বিষয়ের ভূমিকা
আমরা যখন ভারতের মতো এক বিশাল এবং বৈচিত্র্যময় দেশের কথা ভাবি, তখন আমাদের মনে একটি প্রশ্ন আসতেই পারে: এই দেশটা চলে কীভাবে? দেশের জন্য নিয়মকানুন কে তৈরি করে? সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কে নেয়? এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে একটি শব্দের মধ্যে - সংসদ। সংসদ বা Parliament হলো ভারতের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী সংস্থা। এটি সেই জায়গা যেখানে আমাদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন, আইন তৈরি করেন এবং সরকারের কাজকর্মের উপর নজর রাখেন।
অষ্টম শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা জানব কেন একটি গণতান্ত্রিক দেশে সংসদের প্রয়োজন হয়, সংসদের ভূমিকা কী এবং কীভাবে এটি সাধারণ মানুষের ইচ্ছা ও আকাঙ্খাকে প্রতিফলিত করে। এই অধ্যায়টি আমাদের দেশের শাসন ব্যবস্থা বোঝার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে। চলুন, এই আকর্ষণীয় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করা যাক।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
কেন জনগণের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত?
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামের দিনগুলিতে। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পায়। এই স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ ছিল না। এর পিছনে ছিল বহু বছরের সংগ্রাম, ত্যাগ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মবলিদান। পরাধীনতার সময়ে, ভারতীয়দের ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা করার বা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার কোনো অধিকার ছিল না। সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো লন্ডনে, ভারতীয়দের ভাল-মন্দের কথা না ভেবেই।
স্বাধীনতার সংগ্রামীরা এমন একটি ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিক স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে এবং দেশের শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করতে পারবে। তাঁরা চেয়েছিলেন সরকার যেন জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে। এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্যই স্বাধীন ভারতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো জনগণের শাসন। কিন্তু ১৩০ কোটিরও বেশি মানুষের পক্ষে একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। তাই, গণতন্ত্র একটি উপায় বের করেছে, যার মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচন করে। এই প্রতিনিধিরাই জনগণের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই প্রক্রিয়াটিই হলো নির্বাচন।
ভারতে সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার (Universal Adult Franchise) চালু আছে। এর অর্থ হলো, দেশের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রত্যেক নাগরিক, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, বা অর্থনৈতিক অবস্থা নির্বিশেষে, ভোট দেওয়ার অধিকারী। আপনার একটি ভোটই নির্ধারণ করে দেয় কে আপনার এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে যাবেন। এই ভোটাধিকারের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষ দেশের সরকার গঠনে এবং পরিচালনায় অংশ নেয়। সুতরাং, জনগণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার গণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর এবং সংসদ এই অধিকার প্রয়োগের প্রধান মঞ্চ।
জনগণ এবং তাদের প্রতিনিধি
গণতন্ত্রের ধারণাটি হলো জনগণের ইচ্ছা এবং অংশগ্রহণ। একজন ব্যক্তি কীভাবে সরকারের কাছে তার সম্মতি বা মতামত জানায়? উত্তরটি হলো নির্বাচনের মাধ্যমে।
নির্বাচনের জন্য সমগ্র দেশকে ছোট ছোট নির্বাচনী এলাকায় (Constituencies) ভাগ করা হয়। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা থেকে জনগণ ভোট দিয়ে একজন প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করেন। এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য বা MP (Member of Parliament) कहलाয়। এই সমস্ত এমপিদের নিয়েই ভারতের সংসদ গঠিত হয়।
একবার নির্বাচিত হওয়ার পর, এই এমপিরা সংসদে তাদের এলাকার মানুষের সমস্যা, চাহিদা এবং মতামতের প্রতিনিধিত্ব করেন। যেমন, আপনার এলাকার রাস্তা খারাপ হলে বা পানীয় জলের সমস্যা হলে, আপনার নির্বাচিত এমপির দায়িত্ব হলো সংসদে এই বিষয়টি তুলে ধরা এবং সরকারের কাছে এর সমাধানের দাবি জানানো। এভাবে, আপনার ব্যক্তিগত সমস্যাও জাতীয় স্তরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এই এমপিদের নিয়েই লোকসভায় সরকার গঠিত হয়। যে রাজনৈতিক দল বা জোট লোকসভার অর্ধেকের বেশি আসনে (অর্থাৎ ৫৪৩টির মধ্যে অন্তত ২৭২টি আসনে) জয়লাভ করে, তারা সরকার গঠন করার সুযোগ পায়। সেই দলের নেতাকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন। প্রধানমন্ত্রী তখন অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন, যারা বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, যেমন - শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থ, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি পরিচালনা করেন।
যেসব দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না, তারা বিরোধী দল (Opposition) হিসেবে কাজ করে। বিরোধী দলের ভূমিকাও গণতন্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে, গঠনমূলক সমালোচনা করে এবং সরকারকে জনস্বার্থবিরোধী কাজ করা থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করে।
