বিষয়ের ভূমিকা
দশম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যবুকের তৃতীয় অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার নাম 'ধাতু এবং অধাতু' (Metals and Non-metals)। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা বহু ধরনের বস্তু ব্যবহার করি, যার বেশিরভাগই ধাতু বা অধাতু দিয়ে তৈরি। লোহা, তামা, অ্যালুমিনিয়াম, সোনা ইত্যাদি পরিচিত ধাতু, আবার অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ অধাতু। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে পদার্থগুলিকে তাদের শারীরিক এবং রাসায়নিক ধর্মের ওপর ভিত্তি করে ধাতু ও অধাতুতে ভাগ করা যায়। এই জ্ঞান রসায়নের মূল ভিত্তি স্থাপন করে এবং উচ্চতর শ্রেণীতে বিজ্ঞান অধ্যয়নের পথ প্রশস্ত করে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়নে মৌলগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: ধাতু এবং অধাতু। নিচে এদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও রাসায়নিক ধর্ম বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ধাতুর ভৌত ধর্ম (Physical Properties of Metals)
- ধাতব দ্যুতি (Metallic Luster): খাঁটি অবস্থায় ধাতুর উপরিভাগ উজ্জ্বল হয় এবং আলো প্রতিফলিত করতে পারে। যেমন—সোনা, রূপা ও তামা।
- নমনীয়তা (Malleability): কিছু ধাতুকে আঘাত করে পাতলা চাদরে পরিণত করা যায়। যেমন—সোনা ও রূপা অত্যন্ত নমনীয় ধাতু।
- প্রসার্যতা (Ductility): ধাতুকে টেনে লম্বা তারে পরিণত করা যায়। ১ গ্রাম সোনা থেকে প্রায় ২ কিমি লম্বা তার তৈরি করা সম্ভব।
- তাপ ও তড়িতের সুপরিবাহী (Conduction): ধাতুগুলির মধ্য দিয়ে সহজে তাপ ও বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে। তামা (Cu) এবং অ্যালুমিনিয়াম (Al) এর সেরা উদাহরণ।
- ঘনত্ব ও গলনাঙ্ক: সাধারণভাবে ধাতুগুলির ঘনত্ব ও গলনাঙ্ক উচ্চ হয়। তবে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের গলনাঙ্ক খুব কম, যা ছুরি দিয়ে কাটা যায়।
২. অধাতুর ভৌত ধর্ম (Physical Properties of Non-metals)
- অধাতুগুলি কঠিন, তরল বা গ্যাসীয়—তিনটি অবস্থাতেই থাকতে পারে। যেমন—কার্বন (কঠিন), ব্রোমিন (তরল), অক্সিজেন (গ্যাসীয়)।
- এগুলি নমনীয় বা প্রসারণযোগ্য নয় (ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়)।
- অধাতুগুলি সাধারণত তাপ ও তড়িতের কুপরিবাহী হয় (গ্রাফাইট ব্যাতিক্রম, যা বিদ্যুৎ পরিবহন করে)।
- এগুলির কোনো ধাতব দ্যুতি থাকে না এবং এগুলি অনুজ্জ্বল হয় (আয়োডিন এর ব্যতিক্রম)।
৩. ধাতুর রাসায়নিক ধর্ম (Chemical Properties of Metals)
- বায়ুর সাথে বিক্রিয়া: ধাতু অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে ধাতব অক্সাইড উৎপন্ন করে। যেমন: $2Mg + O_2 \rightarrow 2MgO$। বেশিরভাগ ধাতব অক্সাইড ক্ষারীয় প্রকৃতির হয়।
- জলের সাথে বিক্রিয়া: সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো সক্রিয় ধাতু ঠান্ডা জলের সাথেই দ্রুত বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে এবং প্রচুর তাপ ছাড়ে।
- অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া: ধাতু লঘু অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করে লবণ এবং হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে। যেমন: $Zn + 2HCl \rightarrow ZnCl_2 + H_2$।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: কোন ধাতুকে ছুরি দিয়ে কাটা যায়?
উত্তর: সোডিয়াম (Na) এবং পটাশিয়াম (K) অত্যন্ত নরম ধাতু হওয়ায় এগুলিকে ছুরি দিয়ে সহজেই কাটা যায়।
প্রশ্ন ২: আয়নীয় যৌগ বা তড়িৎযোজী যৌগ কাকে বলে?
উত্তর: ধাতু থেকে অধাতুতে ইলেকট্রন স্থানান্তরের মাধ্যমে যে যৌগ গঠিত হয়, তাকে আয়নীয় যৌগ বলে। যেমন—সোডিয়াম ক্লোরাইড ($NaCl$)।
প্রশ্ন ৩: সংকর ধাতু (Alloy) কী? এর একটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: দুই বা ততোধিক ধাতু অথবা একটি ধাতু ও একটি অধাতুর সমসত্ত্ব মিশ্রণকে সংকর ধাতু বলে। যেমন—পিতল (তামা ও দস্তার মিশ্রণ)।
সারসংক্ষেপ
- পদার্থকে ধাতু ও অধাতুতে ভাগ করা হয় তাদের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মের ভিত্তিতে।
- ধাতুগুলি সাধারণত তাপ ও তড়িতের সুপরিবাহী, নমনীয় এবং প্রসারণযোগ্য হয়।
- অধাতুগুলি ভঙ্গুর এবং সাধারণত তাপ বা তড়িতের কুপরিবাহী হয়।
- ধাতু অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে অক্সাইড তৈরি করে, যা ক্ষারীয়।
- সক্রিয়তা সিরিজ ব্যবহার করে ধাতুগুলির আপেক্ষিক বিক্রিয়াশীলতা নির্ধারণ করা হয়।