সুমনা: স্যার, আজ যখন আমরা পাটিগণিতের অঙ্ক করছিলাম, তখন বার বার এই 'বাস্তব সংখ্যা' শব্দটা আসছিল। আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে – এই বাস্তব সংখ্যা ঠিক কী জিনিস? আমরা তো স্বাভাবিক সংখ্যা, পূর্ণ সংখ্যা, পরিমেয় সংখ্যা – এত কিছু শিখলাম, তাহলে আবার এই বাস্তব সংখ্যা কেন?

অঙ্ক স্যার: খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছ সুমনা! তোমার প্রশ্নটা খুবই প্রাসঙ্গিক এবং দশম শ্রেণির গণিতের এই প্রথম অধ্যায়টির মূল বিষয়। তুমি ঠিকই বলেছ, আমরা ছোটবেলা থেকে ধাপে ধাপে সংখ্যার জগতকে চিনতে শিখেছি। প্রথমে আমরা গণনা করতে শিখেছি ১, ২, ৩... এই স্বাভাবিক সংখ্যাগুলো দিয়ে। এরপর যখন 'কিছু নেই' বোঝানোর প্রয়োজন হলো, তখন আমরা পেলাম শূন্যকে, আর শূন্যকে স্বাভাবিক সংখ্যার সাথে যোগ করে তৈরি হলো পূর্ণ সংখ্যা (০, ১, ২, ৩...)। যখন ঋণাত্মক দিকের সংখ্যাগুলোর প্রয়োজন হলো, তখন আমরা পূর্ণসংখ্যাগুলো পেলাম (...-২, -১, ০, ১, ২, ...)। এরপর যে সংখ্যাগুলোকে ভগ্নাংশ আকারে অর্থাৎ p/q রূপে প্রকাশ করা যায়, যেখানে q ≠ 0 এবং p, q পূর্ণসংখ্যা, সেগুলোকে আমরা বলি পরিমেয় সংখ্যা। এগুলো নিয়ে অষ্টম শ্রেণিতে বিস্তারিত আলোচনা করেছ। কিন্তু গণিত এখানেই থেমে থাকে না। সংখ্যারেখায় এমন কিছু বিন্দু রয়ে গেছে, যেগুলো কোনো পরিমেয় সংখ্যা নয়! আর সেই বিন্দুগুলোকেই আমরা বলি অপরিমেয় সংখ্যা। এই সমস্ত পরিচিত সংখ্যা এবং অপরিচিত সংখ্যা (যেমন √২, π) – এদের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে তৈরি হয় যে বিশাল পরিবার, সেটাই হলো বাস্তব সংখ্যা। এদেরকে ইংরেজি অক্ষর 'R' দিয়ে প্রকাশ করা হয়। বাস্তব সংখ্যাকে একটি সংখ্যারেখায় (number line) উপস্থাপন করা যায় এবং এই সংখ্যারেখাটি বাস্তব সংখ্যা দ্বারা সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ থাকে, অর্থাৎ এর উপর কোনো ফাঁকা স্থান থাকে না। চলো, আজ আমরা এই 'বাস্তব সংখ্যা'র বিশাল জগতটা একদম গোড়া থেকে খুঁটিয়ে দেখব, যাতে তোমার সব দ্বিধা দূর হয়ে যায়।

সুমনা: বাহ, দারুণ হবে স্যার! আমার সত্যিই খুব কৌতূহল হচ্ছে। তাহলে আমরা কোথা থেকে শুরু করব?

অঙ্ক স্যার: আমরা শুরু করব 'বাস্তব সংখ্যা' আসলে কী, সেটা আরও গভীরভাবে বোঝার মধ্য দিয়ে। যেমনটা বললাম, বাস্তব সংখ্যা হলো পরিমেয় সংখ্যা (Rational Numbers) এবং অপরিমেয় সংখ্যা (Irrational Numbers) – এই দুই প্রকার সংখ্যার সমষ্টি। তুমি বাস্তব সংখ্যাকে সংখ্যার একটা বিশাল ছাদের মতো ভাবতে পারো, যার নিচে স্বাভাবিক সংখ্যা, পূর্ণ সংখ্যা, পূর্ণসংখ্যা, ভগ্নাংশ, দশমিক – সব ধরনের সংখ্যাই আশ্রয় পায়। এই বাস্তব সংখ্যার জগতটাই হলো সেই গণিত ক্ষেত্র যা দিয়ে আমরা আমাদের চারপাশের জগতকে পরিমাপ ও বর্ণনা করি। তাপমাত্রা, দূরত্ব, গতি, আয়তন – সবকিছুই বাস্তব সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হয়। গণিতবিদরা এই সংখ্যাগুলোকে কেন এত গুরুত্ব দেন, সেটা বোঝার জন্য আমাদের দুটি মৌলিক ধারণার ওপর জোর দিতে হবে: ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া উপপাদ্য এবং পাটিগণিতের মৌলিক উপপাদ্য। এই দুটি ধারণা শুধু সংখ্যার বৈশিষ্ট্যই বোঝায় না, বরং অনেক ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও কাজে লাগে, যেমন কম্পিউটার অ্যালগরিদম তৈরি বা ক্রিপ্টোগ্রাফি।

ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া উপপাদ্য (Euclid's Division Lemma)

অঙ্ক স্যার: চলো, প্রথমে ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া উপপাদ্য নিয়ে কথা বলি। নামটা শুনে একটু পুরনো দিনের গণিত মনে হতে পারে, কারণ ইউক্লিড তো প্রায় ২৩০০ বছর আগেকার গ্রীক গণিতজ্ঞ ছিলেন! কিন্তু তার এই ধারণাটা আজও গণিতে খুব শক্তিশালী এবং প্রাসঙ্গিক। এই উপপাদ্যের মূল কথা তুমি ছোটবেলায় ভাগ করার সময়ই শিখে ফেলেছ, শুধু হয়তো জানো না যে এটাই ইউক্লিডের উপপাদ্য। ধরো, তুমি কোনো একটি সংখ্যাকে (যেমন, ১৭) অন্য একটি সংখ্যা (যেমন, ৫) দিয়ে ভাগ করছ। কী পাও?

