বিনিয়োগ করত না। স্বাধীনতা লাভের পর, সরকার আইন করে এই মধ্যস্বত্বভোগী প্রথা বিলুপ্ত করে। এর ফলে প্রায় ২০০ লক্ষ কৃষক সরাসরি সরকারের সংস্পর্শে আসে এবং তারা জমির মালিকানা পায়। এটি ভারতীয় কৃষিতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। যদিও কিছু রাজ্যে জমিদাররা আইনের ফাঁকফোকর গলে প্রচুর জমি নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
- ভূমি মালিকানার ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ (Land Ceiling): সমাজে জমির বণ্টনে সমতা আনার জন্য সরকার 'ল্যান্ড সিলিং' আইন চালু করে। এই আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা পরিবার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি জমি রাখতে পারবে না। অতিরিক্ত জমি সরকার অধিগ্রহণ করে ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণ করবে। এই আইনটির উদ্দেশ্য মহৎ হলেও, এর বাস্তবায়ন খুব দুর্বল ছিল। বড় ভূস্বামীরা আইন কার্যকর হওয়ার আগে তাদের অতিরিক্ত জমি আত্মীয়স্বজন বা বেনামে হস্তান্তর করে দেয়। ফলে, এই নীতির সাফল্য ছিল অত্যন্ত সীমিত।
খ) সবুজ বিপ্লব (The Green Revolution)
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় কৃষি এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে ছিল। একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছিল, অন্যদিকে খরা এবং অনুন্নত প্রযুক্তির কারণে খাদ্যশস্যের উৎপাদন स्थिर হয়ে গিয়েছিল। ভারতকে বিপুল পরিমাণে খাদ্য, বিশেষ করে গম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হতো। এই পরনির্ভরতা দূর করার জন্য সরকার কৃষিক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেয়, যা 'সবুজ বিপ্লব' নামে পরিচিত।
সবুজ বিপ্লব মূলত একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ছিল। এর প্রধান উপাদানগুলি হলো:
- উচ্চ ফলনশীল বীজ (High Yielding Variety - HYV Seeds): বিজ্ঞানীরা এমন কিছু নতুন প্রজাতির গম এবং ধানের বীজ আবিষ্কার করেন যা থেকে প্রচলিত বীজের তুলনায় অনেক বেশি ফসল ফলানো সম্ভব।
- রাসায়নিক সার ও কীটনাশক (Chemical Fertilizers and Pesticides): HYV বীজের সম্পূর্ণ কার্যকারিতা পাওয়ার জন্য প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি, ফসলকে কীটপতঙ্গের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য কীটনাশকের ব্যবহারও বৃদ্ধি পায়।
- জলসেচ (Irrigation): নতুন প্রযুক্তির জন্য নিয়ন্ত্রিত এবং পর্যাপ্ত জল সরবরাহ অপরিহার্য ছিল। তাই সরকার খাল, বাঁধ এবং পাম্পসেট স্থাপনের মাধ্যমে জলসেচ ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসার ঘটায়।
সবুজ বিপ্লবের প্রভাব:
সবুজ বিপ্লবের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী এবং মিশ্র।
ইতিবাচক প্রভাব:
- খাদ্যশস্যে আত্মনির্ভরতা: সবুজ বিপ্লবের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ভারতকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা। দেশ আমদানিকারক থেকে রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। সরকার একটি 'বাফার স্টক' (Buffer Stock) তৈরি করতে সক্ষম হয়, যা খাদ্য সংকটের সময় ব্যবহার করা যেত।
- কৃষকদের আয় বৃদ্ধি: যেসব কৃষক নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পেরেছিল, তাদের উৎপাদন এবং আয় বহুগুণ বেড়ে যায়।
- কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ: সার, কীটনাশক, ট্রাক্টর ইত্যাদি الصناعية পণ্যের চাহিদা বাড়ায় শিল্পেরও বিকাশ ঘটে।
নেতিবাচক প্রভাব:
- আঞ্চলিক বৈষম্য: সবুজ বিপ্লবের সুফল মূলত পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ এবং অন্ধ্রপ্রদেশের মতো সেচ সুবিধাযুক্ত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। পূর্বাঞ্চল এবং শুষ্ক অঞ্চলের কৃষকরা এর থেকে বিশেষ উপকৃত হয়নি।
