বিষয়ের ভূমিকা
জাতীয়তাবাদ এমন একটি ধারণা যা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে একাত্মতাবোধ, দেশপ্রেম এবং ঐক্য সৃষ্টি করে। ভারতে আধুনিক জাতীয়তাবাদের উত্থান মূলত ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছিল। ইউরোপের মতো ভারতেও জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অসন্তোষের হাত ধরে। বিশেষ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধে মহাত্মা গান্ধীর আবির্ভাবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম একটি গণআন্দোলনের রূপ নেয়। এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন এবং আইন অমান্য আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা পূর্ণতা লাভ করেছিল। ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিকাশকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ভাগ করা যায়। নিচে এই ধারার প্রধান দিকগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তার প্রভাব: ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। যুদ্ধের ফলে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা কর বৃদ্ধি, শুল্ক বৃদ্ধি এবং পণ্যের মূল্য দ্বিগুণ করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হয়। গ্রামে গ্রামে জোরপূর্বক সেনা সংগ্রহ করা হয়, যা গ্রামীণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ঠিক এই সময়েই (১৯১৮-১৯১৯ এবং ১৯২০-১৯২১ সালে) দেশের বিভিন্ন অংশে ফসল নষ্ট হওয়ায় খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়। এই পরিস্থিতি মানুষকে ব্রিটিশবিরোধী করে তোলে।
- সত্যাগ্রহের ধারণা: মহাত্মা গান্ধী ১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে আসেন। তিনি অহিংসার ওপর ভিত্তি করে এক অভিনব গণআন্দোলনের পথ দেখান, যার নাম ছিল 'সত্যাগ্রহ'। সত্যের প্রতি আগ্রহ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অহিংস উপায়ে প্রতিবাদই হলো সত্যাগ্রহ। গান্ধীজি প্রথম চম্পারণ (বিহার, ১৯১৭), খেডা (গুজরাট, ১৯১৮) এবং আমেদাবাদে (১৯১৮) সফলভাবে সত্যাগ্রহ আন্দোলন পরিচালনা করেন।
- রাওলাট আইন (১৯১৯): ইম্পেরিয়াল লেজিসলামূলক কাউন্সিল কর্তৃক তাড়াহুড়ো করে পাস করা রাওলাট আইন ভারতীয়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে। এই আইনের মাধ্যমে বিনা বিচারে যে কোনো ভারতীয়কে দুই বছরের জন্য কারারুদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয় পুলিশকে। এর প্রতিবাদে গান্ধীজি 'রাওলাট সত্যাগ্রহ' শুরু করেন। ৬ এপ্রিল ১৯১৯ তারিখে সারা দেশে হরতাল পালিত হয়।
- জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড: ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগের একটি উন্মুক্ত মাঠে বৈশাখী মেলা এবং রাওলাট আইনের প্রতিবাদে একটি শান্তিপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। জেনারেল ডায়ার পেছনের একমাত্র যাতায়াত পথ বন্ধ করে দিয়ে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেন, যাতে শত শত নিরীহ মানুষ নিহত হন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ভারতীয় রাজনীতিতে এক চরম মোড় নেয়।
- অসহযোগ আন্দোলন: গান্ধীজির মতে, ব্রিটিশ শাসন ভারতে টিকে ছিল ভারতীয়দের সহযোগিতার জন্যই। যদি ভারতীয়রা সহযোগিতা প্রত্যাহার করে নেয়, তবে এক বছরের মধ্যে ব্রিটিশ রাজত্বের পতন ঘটবে। ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নাগপুর কংগ্রেসে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ছাত্ররা স্কুল-কলেজ বর্জন করে, আইনজীবীরা আদালত ত্যাগ করেন এবং বিদেশি পণ্য বর্জন করা হয়। খিলাফত আন্দোলনের সাথে হাত মিলিয়ে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন স্থাপন করা হয় এই সময়ে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: সত্যাগ্রহ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সত্যাগ্রহ হলো মহাত্মা গান্ধী প্রবর্তিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার একটি অহিংস পদ্ধতি। এটি শারীরিক বল প্রয়োগের পরিবর্তে শক্তির ওপর বা সত্যের ওপর জোর দেয়। সত্যাগ্রহীর উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষের বিবেককে জাগিয়ে তোলা এবং তাকে অন্যায়ের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা।
প্রশ্ন ২: রাওলাট আইন কেন এত অজনপ্রিয় ছিল?
উত্তর: রাওলাট আইন অজনপ্রিয় ছিল কারণ এটি সরকারবিরোধী মতপ্রকাশকে দমন করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এই আইনের বলে কোনো বিচার বা আইনি সহায়তা ছাড়াই সন্দেহভাজন যে কাউকে দুই বছরের জন্য জেলে বন্দি রাখা যেত, যা ছিল মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
প্রশ্ন ৩: অসহযোগ আন্দোলন কেন প্রত্যাহার করা হয়েছিল?
উত্তর: ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরি চৌরা নামক স্থানে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর পুলিশ গুলি চালালে ক্ষুব্ধ জনতা থানায় আগুন ধরিয়ে দেয় এবং এতে বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী নিহত হন। হিংসাত্মক ঘটনার রূপ নেওয়ায় মহাত্মা গান্ধী অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং সঙ্গে সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
সারসংক্ষেপ
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটায়।
- মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে সত্যাগ্রহ আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়।
- রাওলাট আইন এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ শাসনের নৃশংস রূপ উন্মোচন করে।
- অসহযোগ আন্দোলন এবং খিলাফত আন্দোলন দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়কে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তোলে।