সুমনা: ১৭ কে ৫ দিয়ে ভাগ করলে ভাগফল হয় ৩ এবং ভাগশেষ হয় ২।

অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক বলেছ! এটাকে আমরা কীভাবে লিখি? ১৭ = ৫ × ৩ + ২, তাই না?

সুমনা: হ্যাঁ, স্যার। এটা তো ভাজ্য = ভাজক × ভাগফল + ভাগশেষ।

অঙ্ক স্যার: ঠিক ধরেছ! এটাই হলো ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া উপপাদ্যের মূল কথা। এটি বলে যে, যদি আমাদের দুটি ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা 'a' (ভাজ্য) এবং 'b' (ভাজক) থাকে, তাহলে আমরা এমন দুটি অদ্বিতীয় পূর্ণসংখ্যা 'q' (ভাগফল) এবং 'r' (ভাগশেষ) খুঁজে পাব যেন a = bq + r হয়। এখানে একটি শর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ: 0 ≤ r < b

সুমনা: 0 ≤ r < b মানে কি স্যার? এই অংশটা কেন এত জরুরি?

অঙ্ক স্যার: এর মানে হলো, ভাগশেষ 'r' সবসময় শূন্যের সমান বা শূন্যের চেয়ে বড় হবে, কিন্তু যে সংখ্যা দিয়ে ভাগ করছ, অর্থাৎ 'b' (ভাজক), তার চেয়ে ছোট হবে। আমাদের ১৭ ও ৫ এর উদাহরণে, ভাগশেষ ছিল ২। এই ২, শূন্যের চেয়ে বড় কিন্তু ৫ এর চেয়ে ছোট। এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? যদি ভাগশেষ ভাজকের সমান বা তার থেকে বড় হয়, তাহলে তো আরও একবার ভাগ করা যেত, তাহলে তো সেটা প্রকৃত ভাগশেষ হতো না! এই শর্তটা নিশ্চিত করে যে ভাগশেষটা সর্বদা সম্ভাব্য ক্ষুদ্রতম ধনাত্মক মান হবে। এই উপপাদ্যটি 'অদ্বিতীয়' কারণ দুটি নির্দিষ্ট সংখ্যা 'a' ও 'b' এর জন্য তুমি সবসময় একই 'q' ও 'r' পাবে। তুমি বা আমি বা অন্য কেউ যেই ভাগ করুক না কেন, একই ভাগফল ও ভাগশেষ আসবে।

সুমনা: হ্যাঁ, এটা তো খুবই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু স্যার, এই উপপাদ্যটা আমরা কোথায় ব্যবহার করব? শুধু ভাগফল আর ভাগশেষ বের করার জন্য?

অঙ্ক স্যার: না সুমনা, এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যবহারিক প্রয়োগ হলো দুটি ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যার গসাগু (গরিষ্ঠ সাধারণ গুণনীয়ক) নির্ণয় করা। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া অ্যালগরিদম। অ্যালগরিদম শব্দটি কম্পিউটার বিজ্ঞানে খুব ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ একটি নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানের জন্য ধাপে ধাপে নির্দেশাবলীর একটি সুসংজ্ঞায়িত সেট। এই ইউক্লিডীয় অ্যালগরিদম প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিদ্যা এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক গণনায় ব্যবহৃত হতো, এবং আজও এর গুরুত্ব অপরিসীম।

গসাগু নির্ণয়ে ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া অ্যালগরিদম

অঙ্ক স্যার: ধরো, আমরা ১৩৫ এবং ২২২-এর গসাগু বের করতে চাই। এই দুটি সংখ্যা দিয়ে তুমি যদি মৌলিক উৎপাদক বিশ্লেষণ করতে যাও, তাহলে একটু সময় লাগতে পারে। সেখানেই ইউক্লিডের অ্যালগরিদম আমাদের খুব দ্রুত এবং পদ্ধতিগতভাবে সাহায্য করে। স্টেপ বাই স্টেপ দেখো:

  • ধাপ ১: বড় সংখ্যাটিকে 'a' এবং ছোট সংখ্যাটিকে 'b' ধরো। এখানে, a = ২২২ এবং b = ১৩৫। এখন ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া উপপাদ্য প্রয়োগ করে a = bq + r আকারে লেখো।
    ২২২ = ১৩৫ × ১ + ৮৭ (এখানে ভাগফল q=১, ভাগশেষ r=৮৭)
  • ধাপ ২: যদি ভাগশেষ 'r' শূন্য না হয় (এখানে ৮৭), তাহলে এবার ভাজক 'b' কে নতুন 'a' এবং ভাগশেষ 'r' কে নতুন 'b' ধরো। অর্থাৎ, পূর্বের ভাজক হয় নতুন ভাজ্য, আর পূর্বের ভাগশেষ হয় নতুন ভাজক।
    এখন, a = ১৩৫ এবং b = ৮৭।
    ১৩৫ = ৮৭ × ১ + ৪৮ (ভাগফল q=১, ভাগশেষ r=৪৮)
  • ধাপ ৩: আবার ভাগশেষ শূন্য হয়নি (৪৮)। তাহলে, a = ৮৭ এবং b = ৪৮।
    ৮৭ = ৪৮ × ১ + ৩৯ (ভাগফল q=১, ভাগশেষ r=৩৯)
  • ধাপ ৪: ভাগশেষ শূন্য হয়নি (৩৯)। তাহলে, a = ৪৮ এবং b = ৩৯।
    ৪৮ = ৩৯ × ১ + ৯ (ভাগফল q=১, ভাগশেষ r=৯)
  • ধাপ ৫: ভাগশেষ শূন্য হয়নি (৯)। তাহলে, a = ৩৯ এবং b = ৯।
    ৩৯ = ৯ × ৪ + ৩ (ভাগফল q=৪, ভাগশেষ r=৩)
  • ধাপ ৬: ভাগশেষ শূন্য হয়নি (৩)। তাহলে, a = ৯ এবং b = ৩।
    ৯ = ৩ × ৩ + ০ (ভাগফল q=৩, ভাগশেষ r=০)

