বিষয়ের ভূমিকা
বিজ্ঞানের দুনিয়ায় সবচেয়ে রহস্যময় এবং রোমাঞ্চকর প্রশ্নগুলির একটি হল— এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কী দিয়ে তৈরি? আমরা আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখি, তা সবই ক্ষুদ্রতম কণা দিয়ে গঠিত, যাকে আমরা পরমাণু বলি। নবম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে আমরা শিখব পরমাণুর গঠন (Structure of the Atom) সম্পর্কে। প্রাচীন ভারতীয় ও গ্রীক দার্শনিক থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞানীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কীভাবে আজকের এই পরমাণু মডেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব। এই অধ্যায়টি রসায়ন এবং পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে, যা পরবর্তী উচ্চতর ক্লাসে অত্যন্ত কার্যকরী।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
পরমাণুর অভ্যন্তরীণ গঠন বুঝতে হলে আমাদের কয়েকটি ঐতিহাসিক আবিষ্কার এবং মৌলিক কণার ধারণা পরিষ্কার করতে হবে। নিচে এই অধ্যায়ের মূল বিষয়গুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. আধানযুক্ত কণা বা সাব-অ্যাটমিক কণার আবিষ্কার
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে পরমাণু অবিভাজ্য নয়, বরং এর ভেতরেও চার্জযুক্ত কণা বা উপাদান রয়েছে।
- ইলেকট্রন (Electron): জে. জে. থমসন ১৮৯৭ সালে ক্যাথোড রে পরীক্ষার মাধ্যমে ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণা ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন। ইলেকট্রনকে $\text{e}^-$ দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
- প্রোটন (Proton): আর্নেস্ট রাদারফোর্ড ক্যানেল রশ্মি পরীক্ষার মাধ্যমে ধনাত্মক আধানযুক্ত কণা প্রোটন আবিষ্কার করেন। প্রোটনকে $\text{p}^+$ দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
- নিউট্রন (Neutron): ১৯৩২ সালে জেমস চ্যাডউইক পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আধানহীন বা প্রসম কণা নিউট্রন আবিষ্কার করেন। নিউট্রনকে $\text{n}$ দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
২. জে. জে. থমসনের পরমাণু মডেল
ইলেকট্রন আবিষ্কারের পর থমসন ১৯০৪ সালে পরমাণুর প্রথম মডেল উপস্থাপন করেন। তিনি একে তরমুজের (Watermelon) সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তাঁর মতে:
- পরমাণুটি একটি ধনাত্মক আধানযুক্ত গোলক, যার মধ্যে ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনগুলি তরমুজের বীজের মতো গেঁথে থাকে।
- এই মডেলে পরমাণুর ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধানের পরিমাণ সমান হয়, তাই পরমাণু সামগ্রিকভাবে নিস্তরিত (Neutral) হয়।
৩. রাদারফোর্ডের আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষা
রাদারফোর্ড পরমাণুর অভ্যন্তরভাগ পরীক্ষা করার জন্য একটি বিখ্যাত আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষা করেন। তিনি খুব পাতলা সোনার পাতার ওপর দ্রুতগামী আলফা কণা $(\alpha\text{-particles})$ আঘাত করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে দেখা গেল:
- বেশিরভাগ আলফা কণাই সোনার পাতা ভেদ করে সোজা বেরিয়ে চলে গেছে।
- খুব কম সংখ্যক কণা সামান্য কোণে বিচ্যুত হয়েছে।
- প্রতি ১২০০০ কণার মধ্যে ১টি কণা সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ফিরে এসেছে।
উপসংহার: এই পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে রাদারফোর্ড বলেন যে পরমাণুর বেশিরভাগ স্থান ফাঁকা। পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে একটি ভারী ও ধনাত্মক আধানযুক্ত অংশ আছে, যার নাম নিউক্লিয়াস। পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভরই নিউক্লিয়াসের মধ্যে কেন্দ্রীভূত থাকে।
