প্রেমের গল্প তো কতই শুনেছেন! রাজপুত্র-রাজকন্যার প্রেম, লাইলি-মজনুর প্রেম, এমনকি পাশের বাড়ির ছেলেমেয়ের প্রেম। কিন্তু আজ আপনাদের এমন এক প্রেমের গল্প বলব যা শুনে আপনি অবাক হবেন, হাসবেন, আর হয়তো একটু ভালোবাসতেও শিখবেন। এই গল্পের নায়ক-নায়িকা কোনো মানুষ নয়, বরং সমুদ্রের এক শান্ত, প্রাচীন প্রাণী – সামুদ্রিক কাছিম।

জন্মভূমির টানে হাজার মাইলের পাড়ি

ভাবুন তো একবার, আপনার জন্ম হয়েছে এমন এক জায়গায়, যা আপনি জন্মের পরেই ছেড়ে এসেছেন। তারপর কেটে গেছে বছরের পর বছর। আপনি ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ-বিদেশ। কিন্তু একটা বয়সের পর আপনার মন চাইছে সেই জন্মস্থানে ফিরে যেতে। সামুদ্রিক কাছিমদের জীবনটাও ঠিক এমনই। ওরা হাজার হাজার মাইল সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ঠিক সেই সৈকতে ফিরে আসে যেখানে তাদের জন্ম হয়েছিল, শুধুমাত্র ডিম পাড়ার জন্য। অবাক হচ্ছেন? ওদের তো কোনো GPS বা ম্যাপ নেই! তাহলে কীভাবে ফেরে?

আসলে, সামুদ্রিক কাছিমরা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রকে নিজেদের GPS হিসেবে ব্যবহার করে। জন্মের সময় তারা নিজেদের জন্মস্থানের চৌম্বক ক্ষেত্রের একটি ছাপ মনের মধ্যে গেঁথে নেয় এবং পরিণত বয়সে সেই স্মৃতিকে ব্যবহার করেই বাড়ি ফেরে।

এই দীর্ঘ এবং বিপদসংকুল যাত্রা তারা শুধুমাত্র একটি কারণেই করে – তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য। এটা কি ভালোবাসার চেয়ে কম কিছু? নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, হাজার হাজার মাইল সাঁতার কেটে, শুধুমাত্র বংশরক্ষার টানে ফিরে আসা। এই বাড়ি ফেরার গল্পটা কি কোনো রোমান্টিক সিনেমার চেয়ে কম emocionante?

ওরা কাঁদে, কিন্তু দুঃখে নয়!

এবার আসা যাক গল্পের সবচেয়ে মজার অংশে। আপনি যদি কখনো ডিম পাড়ার সময় কোনো সামুদ্রিক কাছিমকে দেখেন, তাহলে দেখবেন তার চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়ছে। দেখে মনে হবে, সে হয়তো যন্ত্রণায় বা দুঃখে কাঁদছে। কিন্তু সত্যিটা হলো, ওরা কাঁদে ঠিকই, কিন্তু সেটা দুঃখের কান্না নয়!

আসলে, সামুদ্রিক কাছিমরা সমুদ্রের নোনা জল পান করে এবং তাদের খাবারও লবণাক্ত। তাদের শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত লবণ বের করে দেওয়ার জন্য চোখের কোণে একটি বিশেষ গ্রন্থি থাকে। এই গ্রন্থি দিয়ে তারা নোনা জল চোখের জলের আকারে বের করে দেয়। তাই, যাকে আমরা দুঃখের কান্না ভাবছি, সেটা আসলে তাদের শরীরকে সুস্থ রাখার একটা প্রাকৃতিক উপায় মাত্র। ডিম পাড়ার সময় বালির হাত থেকে চোখ বাঁচানোর জন্যও এই জল খুব কাজে লাগে।

তাহলে পরেরবার যখন কোনো সামুদ্রিক কাছিমকে ' কাঁদতে' দেখবেন, তখন দুঃখ পাবেন না। বরং, মনে মনে হাসবেন আর ভাববেন, এই চোখের জলের পেছনে লুকিয়ে আছে প্রকৃতি মায়ের এক অদ্ভুত সুন্দর বিজ্ঞান আর টিকে থাকার লড়াই। ভালোবাসা আর বেঁচে থাকার এই গল্পগুলোই তো পৃথিবীকে এত সুন্দর করে তুলেছে, তাই না?