অঙ্ক স্যার: এই তো! অবশেষে ভাগশেষ শূন্য হলো। যেই ধাপে ভাগশেষ শূন্য হয়, সেই ধাপের ভাজকটাই (b) হলো আমাদের নির্ণেয় গসাগু। এখানে, শেষ ধাপে ভাজক ছিল ৩। সুতরাং, ১৩৫ এবং ২২২-এর গসাগু হলো ৩। এই পদ্ধতিটি ক্রমাগত ভাগ করে যাওয়া যতক্ষণ না ভাগশেষ শূন্য হয়, আর শেষ অ-শূন্য ভাগশেষের ভাজকটিই গসাগু।

সুমনা: বাহ, এটা তো বেশ সহজ মনে হচ্ছে! শুধু পর পর ভাগ করে যেতে হবে। আর স্যার, ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া উপপাদ্য আর অ্যালগরিদম – এই দুটোর মধ্যে পার্থক্যটা যদি আরেকবার সংক্ষেপে বলেন?

অঙ্ক স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন সুমনা! 'উপপাদ্য' (Lemma) হলো একটি প্রমাণিত বিবৃতি যা অন্য কোনো বিবৃতি প্রমাণ করতে সাহায্য করে। ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া উপপাদ্যটি একটি মৌলিক গাণিতিক সত্য যা বলে যে a = bq + r সম্পর্কটি সবসময় সত্য হবে এবং qr অদ্বিতীয় হবে। আর 'অ্যালগরিদম' (Algorithm) হলো একটি নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানের জন্য ধাপে ধাপে নির্দেশাবলীর একটি সেট। ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া অ্যালগরিদম হলো গসাগু নির্ণয়ের জন্য ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া উপপাদ্য ব্যবহার করার একটি ধাপে ধাপে কার্যকরী পদ্ধতি। অর্থাৎ, উপপাদ্য একটি সত্যকে বর্ণনা করে, আর অ্যালগরিদম সেই সত্যকে ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার কৌশল শেখায়। আশা করি, এখন পরিষ্কার হয়েছে।

সুমনা: একদম পরিষ্কার স্যার! এটা আমার কনসেপ্ট আরও শক্ত করল।

পাটিগণিতের মৌলিক উপপাদ্য (Fundamental Theorem of Arithmetic)

অঙ্ক স্যার: এবার আসি গণিতের আরও একটি শক্তিশালী স্তম্ভ – পাটিগণিতের মৌলিক উপপাদ্যে। এর নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি পাটিগণিতের একেবারে ভিত্তি। এই উপপাদ্যটি বলে যে, ১ এর চেয়ে বড় যেকোনো যৌগিক সংখ্যাকে মৌলিক উৎপাদকগুলির গুণফল হিসাবে অদ্বিতীয়ভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে, এবং এই উৎপাদকগুলির ক্রম পরিবর্তন করা হলেও তা একই থাকে।

সুমনা: 'যৌগিক সংখ্যা' আর 'মৌলিক উৎপাদক' – এই দুটো কি আরেকবার মনে করিয়ে দেবেন স্যার?

অঙ্ক স্যার: অবশ্যই। 'মৌলিক সংখ্যা' হলো সেইসব সংখ্যা যাদের ১ এবং শুধুমাত্র সেই সংখ্যাটি ছাড়া অন্য কোনো গুণনীয়ক নেই। যেমন, ২, ৩, ৫, ৭, ১১ ইত্যাদি। আর 'যৌগিক সংখ্যা' হলো সেইসব সংখ্যা যাদের ১ এবং সেই সংখ্যাটি ছাড়াও অন্য গুণনীয়ক থাকে। যেমন, ৪, ৬, ৮, ৯, ১০, ১২ ইত্যাদি। এখন মৌলিক উৎপাদক মানে হলো, যখন আমরা একটি যৌগিক সংখ্যাকে ভাঙছি, তখন যে উৎপাদকগুলো পাব, সেগুলো যেন মৌলিক সংখ্যা হয়।

অঙ্ক স্যার: এবার উপপাদ্যটির মূল ব্যাখ্যায় আসি। ধরো, আমরা একটি যৌগিক সংখ্যা নিলাম, যেমন ৩৬। আমরা ৩৬ কে মৌলিক উৎপাদকে ভাঙতে পারি। কী কী মৌলিক সংখ্যা দিয়ে ৩৬ কে ভাগ করা যায়?

সুমনা: ৩৬ কে ২ দিয়ে ভাগ করলে ১৮, আবার ২ দিয়ে ভাগ করলে ৯, এরপর ৩ দিয়ে ভাগ করলে ৩। তাহলে, ৩৬ = ২ × ২ × ৩ × ৩, বা ২² × ৩²।

অঙ্ক স্যার: ঠিক ধরেছ। এই ২ এবং ৩ হলো মৌলিক সংখ্যা। তুমি কি ৩৬ কে অন্য কোনো মৌলিক সংখ্যার গুণফল হিসেবে প্রকাশ করতে পারবে? যেখানে উৎপাদকগুলো আলাদা হবে বা তাদের সংখ্যা আলাদা হবে?