৪. বোরের পরমাণু মডেল (Bohr's Model of Atom)
রাদারফোর্ডের মডেলের কিছু ত্রুটি দূর করতে নীলস বোর ১৯১৩ সালে একটি উন্নত মডেল প্রস্তাব করেন:
- ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসের চারপাশে নির্দিষ্ট কিছু বৃত্তাকার পথে ঘোরে, যেগুলিকে শক্তিস্তর বা কক্ষপথ $(\text{Orbits / Shells})$ বলা হয়।
- এই কক্ষপথগুলিকে সাধারণত $\text{K, L, M, N}$ ইত্যাদি অক্ষর দিয়ে বা $\text{n} = 1, 2, 3, 4$ সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।
- কক্ষপথে ঘোরার সময় ইলেকট্রনগুলি শক্তি বিকিরণ করে না।
৫. ইলেকট্রন বিন্যাস (Electronic Configuration)
বিভিন্ন শক্তিস্তরে ইলেকট্রন কীভাবে বিন্যস্ত থাকে তা বোর-বেরি স্কিমের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। কোনো কক্ষপথে সর্বোচ্চ ইলেকট্রন ধারণ ক্ষমতা বোঝার সূত্রটি হলো $2n^2$, যেখানে $n$ হলো কক্ষপথের সংখ্যা।
- প্রথম কক্ষপথ বা $\text{K}$ শেল ($n=1$): সর্বোচ্চ ইলেকট্রন $= 2(1)^2 = 2$
- দ্বিতীয় কক্ষপথ বা $\text{L}$ শেল ($n=2$): সর্বোচ্চ ইলেকট্রন $= 2(2)^2 = 8$
- তৃতীয় কক্ষপথ বা $\text{M}$ শেল ($n=3$): সর্বোচ্চ ইলেকট্রন $= 2(3)^2 = 18$
৬. যোজ্যতা (Valency)
কোনো মৌলের পরমাণুর বাইরেরতম কক্ষপথে উপস্থিত ইলেকট্রনকে যোজক ইলেকট্রন বলে। বাইরের কক্ষপথ সম্পূর্ণ করার জন্য যে পরিমাণ ইলেকট্রন আদান-প্রদান বা অংশীদারিত্ব ঘটে, তাকে ওই মৌলের যোজ্যতা বলে। যেমন, সোডিয়ামের যোজ্যতা ১ এবং ক্লোরিনের যোজ্যতাও ১।
৭. আইসোটোপ এবং আইসোবার
- আইসোটোপ (Isotopes): যে সমস্ত পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা বা পারমাণবিক সংখ্যা একই কিন্তু ভরসংখ্যা আলাদা, তাদের আইসোটোপ বলে। যেমন—হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপ: প্রোটিয়াম, ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম।
- আইসোবার (Isobars): যে সমস্ত পরমাণুর ভরসংখ্যা সমান কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা ভিন্ন, তাদের আইসোবার বলে। যেমন—আর্গন এবং ক্যালসিয়াম।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলের প্রধান ত্রুটি কী ছিল?
উত্তর: রাদারফোর্ডের মডেলে বলা হয়েছিল ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসের চারপাশে বৃত্তাকার পথে ঘোরে। কিন্তু ক্লাসিক্যাল পদার্থবিদ্যা অনুযায়ী, বৃত্তাকার পথে ঘোরার সময় ত্বরান্বিত আধানযুক্ত কণা ক্রমাগত শক্তি বিকিরণ করে। ফলে ইলেকট্রনগুলি শক্তি হারিয়ে নিউক্লিয়াসে গিয়ে পড়ার কথা এবং পরমাণু ধ্বংস হওয়ার কথা। কিন্তু পরমাণু স্থিতিশীল, যা রাদারফোর্ড ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
প্রশ্ন ২: আইসোটোপের দুটি ব্যবহার উল্লেখ করুন।
উত্তর: ১) ইউরেনিয়ামের একটি আইসোটোপ পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২) কোবাল্টের আইসোটোপ ক্যান্সার রোগের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপিতে ব্যবহার করা হয়।
প্রশ্ন ৩: পারমাণবিক সংখ্যা এবং ভরসংখ্যার মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: কোনো মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে উপস্থিত প্রোটন সংখ্যাকে পারমাণবিক সংখ্যা ($Z$) বলে। অন্যদিকে, প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যাকে পরমাণুর ভরসংখ্যা ($A$) বলা হয়।
সারসংক্ষেপ
- পরমাণু মূলত তিনটি কণা নিয়ে গঠিত: ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন।
- থমসনের তরমুজ মডেল এবং রাদারফোর্ডের আলফা বিচ্ছুরণ পরীক্ষার মাধ্যমে পরমাণুর ভিতরের জগৎ উন্মোচিত হয়েছে।
- নীলস বোরের শক্তিস্তর তত্ত্ব এবং ইলেকট্রন বিন্যাস ($2n^2$ সূত্র) পরমাণুর স্থিতিশীলতা ব্যাখ্যা করে।
- ভিন্ন পারমাণবিক ভরের একই মৌলের পরমাণুগুলিকে আইসোটোপ বলা হয়।