বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের পৃথিবী এবং মানবসভ্যতার ইতিহাস অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। আজকের আধুনিক সমাজে বসে আমরা যখন চারপাশের সুযোগ-সুবিধা দেখি, তখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে আদিকালে মানুষ কেমন ছিল? তারা কীভাবে বেঁচে থাকত? ষষ্ঠ শ্রেণি ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায়ে—'আদিম মানুষ শিকার থেকে খাদ্য সংগ্রহকারী'—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে। আজকের এই বিশদ আলোচনায় আমরা জানব কীভাবে মানুষ বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর জীবন থেকে ধীরে ধীরে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। এনসিইআরটি (NCERT) পাঠ্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে এই বিষয়টি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় নিচে আলোচনা করা হলো।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

আদিম মানুষের জীবনযাত্রাকে বুঝতে হলে আমাদের কয়েক লক্ষ বছর পিছিয়ে যেতে হবে। প্রাচীনতম মানুষদের বলা হতো শিকারী-সংগ্রাহক (Hunter-gatherers)। তাদের জীবনধারার প্রধান দিকগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

১. আদিম মানুষের চলাফেরা ও ঘোরার কারণ

প্রাচীন যুগের মানুষেরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াত। এর পেছনে মূলত চারটি প্রধান কারণ ছিল:

  • খাদ্যের সন্ধান: যদি তারা একটি জায়গায় সমস্ত গাছের ফল, মূল এবং বন্য প্রাণী খেয়ে শেষ করে ফেলত, তবে খাদ্যের খোঁজে তাদের অন্য জায়গায় চলে যেতে হতো।
  • পশুর চলাচল: আদিম মানুষেরা বেঁচে থাকার জন্য পশুর শিকার করত। শিকার করা পশুর পেছনে পেছনে তাদের স্থান পরিবর্তন করতে হতো, কারণ হরিণ বা বন্যেরা খাদ্যের খোঁজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেত।
  • জলের উৎস: অনেক নদী ও হ্রদ মৌসুমি ছিল, অর্থাৎ শুষ্ক মরশুমে শুকিয়ে যেত। জল পাওয়ার জন্য মানুষকে নদীর ধারে বা নতুন জলের উৎসের কাছে যেতে হতো।
  • আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু: শুকনো মরশুমে বা প্রয়োজনে তারা অন্য দলের মানুষদের সাথে যোগাযোগ রাখত এবং পারস্পরিক সহায়তা নিত।

২. পাথরের হাতিয়ার ও তার ব্যবহার

আদিম মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল পাথরের হাতিয়ার বা পাথরের যন্ত্রপাতি। এই সময়কালকে মূলত প্রস্তর যুগ বলা হয়। পাথরের সাহায্যে তারা বিভিন্ন কাজ করত:

  • মাংস কাটার জন্য এবং গাছের ছাল ছাড়ানোর জন্য ধারালো পাথরের প্রয়োজন হতো।
  • পশুর চামড়া দিয়ে নিজেদের শরীর ঢাকার জন্য সুঁচ বা ধারালো পাথরের ফলক ব্যবহার করা হতো।
  • কাঠ কাটার জন্য পাথরকে শক্ত লাঠির সাথে বেঁধে হাতুড়ি বা কুঠার তৈরি করা হতো।

৩. আগুনের আবিষ্কার

আগুনের আবিষ্কার মানব ইতিহাসের অন্যতম একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কুরনুল (Kurnool) গুহায় প্রাচীন ছাইয়ের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে আদিম মানুষেরা আগুন জ্বালাতে জানত। আগুন তাদের নানাভাবে সাহায্য করত:

  • অন্ধকারে আলো পেতে এবং বন্য জন্তুদের দূরে রাখতে।
  • শিকার করা মাংস পুড়িয়ে নরম ও সুস্বাদু করে খেতে।
  • শীতের দিনে নিজেদের শরীর গরম রাখতে।

৪. পরিবর্তনশীল পরিবেশ ও কৃষির সূচনা

প্রায় ১২,০০০ বছর আগে পৃথিবীর জলবায়ুতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। আবহাওয়া ধীরে ধীরে উষ্ণ হতে শুরু করে, যার ফলে ঘাসজমির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ঘাস খাওয়ার ফলে হরিণ, ভেড়া, ছাগল ও গরুর মতো প্রাণীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। মানুষ এই প্রাণীদের স্বভাব লক্ষ করতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে তাদের পোষ মানাতে শেখে। একই সাথে, নদীর ধারে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গম, বার্লি ও ধানের মতো শস্য দানা মানুষ সংগ্রহ করতে শুরু করে। এভাবেই সূচনা হয় কৃষিকাজ এবং পশুপালনের।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: আদিম মানুষেরা কেন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াত?

উত্তর: আদিম মানুষেরা মূলত খাদ্যের অভাব, পশুর চলাচল অনুসরণ, জলের উৎসের সন্ধান এবং ঋতু পরিবর্তনের কারণে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াত।

প্রশ্ন ২: পাথরের তৈরি হাতিয়ারগুলির কী কী ব্যবহার ছিল?

উত্তর: পাথরের হাতিয়ারগুলি পশুর মাংস ও হাড় কাটতে, গাছের ছাল ও গাছের শিকড় তুলতে, পশুর চামড়া পরিষ্কার করতে এবং কাঠ কাটার কাজে ব্যবহৃত হতো।

প্রশ্ন ৩: কৃষিকাজ এবং পশুপালনের সূচনা কীভাবে হয়েছিল?

উত্তর: প্রায় ১২,০০০ বছর আগে আবহাওয়া উষ্ণ হওয়ার ফলে ঘাসজমির বিকাশ ঘটে এবং বন্য পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। মানুষ পশুকে পোষ মানাতে শেখে এবং প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শস্যদানা সংগ্রহ করতে করতে কৃষিকাজ শুরু করে।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা যা শিখলাম তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক:

  • আদিম মানুষেরা শিকারী ও খাদ্য সংগ্রাহক হিসেবে জীবন শুরু করেছিল।
  • তারা বেঁচে থাকার জন্য পাথরের হাতিয়ার এবং আগুনের ব্যবহার শিখেছিল।
  • পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে তারা পশুপালন এবং কৃষিকাজ শুরু করে।
  • কৃষির সূচনার ফলে মানুষ যাযাবর জীবন ছেড়ে স্থায়ী বসতি বা গ্রাম তৈরি করতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে বড় সভ্যতার জন্ম দেয়।