সংসদের ভূমিকা
ভারতীয় গণতন্ত্রে সংসদের ভূমিকা বহুমুখী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রধান কাজগুলিকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. জাতীয় সরকার নির্বাচন করা (To Select the National Government)
ভারতের সংসদের দুটি কক্ষ বা হাউস রয়েছে - লোকসভা (Lok Sabha) এবং রাজ্যসভা (Rajya Sabha)। লোকসভার সদস্যদের জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে। লোকসভা নির্বাচনের পরেই দেশের কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হয়।
- সরকার গঠন: লোকসভা নির্বাচনে যে দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তারা সরকার গঠন করে। এই দলের সদস্যদের নিয়েই মন্ত্রিসভা বা শাসন বিভাগ (Executive) গঠিত হয়।
- প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা: সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হন প্রধানমন্ত্রী। তিনি হলেন সরকারের প্রধান। প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যদের বেছে নেন, যারা বিভিন্ন মন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেন। এই মন্ত্রীরা তাদের কাজের জন্য সংসদের কাছে, বিশেষ করে লোকসভার কাছে, দায়বদ্ধ থাকেন।
- জোট সরকার (Coalition Government): অনেক সময় কোনো একটি দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না। তখন কয়েকটি দল একত্রিত হয়ে জোট গঠন করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে সরকার গঠন করে। একে জোট সরকার বলা হয়।
সুতরাং, সংসদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো দেশের জন্য একটি কার্যকর এবং স্থিতিশীল সরকার নির্বাচন করা, যা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে।
২. সরকারকে নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশনা এবং তথ্য প্রদান করা (To Control, Guide and Inform the Government)
সংসদের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সরকারের কাজকর্মের উপর নজর রাখা এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করা। নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে, এমপিদের দায়িত্ব হলো এটা নিশ্চিত করা যে সরকার যেন ক্ষমতার অপব্যবহার না করে এবং জনগণের স্বার্থে কাজ করে। এই কাজটি বিভিন্ন উপায়ে করা হয়:
- প্রশ্নোত্তর পর্ব (Question Hour): সংসদের অধিবেশন শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব দিয়ে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এই সময়ে, এমপিরা বিভিন্ন মন্ত্রীদের কাছে তাদের মন্ত্রকের কাজকর্ম সম্পর্কিত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারেন। যেমন, কোনো এমপি জিজ্ঞাসা করতে পারেন, "দেশে বেকারত্ব সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে?" মন্ত্রীরা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য থাকেন। এর মাধ্যমে সরকার তার কাজের জন্য সরাসরি সংসদের কাছে জবাবদিহি করে। এটি সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
- আলোচনা ও বিতর্ক: যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেমন - নতুন কোনো আইন, বাজেট বা দেশের কোনো বড় সমস্যা নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিরোধী দল সরকারের নীতির সমালোচনা করে এবং বিকল্প প্রস্তাব দেয়। এই বিতর্কের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ের ভালো-মন্দ দিকগুলো উঠে আসে।
- অনাস্থা প্রস্তাব (No-Confidence Motion): যদি লোকসভার সদস্যরা মনে করেন যে সরকার ঠিকমতো কাজ করছে না বা তারা সরকারের উপর আস্থা হারিয়েছে, তবে তারা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারে। এই প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হলে, সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়। এটি সরকারের উপর সংসদের নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
এই সমস্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংসদ সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে, সঠিক পথে চালিত করে এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ রাখে।
৩. আইন প্রণয়ন করা (Law-Making)
সংসদের সবচেয়ে মৌলিক এবং পরিচিত কাজ হলো আইন তৈরি করা। দেশের যেকোনো নতুন আইন বা পুরনো আইনের পরিবর্তন, সবই সংসদে করা হয়। একটি আইন তৈরির প্রক্রিয়া বেশ কয়েকটি ধাপের মধ্যে দিয়ে যায়:
- বিল পেশ (Introduction of a Bill): প্রথমে আইনের একটি খসড়া বা 'বিল' সংসদের যেকোনো একটি কক্ষে (লোকসভা বা রাজ্যসভা) পেশ করা হয়।
- আলোচনা ও বিতর্ক: বিলটি পেশ করার পর তার উপর বিস্তারিত আলোচনা হয়। সদস্যরা বিলটির বিভিন্ন ধারা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করেন এবং প্রয়োজনে সংশোধনের প্রস্তাব দেন।
- ভোটাভুটি (Voting): আলোচনা শেষে বিলটির উপর ভোট হয়। যদি কক্ষের অধিকাংশ সদস্য বিলটির পক্ষে ভোট দেন, তবে বিলটি সেই কক্ষে পাস হয়ে যায়।
- অন্য কক্ষে প্রেরণ: একটি কক্ষে পাস হওয়ার পর বিলটি সংসদের অন্য কক্ষে পাঠানো হয়। সেখানেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।
- রাষ্ট্রপতির সম্মতি (President's Assent): সংসদের উভয় কক্ষে পাস হওয়ার পর বিলটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করলে বিলটি আইনে পরিণত হয়।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে আইনটি যেন দেশের সকল মানুষের জন্য উপযুক্ত এবং কল্যাণকর হয়।
সংসদের সদস্য কারা? (Who are the People in Parliament?)