সুমনা: না স্যার। যদি আমি ক্রম পরিবর্তন করি, যেমন ৩ × ২ × ৩ × ২, তাহলেও উৎপাদকগুলো একই থাকে: দুটি ২ এবং দুটি ৩। আমি অন্য কোনো মৌলিক সংখ্যা, যেমন ৫ বা ৭, দিয়ে ৩৬ কে ভাগ করতে পারব না।

অঙ্ক স্যার: একদম তাই! এটাই হলো উপপাদ্যের মূল কথা, 'অদ্বিতীয়তা'। যেকোনো যৌগিক সংখ্যাকে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট উপায়ে মৌলিক সংখ্যার গুণফল হিসেবে লেখা যায়। এই উৎপাদকগুলো অদ্বিতীয়। এটিই পাটিগণিতের মৌলিক উপপাদ্য। এর অর্থ হলো, প্রতিটি যৌগিক সংখ্যার জন্য একটি অনন্য 'DNA' বা গঠন আছে, যা শুধুমাত্র সেই সংখ্যাটিকে চিহ্নিত করে। এই উপপাদ্যটি ক্রিপ্টোগ্রাফি, বিশেষ করে RSA অ্যালগরিদম, যা ইন্টারনেটে সুরক্ষিত লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত হয়, তার ভিত্তি তৈরি করে।

মৌলিক উপপাদ্যের প্রয়োগ: গসাগু এবং লসাগু

অঙ্ক স্যার: এই উপপাদ্যটি ব্যবহার করে আমরা দুটি বা তার বেশি সংখ্যার গসাগু (HCF) এবং লসাগু (LCM) খুব সহজে বের করতে পারি। চলো, একটি উদাহরণ দেখি। ধরো, আমাদের ৭২ এবং ১২০ এর গসাগু এবং লসাগু বের করতে হবে।

সুমনা: এটা তো আমরা ছোটবেলায়ও শিখেছি, স্যার! কিন্তু এই উপপাদ্য ব্যবহার করে কীভাবে করব?

অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, সুমনা, তুমি মৌলিক উৎপাদক বিশ্লেষণ শিখেছ, এখন আমরা সেই জ্ঞানকে এই উপপাদ্যের প্রেক্ষাপটে দেখব।
প্রথমে, সংখ্যাগুলোর মৌলিক উৎপাদক বিশ্লেষণ করি:

  • ৭২ = ২ × ২ × ২ × ৩ × ৩ = ২³ × ৩²
  • ১২০ = ২ × ২ × ২ × ৩ × ৫ = ২³ × ৩¹ × ৫¹

অঙ্ক স্যার: এখন, গসাগু (HCF) বের করার জন্য আমরা উভয় সংখ্যার মৌলিক উৎপাদকগুলোর মধ্যে যে সাধারণ উৎপাদকগুলো আছে, সেগুলোর সর্বনিম্ন ঘাত (power) নেব।
এখানে, সাধারণ মৌলিক উৎপাদক হলো ২ এবং ৩।

  • ২ এর জন্য: ৭২-এ আছে ২³ এবং ১২০-এ আছে ২³। সর্বনিম্ন ঘাত হলো ২³।
  • ৩ এর জন্য: ৭২-এ আছে ৩² এবং ১২০-এ আছে ৩¹। সর্বনিম্ন ঘাত হলো ৩¹।

সুমনা: তাহলে গসাগু হবে ২³ × ৩¹ = ৮ × ৩ = ২৪?

অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক। HCF (৭২, ১২০) = ২৪।

অঙ্ক স্যার: লসাগু (LCM) এর জন্য আমরা উভয় সংখ্যার সব মৌলিক উৎপাদকগুলো নেব, এবং সেগুলোর সর্বোচ্চ ঘাত নেব।

  • ৭২-এর উৎপাদক: ২³, ৩²
  • ১২০-এর উৎপাদক: ২³, ৩¹, ৫¹

অঙ্ক স্যার: সর্বোচ্চ ঘাতগুলো হলো:

  • ২ এর সর্বোচ্চ ঘাত হলো ২³ (উভয় ক্ষেত্রেই)।
  • ৩ এর সর্বোচ্চ ঘাত হলো ৩² (৭২ থেকে)।
  • ৫ এর সর্বোচ্চ ঘাত হলো ৫¹ (১২০ থেকে)।

সুমনা: তাহলে লসাগু হবে ২³ × ৩² × ৫¹ = ৮ × ৯ × ৫ = ৭২ × ৫ = ৩৬০?

অঙ্ক স্যার: একেবারে সঠিক! LCM (৭২, ১২০) = ৩৬০।
আরেকটা মজার সম্পর্ক আছে: দুটি ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা 'a' এবং 'b'-এর জন্য, HCF (a, b) × LCM (a, b) = a × b। এই সম্পর্কটা শুধুমাত্র দুটি সংখ্যার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, তিন বা তার বেশি সংখ্যার ক্ষেত্রে নয়।
এই উদাহরণে পরীক্ষা করে দেখি:
HCF(৭২, ১২০) × LCM(৭২, ১২০) = ২৪ × ৩৬০ = ৮৬৪০।
এবং a × b = ৭২ × ১২০ = ৮৬৪০।
দেখলে তো, সম্পর্কটা মিলে গেল! এই উপপাদ্যটি সংখ্যার জগতকে আরও সুসংগঠিতভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

সুমনা: হ্যাঁ স্যার, এটা তো খুব ইন্টারেস্টিং! মৌলিক উৎপাদক দিয়ে গসাগু-লসাগু বের করার এই পদ্ধতিটা অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে।

অপরিমেয় সংখ্যার পুনরাবৃত্তি (Revisiting Irrational Numbers)

অঙ্ক স্যার: আমরা যখন বাস্তব সংখ্যা নিয়ে কথা বলছি, তখন অপরিমেয় সংখ্যাগুলোকেও কোনোভাবে বাদ দেওয়া যায় না। মনে আছে তো, অপরিমেয় সংখ্যা কাদের বলি?