- শ্রেণীগত বৈষম্য: HYV বীজ, সার, জলসেচের মতো উপকরণগুলি ব্যয়বহুল ছিল। শুধুমাত্র বড় এবং ধনী কৃষকরাই এগুলি ব্যবহার করতে পারত। ফলে ধনী ও গরিব কৃষকদের মধ্যে বৈষম্য আরও বেড়ে যায়।
- পরিবেশগত সমস্যা: রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে জমির উর্বরতা হ্রাস পায় এবং ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নিচে নেমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত সমস্যার সৃষ্টি করে।
- শস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধতা: সবুজ বিপ্লবের প্রভাব মূলত গম এবং ধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ডাল, তৈলবীজ এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদনে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি।
৩. শিল্প এবং বাণিজ্য (১৯৫০-১৯৯০)
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন যে কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী শিল্প ভিত্তি থাকা আবশ্যক। শিল্পক্ষেত্র কেবল কর্মসংস্থানই তৈরি করে না, কৃষির আধুনিকীকরণেও সাহায্য করে। ভারতের পরিকল্পনাবিদরা, বিশেষ করে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার রূপকার প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ, ভারী শিল্পের উপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন।
ক) শিল্প নীতি প্রস্তাব, ১৯৫৬ (Industrial Policy Resolution, 1956)
ভারতের শিল্প বিকাশের পথনির্দেশিকা হিসেবে ১৯৫৬ সালের শিল্প নীতি প্রস্তাব একটি মাইলফলক। এই প্রস্তাবে রাষ্ট্র বা সরকারি ক্ষেত্রকে (Public Sector) উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। এই নীতির ভিত্তিতে শিল্পগুলিকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়:
- তফসিল-ক (Schedule A): এই শ্রেণীতে ১৭টি শিল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেগুলির মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রের হাতে থাকবে। এর মধ্যে ছিল অস্ত্র, পরমাণু শক্তি, লোহা ও ইস্পাত, ভারী যন্ত্রপাতি, খনিজ তেল, রেলওয়ে, বিমান ইত্যাদি।
- তফসিল-খ (Schedule B): এই শ্রেণীতে ১২টি শিল্প ছিল, যেখানে রাষ্ট্র প্রধান ভূমিকা নেবে এবং বেসরকারি ক্ষেত্র পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারবে। যেমন - অ্যালুমিনিয়াম, মেশিন টুলস, সার, রাসায়নিক শিল্প ইত্যাদি।
- তফসিল-গ (Schedule C): উপরের দুটি তফসিলের বাইরে বাকি সমস্ত শিল্প বেসরকারি ক্ষেত্রের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। তবে, এই শিল্পগুলিকেও রাষ্ট্রের লাইসেন্স ব্যবস্থার অধীনে কাজ করতে হতো।
এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি শিল্প ভিত্তি তৈরি করা যা অন্য শিল্পের বিকাশে সাহায্য করবে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাবে। এই সময়েই দুর্গাপুর, ভিলাই, রাউরকেলার মতো বড় বড় ইস্পাত কারখানা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা (Public Sector Undertakings - PSUs) গড়ে ওঠে।
খ) ক্ষুদ্র শিল্প (Small-Scale Industry - SSI)
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সমতা আনার জন্য সরকার ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশেও গুরুত্ব দেয়। ১৯৫৫ সালে গঠিত 'কার্ভে কমিটি' (Karve Committee) গ্রামীণ উন্নয়নে ক্ষুদ্র শিল্পের ভূমিকার কথা তুলে ধরে। সরকার ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য কিছু পণ্য সংরক্ষণ করে, অর্থাৎ সেই পণ্যগুলি শুধুমাত্র ক্ষুদ্র শিল্পই উৎপাদন করতে পারত। এছাড়াও, তাদের কম সুদে ঋণ এবং কম করের মতো সুবিধাও দেওয়া হতো।
গ) বাণিজ্য নীতি: আমদানি বিকল্প (Trade Policy: Import Substitution)