সুমনা: হ্যাঁ স্যার, যে সংখ্যাগুলোকে p/q আকারে প্রকাশ করা যায় না, যেখানে q ≠ 0 এবং p, q পূর্ণসংখ্যা। যেমন √২, √৩, √৫, π। এদের দশমিক প্রসারণ অসীম এবং অনাবৃত হয়।

অঙ্ক স্যার: একদম সঠিক। নবম শ্রেণিতে তোমরা জেনেছ যে, পরিমেয় এবং অপরিমেয় সংখ্যা উভয়ই বাস্তব সংখ্যা। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে প্রমাণ করা যায় যে √২, √৩, √৫ ইত্যাদি অপরিমেয় সংখ্যা। এটি গণিতের একটি ক্লাসিক প্রমাণ এবং এর মাধ্যমে আমরা গাণিতিক যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে শিখব।

অঙ্ক স্যার: অপরিমেয় সংখ্যা প্রমাণের জন্য আমরা সাধারণত 'পরোক্ষ প্রমাণ' (proof by contradiction) পদ্ধতি ব্যবহার করি। এই পদ্ধতিটি এমন যে, আমরা প্রথমে ধরে নিই যে আমরা যা প্রমাণ করতে চাইছি, তার বিপরীতটা সত্য। অর্থাৎ, আমরা ধরে নিই যে √২ একটি অপরিমেয় সংখ্যা নয়, বরং একটি পরিমেয় সংখ্যা। তারপর কিছু গাণিতিক ধাপ অনুসরণ করে আমরা এমন একটি পরিস্থিতিতে পৌঁছাই যা আমাদের প্রাথমিক ধারণার (যে √২ পরিমেয়) সাথে সাংঘর্ষিক। এর ফলে আমাদের প্রাথমিক ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হয় এবং আমরা সিদ্ধান্তে আসি যে সংখ্যাটি অপরিমেয়। এটা অনেকটা গোয়েন্দাদের কাজ করার মতো, যেখানে তারা প্রথমে একটি অনুমান করে এবং তারপর প্রমাণ খুঁজতে খুঁজতে যদি দেখেন যে অনুমানটি ভুল, তাহলে বিপরীতটা সত্য বলে ধরে নেন।

সুমনা: মানে, আমরা প্রথমে ধরে নেব √২ একটি পরিমেয় সংখ্যা, তারপর যদি দেখি যে এটা সম্ভব নয়, তাহলে √২ অপরিমেয়?

অঙ্ক স্যার: ঠিক বলেছ! চলো, √২ এর জন্য এই প্রমাণটি সংক্ষেপে দেখি:
ধাপ ১: অনুমান: ধরা যাক √২ একটি পরিমেয় সংখ্যা।
ধাপ ২: পরিমেয় রূপ: যেহেতু √২ পরিমেয়, তাই এটিকে a/b আকারে লেখা যাবে, যেখানে b ≠ 0 এবং ab দুটি পূর্ণসংখ্যা যাদের মধ্যে ১ ছাড়া কোনো সাধারণ গুণনীয়ক নেই (অর্থাৎ, ab সহমৌলিক)।
ধাপ ৩: বর্গ করা: উভয় পক্ষকে বর্গ করলে পাই: 2 = a²/b², অর্থাৎ a² = 2b²
ধাপ ৪: প্রথম সিদ্ধান্ত: এই সমীকরণ থেকে বোঝা যায় যে একটি জোড় সংখ্যা, কারণ এটি ২ এর গুণিতক। আমরা জানি, যদি কোনো পূর্ণসংখ্যার বর্গ জোড় হয়, তাহলে সেই পূর্ণসংখ্যাটিও জোড় হয়। সুতরাং, a ও জোড় সংখ্যা হবে।
ধাপ ৫: 'a' এর প্রতিস্থাপন: যদি a জোড় সংখ্যা হয়, তাহলে a কে 2c আকারে লেখা যায়, যেখানে c একটি পূর্ণসংখ্যা।
ধাপ ৬: সমীকরণে স্থাপন: এবার এই a = 2c মানটি a² = 2b² সমীকরণে বসালে পাই:
(2c)² = 2b²
4c² = 2b²
উভয় পক্ষকে ২ দিয়ে ভাগ করলে: 2c² = b²
ধাপ ৭: দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত: এই সমীকরণ থেকে বোঝা যায় যে একটি জোড় সংখ্যা। এবং যেহেতু জোড়, তাই b ও একটি জোড় সংখ্যা।
ধাপ ৮: অসঙ্গতি: এখন দেখো, আমরা শুরুতে ধরেছিলাম a এবং b সহমৌলিক, অর্থাৎ তাদের ১ ছাড়া কোনো সাধারণ গুণনীয়ক নেই। কিন্তু আমরা প্রমাণ করলাম যে a জোড় এবং b ও জোড়। এর মানে হলো, উভয় সংখ্যারই একটি সাধারণ গুণনীয়ক আছে, যা হলো ২। এটি আমাদের প্রাথমিক ধারণার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সাংঘর্ষিক!
ধাপ ৯: উপসংহার: সুতরাং, আমাদের ধরে নেওয়াটাই ভুল ছিল যে √২ একটি পরিমেয় সংখ্যা। তাই, √২ অবশ্যই একটি অপরিমেয় সংখ্যা।

সুমনা: ওহ, এটা তো বেশ লজিক্যাল! যদিও প্রমাণটা একটু কঠিন মনে হচ্ছে, কিন্তু মূল ধারণাটা আমি বুঝতে পারছি – প্রথমে উল্টোটা ধরে নিয়ে তারপর দেখব যে সেটা সম্ভব নয়।

অঙ্ক স্যার: দারুণ! এই পদ্ধতিটা তোমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাই নয়, যদি একটি পরিমেয় সংখ্যা এবং একটি অপরিমেয় সংখ্যার যোগ, বিয়োগ, গুণ বা ভাগ করা হয় (যদি ভাজক শূন্য না হয়), তবে ফলাফল সাধারণত অপরিমেয় সংখ্যাই হয়।
যেমন, 5 + √2 (একটি পরিমেয় ও একটি অপরিমেয় সংখ্যার যোগফল), 3√5 (একটি পরিমেয় ও একটি অপরিমেয় সংখ্যার গুণফল), 7/√3 (একটি পরিমেয় ও একটি অপরিমেয় সংখ্যার ভাগফল) - এগুলো সবই অপরিমেয় সংখ্যা। এই ধরনের মিশ্র অপারেশন থেকে প্রাপ্ত ফল সবসময় অপরিমেয় হয়, কারণ পরিমেয় সংখ্যাগুলো গাণিতিক অপারেশনে স্থিতিশীল থাকে, কিন্তু অপরিমেয় সংখ্যা তার অসীম, অনাবৃত প্রকৃতির কারণে অন্য সংখ্যাকেও সেই প্রকৃতিতে টেনে নেয়।

পরিমেয় সংখ্যা এবং তাদের দশমিক প্রসারণের পুনরাবৃত্তি (Revisiting Rational Numbers and their Decimal Expansions)

অঙ্ক স্যার: এবার চলো, পরিমেয় সংখ্যা এবং তাদের দশমিক প্রসারণ নিয়ে আরও একটু বিস্তারিত কথা বলি। অষ্টম শ্রেণিতে আমরা শিখেছি যে, একটি পরিমেয় সংখ্যার দশমিক প্রসারণ হয় সসীম (terminating) অথবা আবৃত (non-terminating repeating)। সসীম দশমিক মানে হলো দশমিকের পর অঙ্কগুলোর একটি নির্দিষ্ট শেষ আছে, যেমন ০.৫ বা ০.৭৫। আর আবৃত দশমিক মানে হলো দশমিকের পর অঙ্কগুলো বারবার একই ক্রমে ফিরে আসে, যেমন ০.৩৩৩... বা ০.১২২২২...।

সুমনা: হ্যাঁ স্যার, মনে আছে। কিন্তু আমরা কি কোনো ভাগ না করেই বলতে পারি যে দশমিক প্রসারণ সসীম হবে নাকি আবৃত?

অঙ্ক স্যার: একদম! এই অধ্যায়ে আমরা শিখব, কোনো ভাগ না করেই কীভাবে একটি পরিমেয় সংখ্যার p/q রূপ দেখে আমরা বলতে পারি যে এর দশমিক প্রসারণ সসীম হবে নাকি আবৃত হবে। এটি একটি খুব কার্যকরী নিয়ম।

অঙ্ক স্যার: একটি পরিমেয় সংখ্যা x = p/q (যেখানে q ≠ 0 এবং p, q সহমৌলিক) এর দশমিক প্রসারণ সসীম হবে, যদি q এর মৌলিক উৎপাদক বিশ্লেষণ করলে শুধুমাত্র ২ বা ৫ অথবা উভয়ই থাকে। অর্থাৎ, q কে 2^n × 5^m আকারে প্রকাশ করা যায়, যেখানে n এবং m অঋণাত্মক পূর্ণসংখ্যা (অর্থাৎ, ০ বা ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা)। এর কারণ হলো আমাদের সংখ্যা পদ্ধতি দশমিক বা Base-10-এ চলে, যা ১০ এর উপর ভিত্তি করে গঠিত। আর ১০ এর মৌলিক উৎপাদক হলো ২ এবং ৫। তাই, যদি হরের (denominator) মৌলিক উৎপাদকে শুধুমাত্র ২ এবং ৫ থাকে, তাহলে তাকে সহজেই ১০ এর ঘাত দিয়ে গুণ করে পূর্ণসংখ্যায় রূপান্তর করা যায়, ফলে সসীম দশমিক পাওয়া যায়।

সুমনা: তার মানে, যদি q এর উৎপাদকে ২ আর ৫ ছাড়া অন্য কোনো মৌলিক সংখ্যা থাকে, তাহলে সেটা আবৃত দশমিক হবে?

অঙ্ক স্যার: ঠিক ধরেছ! যদি q এর মৌলিক উৎপাদকে ২ বা ৫ ছাড়া অন্য কোনো মৌলিক সংখ্যা থাকে (যেমন ৩, ৭, ১১, ১৩ ইত্যাদি), তাহলে সেই পরিমেয় সংখ্যার দশমিক প্রসারণ আবৃত দশমিক হবে।
চলো কিছু উদাহরণ দেখি:

  • 3/8: এখানে q = 8 = 2³। শুধুমাত্র ২ আছে (এখানে ৫ এর ঘাত ০ ধরে নেওয়া যায়: 2³ × 5⁰)। তাই এটি সসীম দশমিক। 3/8 = 0.375
  • 13/125: এখানে q = 125 = 5³। শুধুমাত্র ৫ আছে (এখানে ২ এর ঘাত ০ ধরে নেওয়া যায়: 2⁰ × 5³)। তাই এটি সসীম দশমিক। 13/125 = 0.104
  • 7/20: এখানে q = 20 = 2² × 5¹। ২ এবং ৫ উভয়ই আছে। তাই এটি সসীম দশমিক। 7/20 = 0.35
  • 1/3: এখানে q = 3। এখানে ২ বা ৫ নেই, শুধুমাত্র ৩ আছে। তাই এটি আবৃত দশমিক। 1/3 = 0.333...
  • 10/21: এখানে q = 21 = 3 × 7। ২ বা ৫ নেই, আছে ৩ এবং ৭। তাই এটি আবৃত দশমিক। 10/21 = 0.476190...

সুমনা: বাহ, এটা তো খুব সহজ একটা নিয়ম! ভাগ না করেই বলে দেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু স্যার, আপনি বলেছিলেন p এবং q সহমৌলিক হতে হবে। এর গুরুত্বটা কী?

অঙ্ক স্যার: খুব ভালো ধরেছ সুমনা! সহমৌলিক হওয়ার শর্তটি অত্যন্ত জরুরি। যদি p এবং q সহমৌলিক না হয়, তাহলে তাদের মধ্যে একটি সাধারণ গুণনীয়ক থাকবে। সেই ক্ষেত্রে প্রথমে সেই গুণনীয়ক দিয়ে লব ও হরকে ভাগ করে সংখ্যাটিকে সরলতম রূপে নিয়ে আসতে হবে। যেমন, 14/35। এখানে p = 14 = 2 × 7 এবং q = 35 = 5 × 7। এখানে ৭ একটি সাধারণ গুণনীয়ক। আমরা যদি এটিকে সরল না করি, তাহলে q = 35 এ ৫ ছাড়া ৭ ও আছে, যা দেখে মনে হতে পারে এটি আবৃত দশমিক। কিন্তু আসলে 14/35 = (2 × 7) / (5 × 7) = 2/5। এখানে q = 5, যা শুধুমাত্র ৫ এর ঘাত রূপে প্রকাশ করা যায়। সুতরাং, 14/35 = 0.4, যা একটি সসীম দশমিক। তাই, যেকোনো পরিমেয় সংখ্যার দশমিক প্রসারণের ধরন বোঝার আগে অবশ্যই তাকে তার সরলতম রূপে নিয়ে আসা উচিত।

সুমনার প্রশ্ন ও অঙ্ক স্যারের উত্তর (Q&A Session)

সুমনা: স্যার, আজকের আলোচনাটা আমার খুব ভালো লেগেছে। আমার মনে আরও কিছু প্রশ্ন আসছে, যদি অনুমতি দেন?