১৯৫০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ভারতের বাণিজ্য নীতি ছিল মূলত অন্তর্মুখী (Inward-looking)। এই নীতিটি 'আমদানি বিকল্প' (Import Substitution) নীতি নামে পরিচিত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল विदेशी পণ্যের আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় শিল্পকে विदेशी প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করা।
এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য সরকার দুটি প্রধান হাতিয়ার ব্যবহার করে:
- শুল্ক (Tariffs): আমদানিকৃত পণ্যের উপর উচ্চ হারে কর আরোপ করা হতো, যার ফলে দেশের বাজারে সেগুলির দাম বেড়ে যেত এবং দেশীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ত।
- কোটা (Quotas): সরকার নির্দিষ্ট করে দিত যে কোনো পণ্য কী পরিমাণে আমদানি করা যাবে। এর ফলে আমদানির পরিমাণ সীমিত থাকত।
এই নীতির ফলে ভারতের নিজস্ব শিল্প, যেমন অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিক্স ইত্যাদি গড়ে ওঠে। কিন্তু এর কিছু নেতিবাচক দিকও ছিল।
৪. নীতিগুলির সমালোচনামূলক মূল্যায়ন (Critical Appraisal)
১৯৫০-১৯৯০ সময়কালের অর্থনৈতিক নীতিগুলির মূল্যায়ন করলে আমরা সাফল্য এবং ব্যর্থতা উভয়ই দেখতে পাই।
সাফল্য:
- অর্থনৈতিক বৃদ্ধি: ঔপনিবেশিক আমলে ভারতের অর্থনীতির বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ০.৫%। কিন্তু ১৯৫০-১৯৯০ সময়কালে এই হার বেড়ে প্রায় ৩.৫-৪% হয়। যদিও এটি অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় কম ছিল, তবুও এটি একটি উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
- শিল্প কাঠামোর বৈচিত্র্য: এই সময়ে ভারতের শিল্পক্ষেত্র অনেক বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার সময় যেখানে মূলত পাট এবং বস্ত্রশিল্প ছিল, সেখানে ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং, রাসায়নিক, ইস্পাতের মতো বিভিন্ন শিল্প গড়ে ওঠে।
- খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা: সবুজ বিপ্লবের ফলে ভারত খাদ্যশস্য উৎপাদনে আত্মনির্ভর হয়ে ওঠে, যা একটি বিশাল সাফল্য।
- সামাজিক উন্নয়ন: এই সময়ে সাক্ষরতার হার, গড় আয়ু এবং স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক সূচকে উন্নতি ঘটে।
ব্যর্থতা:
- রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির অদক্ষতা: অনেক সরকারি সংস্থা লোকসানে চলতে শুরু করে এবং অদক্ষতার প্রতীক হয়ে ওঠে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এদেরประสิทธิภาพ কমিয়ে দেয়।
- প্রতিযোগিতার অভাব: লাইসেন্স রাজ এবং আমদানি বিকল্প নীতির কারণে দেশীয় শিল্পগুলি কোনো প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়নি। এর ফলে, তারা আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ বা পণ্যের মান উন্নয়নে বিশেষ নজর দেয়নি। গ্রাহকদের কাছে সীমিত বিকল্প ছিল এবং তাদের নিম্নমানের পণ্যের জন্য উচ্চ মূল্য দিতে হতো।
- রপ্তানিতে অনীহা: অন্তর্মুখী নীতির কারণে রপ্তানিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এর ফলে ভারত বিশ্ববাজারের সুযোগকে কাজে লাগাতে পারেনি এবং মূল্যবান विदेशी মুদ্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়।
- বৈষম্য: অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সত্ত্বেও, দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং আয় বৈষম্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে থেকে যায়। পরিকল্পনার সুফল সমাজের সকল স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
শেষ পর্যন্ত, ১৯৯০ সালের মধ্যে ভারতীয় অর্থনীতি একটি গভীর সংকটের সম্মুখীন হয়। विदेशी মুদ্রার ভান্ডার প্রায় শেষ হয়ে যায় এবং দেশ দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়। এই সংকটই ১৯৯১ সালে ভারতে এক নতুন অর্থনৈতিক নীতির (উদারীকরণ, বেসরকারীকরণ এবং বিশ্বায়ন) সূচনা করে, যা আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করব।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যগুলি কী কী ছিল?