অঙ্ক স্যার: অবশ্যই সুমনা! প্রশ্ন করা মানেই শেখার আগ্রহ। জিজ্ঞাসা করো তোমার যা জানার আছে। এই প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমেই তোমাদের ধারণা আরও স্পষ্ট হয়।

সুমনা: প্রশ্ন ১: স্যার, ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ১৮০ এবং ২২৫-এর গসাগু বের করে দেখাবেন? এই পদ্ধতিটা ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

অঙ্ক স্যার: চমৎকার প্রশ্ন, সুমনা! চলো, আমরা ধাপে ধাপে এটি সমাধান করি।

  • এখানে, বড় সংখ্যা a = 225 এবং ছোট সংখ্যা b = 180
  • ধাপ ১: 225 = 180 × 1 + 45 (ভাগশেষ r = 45, যা শূন্য নয়)
  • ধাপ ২: যেহেতু ভাগশেষ শূন্য নয়, তাই আমরা ভাজক (180) কে নতুন ভাজ্য এবং ভাগশেষ (45) কে নতুন ভাজক হিসেবে ব্যবহার করব।
  • 180 = 45 × 4 + 0 (ভাগশেষ r = 0)
যেহেতু শেষ ধাপে ভাগশেষ ০ হয়েছে এবং সেই ধাপের ভাজক ৪৫, তাই ১৮০ এবং ২২৫-এর গসাগু হলো ৪৫।
ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন, যদি তোমার কাছে ১৮০টি আপেল এবং ২২৫টি কমলা থাকে এবং তুমি চাও যে এমন সমান আকারের ঝুড়ি তৈরি করতে যেখানে প্রতিটি ঝুড়িতে আপেল এবং কমলা উভয়ই থাকবে এবং কোনো ফল অবশিষ্ট থাকবে না, তাহলে প্রতিটি ঝুড়িতে সর্বোচ্চ ৪৫টি আপেল ও ৪৫টি কমলা রাখতে পারবে। এই পদ্ধতিটি গুপ্তবিদ্যা (cryptography), কম্পিউটার অ্যালগরিদম, এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়েও ব্যবহৃত হয়, যেখানে দুটি সংখ্যার মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করা জরুরি।

সুমনা: প্রশ্ন ২: স্যার, আপনি বললেন, পাটিগণিতের মৌলিক উপপাদ্য অনুযায়ী যেকোনো যৌগিক সংখ্যাকে মৌলিক উৎপাদকের গুণফল হিসেবে অদ্বিতীয়ভাবে প্রকাশ করা যায়। 'অদ্বিতীয়' বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে? উৎপাদকগুলোর ক্রম কি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়?

অঙ্ক স্যার: চমৎকার প্রশ্ন! 'অদ্বিতীয়' বলতে বোঝানো হয়েছে যে, তুমি যখন একটি সংখ্যাকে মৌলিক উৎপাদকে ভাঙছ, তখন উৎপাদক হিসেবে যে মৌলিক সংখ্যাগুলো পাচ্ছ এবং যতবার পাচ্ছ, সেই সেটটা নির্দিষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, সংখ্যা ৭০ কে যদি মৌলিক উৎপাদকে ভাঙি, তাহলে আমরা পাব ২, ৫, এবং ৭ (70 = 2 × 5 × 7)। তুমি এটাকে 2 × 5 × 7 লিখতে পারো, বা 5 × 2 × 7 লিখতে পারো, বা 7 × 5 × 2 লিখতে পারো – ক্রম যাই হোক না কেন, উৎপাদকগুলো সবসময় ২, ৫, এবং ৭-ই থাকবে এবং প্রত্যেকে একবার করে থাকবে। তুমি কখনো ৭০ এর উৎপাদক হিসেবে ৩ বা ১১ পাবে না, অথবা দুটো ২ পাবে না। এই মৌলিক উৎপাদকগুলোর সেটটা সবসময় একই থাকবে। এটাই হলো 'অদ্বিতীয়তা'। ক্রম এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই ধারণাটি এতটাই মৌলিক যে এটি ছাড়া সংখ্যাতত্ত্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ এবং অ্যালগরিদম অসম্পূর্ণ থাকত।

সুমনা: প্রশ্ন ৩: স্যার, কোনো ভাগ না করে আমরা কীভাবে বলতে পারি যে 17/(2⁴ × 5³) এর দশমিক প্রসারণ সসীম হবে? আর যদি সসীম হয়, তাহলে দশমিকের পর কটি অঙ্ক থাকবে?

অঙ্ক স্যার: দারুণ প্রশ্ন, সুমনা! আমরা এই মাত্র শিখলাম যে, একটি পরিমেয় সংখ্যা p/q-এর দশমিক প্রসারণ সসীম হবে যদি q-এর মৌলিক উৎপাদক শুধুমাত্র ২ বা ৫ অথবা উভয়ই হয়। এখানে q = 2⁴ × 5³, যেখানে শুধুমাত্র ২ এবং ৫ আছে। সুতরাং, এর দশমিক প্রসারণ অবশ্যই সসীম হবে। এর কারণ হলো, আমরা এই হরকে 10-এর কোনো ঘাতে রূপান্তরিত করতে পারি।
এবার আসি দ্বিতীয় অংশে, দশমিকের পর কটি অঙ্ক থাকবে। এর জন্য আমাদের q-এর ২ এবং ৫-এর ঘাতগুলোর মধ্যে যেটি বড়, সেটি দেখতে হবে। এখানে ২-এর ঘাত হলো ৪ এবং ৫-এর ঘাত হলো ৩। বড় ঘাতটি হলো ৪। তাই, এই সংখ্যার দশমিক প্রসারণে দশমিক বিন্দুর পর ৪টি অঙ্ক থাকবে।
চলো, এটি পরীক্ষা করে দেখি:
17/(2⁴ × 5³) = 17/(16 × 125) = 17/2000
এখন, 17/2000 = 0.0085। দেখলে তো, দশমিকের পর ঠিক চারটি অঙ্ক আছে! এই নিয়মটি জেনে গেলে, তুমি খুব সহজে বড় বড় ভাগফল অনুমান করতে পারবে।