উত্তর: ভারতের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলির চারটি প্রধান দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ছিল:
- বৃদ্ধি: দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) বৃদ্ধি করে অর্থনীতিকে প্রসারিত করা।
- আধুনিকীকরণ: উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আধুনিক করা।
- আত্মনির্ভরতা: আমদানির উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে, বিশেষ করে খাদ্য এবং শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে, দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা।
- সমতা: অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সুফল যাতে সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং আয় ও সম্পদের বৈষম্য কমে, তা নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন ২: সবুজ বিপ্লব বলতে কী বোঝায়? এর দুটি ইতিবাচক ও দুটি নেতিবাচক প্রভাব উল্লেখ কর।
উত্তর: সবুজ বিপ্লব হলো ১৯৬০-এর দশকে ভারতীয় কৃষিক্ষেত্রে সংঘটিত একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, যার মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল বীজ (HYV), রাসায়নিক সার এবং জলসেচের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্যশস্য, বিশেষ করে গম ও ধানের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়।
- দুটি ইতিবাচক প্রভাব: (i) ভারত খাদ্য উৎপাদনে আত্মনির্ভর হয়ে ওঠে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। (ii) কৃষকদের (বিশেষ করে বড় কৃষকদের) আয় বৃদ্ধি পায়।
- দুটি নেতিবাচক প্রভাব: (i) ধনী ও দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। (ii) রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহারে পরিবেশগত সমস্যা, যেমন - মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং জলদূষণ ঘটে।
প্রশ্ন ৩: 'আমদানি বিকল্প' নীতি (Import Substitution Policy) কী? এটি ভারতীয় শিল্পের উপর কী প্রভাব ফেলেছিল?
উত্তর: 'আমদানি বিকল্প' নীতি হলো একটি বাণিজ্য কৌশল যেখানে দেশ বিদেশি পণ্যের আমদানিকে নিরুৎসাহিত করে এবং সেই পণ্যগুলি দেশেই উৎপাদনের উপর জোর দেয়। ১৯৫০-১৯৯০ সাল পর্যন্ত ভারত এই নীতি অনুসরণ করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় শিল্পকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করা এবং আত্মনির্ভরতা অর্জন করা। এই নীতি প্রয়োগের জন্য সরকার উচ্চ হারে আমদানি শুল্ক এবং কোটা ব্যবস্থা ব্যবহার করত।
প্রভাব: এই নীতির ফলে একদিকে যেমন ভারতে বিভিন্ন ধরনের নতুন শিল্প গড়ে উঠেছিল এবং দেশীয় উৎপাদকরা একটি সুরক্ষিত বাজার পেয়েছিল, তেমনই অন্যদিকে প্রতিযোগিতার অভাবে পণ্যের মান উন্নত হয়নি এবং ভোক্তাদের কাছে বিকল্প ছিল সীমিত। এটি ভারতীয় শিল্পকে বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ের মূল বিষয়গুলি মনে রাখার জন্য নিচে একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
- স্বাধীনতার পর ভারত একটি মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যেখানে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের সহাবস্থান ছিল।
- অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার পথ বেছে নেওয়া হয়, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল - বৃদ্ধি, আধুনিকীকরণ, আত্মনির্ভরতা এবং সমতা।
- কৃষিক্ষেত্রে দুটি প্রধান সংস্কার আনা হয়: ভূমি সংস্কার (জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি এবং ল্যান্ড সিলিং) এবং সবুজ বিপ্লব।
- সবুজ বিপ্লব ভারতকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করলেও এটি আঞ্চলিক এবং শ্রেণীগত বৈষম্য বাড়িয়ে তোলে।
- শিল্পক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য সরকারি ক্ষেত্রকে (Public Sector) প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং IPR, 1956 -এর মাধ্যমে শিল্পগুলিকে নিয়ন্ত্রিত করা হয়।
- বাণিজ্য নীতি ছিল আমদানি বিকল্প বা অন্তর্মুখী, যা দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিলেও প্রতিযোগিতাহীনতার জন্ম দেয়।
- এই ৪০ বছরের নীতি ভারতের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করলেও, অদক্ষতা, প্রতিযোগিতার অভাব এবং নিয়ন্ত্রণের বাড়াবাড়ির কারণে ১৯৯১ সালে একটি বড় অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন হয়।