সুমনা: বাহ, এটা তো একদম জাদুর মতো! আমি তো আগে কখনো এভাবে ভাবিনি। এটা জেনে আমার অনেক সময় বাঁচবে।

অঙ্ক স্যার: গণিত এমনই এক জিনিস সুমনা, যত গভীরে যাবে, তত নতুন নতুন সৌন্দর্য এবং শর্টকাট আবিষ্কার করবে।

সুমনা: প্রশ্ন ৪: স্যার, 7 - 2√3 কি একটি অপরিমেয় সংখ্যা হবে? এর কারণটা একটু বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, সুমনা, 7 - 2√3 অবশ্যই একটি অপরিমেয় সংখ্যা হবে। চলো এর কারণটা দেখি।
আমরা জানি যে √৩ একটি অপরিমেয় সংখ্যা।
এখন, যখন আমরা একটি অপরিমেয় সংখ্যাকে একটি পরিমেয় সংখ্যা (যেমন ২) দিয়ে গুণ করি, তখন ফলাফল অপরিমেয়ই হয়। অর্থাৎ, 2√3 একটি অপরিমেয় সংখ্যা।
এরপর, যখন আমরা একটি পরিমেয় সংখ্যা (যেমন ৭) থেকে একটি অপরিমেয় সংখ্যা (2√3) বিয়োগ করি, তখনো ফলাফল অপরিমেয় সংখ্যাই থাকে।
কেন এমন হয়? আমরা 'পরোক্ষ প্রমাণ' পদ্ধতি ব্যবহার করে এটি আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি।
ধাপ ১: অনুমান: ধরা যাক 7 - 2√3 একটি পরিমেয় সংখ্যা।
ধাপ ২: পরিমেয় রূপে প্রকাশ: যদি এটি পরিমেয় হয়, তাহলে আমরা লিখতে পারি 7 - 2√3 = p/q, যেখানে p/q একটি পরিমেয় সংখ্যা।
ধাপ ৩: সমীকরণ পুনর্বিন্যাস: এবার, আমরা √৩ কে একদিকে নিয়ে আসার চেষ্টা করব।
-2√3 = p/q - 7
2√3 = 7 - p/q (উভয় পক্ষকে -1 দিয়ে গুণ করে)
√3 = (7 - p/q) / 2
ধাপ ৪: অসঙ্গতি: এখন ডান দিকের অংশটি দেখো: (7 - p/q) / 2
৭ একটি পরিমেয় সংখ্যা। p/q একটি পরিমেয় সংখ্যা। দুটি পরিমেয় সংখ্যার বিয়োগফল (7 - p/q) সর্বদা একটি পরিমেয় সংখ্যা হবে।
এরপর, একটি পরিমেয় সংখ্যাকে (৭ - p/q) আরেকটি অশূন্য পরিমেয় সংখ্যা (২) দিয়ে ভাগ করলে ফলাফল সর্বদা একটি পরিমেয় সংখ্যা হবে।
সুতরাং, ডান দিকের সম্পূর্ণ অংশটি একটি পরিমেয় সংখ্যা।
কিন্তু বামদিকে রয়েছে √3, যা আমরা আগেই প্রমাণ করেছি যে এটি একটি অপরিমেয় সংখ্যা।
একটি অপরিমেয় সংখ্যা কখনই একটি পরিমেয় সংখ্যার সমান হতে পারে না। এটি একটি স্পষ্ট গাণিতিক অসঙ্গতি।
ধাপ ৫: উপসংহার: অতএব, আমাদের প্রাথমিক ধারণাটি ভুল ছিল এবং 7 - 2√3 অবশ্যই একটি অপরিমেয় সংখ্যা হবে। এই পদ্ধতিটি খুব শক্তিশালী কারণ এটি গাণিতিক প্রমাণকে ত্রুটিহীন করে তোলে।

আজ আমরা কী শিখলাম?

অঙ্ক স্যার: সুমনা, আজ আমাদের আলোচনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে হয়েছে। বাস্তব সংখ্যার জগতটা বিশাল, আর এই অধ্যায় তার ভিত্তি। চলো, সংক্ষেপে দেখে নিই কী কী শিখলাম। তুমিও আমাকে সাহায্য করো, প্রতিটি পয়েন্ট তোমার নিজের ভাষায় গুছিয়ে বলার চেষ্টা করো।

সুমনা: হ্যাঁ স্যার, অবশ্যই! আমি পুরো ক্লাসটা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছি।

  • সুমনা: স্যার, আজ আমি সবচেয়ে প্রথমে শিখলাম যে, বাস্তব সংখ্যা আসলে পরিমেয় সংখ্যা এবং অপরিমেয় সংখ্যা – এই দুই ধরনের সংখ্যার বিশাল সমষ্টি। বাস্তব সংখ্যা দিয়েই আমরা আমাদের চারপাশের পরিমাপযোগ্য জগতকে বর্ণনা করি, এবং এই সংখ্যাগুলোকে সংখ্যারেখার প্রতিটি বিন্দুতে স্থাপন করা যায়।
  • অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক বলেছ। আর ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া উপপাদ্য এবং অ্যালগরিদম সম্পর্কে কী শিখেছ?
  • সুমনা: ইউক্লিডের ভাগ প্রক্রিয়া উপপাদ্যটি বলে যে, যেকোনো দুটি ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা ab এর জন্য, আমরা অদ্বিতীয় qr খুঁজে পাই যেখ