সংসদ গঠিত হয় জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে। কিন্তু এই প্রতিনিধিরা কারা? তারা কি সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে আসেন? সময়ের সাথে সাথে সংসদের গঠনে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
স্বাধীনতার প্রথম দিকে, সংসদের বেশিরভাগ সদস্যই ছিলেন উচ্চবিত্ত এবং শহুরে এলাকার শিক্ষিত পুরুষ। কিন্তু গণতন্ত্র যত শক্তিশালী হয়েছে, সংসদের চিত্রও তত বদলেছে। আজ সংসদে বিভিন্ন ಹಿನ್ನೆলা থেকে আসা মানুষ প্রতিনিধিত্ব করছেন।
- গ্রামীন প্রতিনিধিত্ব: বর্তমানে সংসদে গ্রামীন এলাকা থেকে আসা সদস্যদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তারা গ্রামের মানুষের সমস্যা এবং প্রয়োজনগুলি জাতীয় স্তরে তুলে ধরেন।
- আঞ্চলিক দলের বৃদ্ধি: বিভিন্ন রাজ্যের আঞ্চলিক দলগুলির শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায়, সংসদের আলোচনায় এখন আঞ্চলিক বিষয়গুলিও অনেক বেশি গুরুত্ব পায়।
- দলিত ও আদিবাসী প্রতিনিধিত্ব: আমাদের সংবিধানে দলিত (Scheduled Castes) এবং আদিবাসী (Scheduled Tribes) সম্প্রদায়ের জন্য সংসদে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে, ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়া এই সম্প্রদায়ের মানুষরাও আজ দেশের নীতি নির্ধারণে অংশ নিতে পারছেন এবং তাদের সম্প্রদায়ের आवाज তুলে ধরতে পারছেন।
- মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব: যদিও সংসদে মহিলাদের সংখ্যা এখনো আনুপাতিকভাবে কম, তবে সময়ের সাথে সাথে তা বাড়ছে। সম্প্রতি পাশ হওয়া নারী সংরক্ষণ বিল ভবিষ্যতে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩% আসন সংরক্ষণ নিশ্চিত করবে, যা একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
একটি বৈচিত্র্যময় সংসদ দেশের জন্যও মঙ্গলজনক। কারণ যখন বিভিন্ন সম্প্রদায়, অঞ্চল এবং লিঙ্গের মানুষ সংসদে উপস্থিত থাকেন, তখন দেশের বৈচিত্র্যময় সমস্যা এবং দৃষ্টিভঙ্গিগুলিও আলোচনায় উঠে আসে এবং আইন ও নীতিগুলি আরও বেশি समावेशী (inclusive) হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: লোকসভা এবং রাজ্যসভার মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: লোকসভা এবং রাজ্যসভার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:
- সদস্য নির্বাচন: লোকসভার সদস্যদের (এমপি) জনগণ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত করে। অন্যদিকে, রাজ্যসভার সদস্যদের বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যরা (এমএলএ) নির্বাচিত করেন। তাদের কার্যকাল ৬ বছর।
- সদস্য সংখ্যা: লোকসভার সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা ৫৪৩ (নির্বাচিত)। রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা ২৪৫, যার মধ্যে ২৩৩ জন নির্বাচিত এবং ১২ জন সদস্যকে রাষ্ট্রপতি শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং সমাজসেবার ক্ষেত্রে তাদের অবদানের জন্য মনোনীত করেন।
- ক্ষমতা: অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে (যেমন বাজেট) লোকসভার ক্ষমতা রাজ্যসভার চেয়ে বেশি। তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে উভয় কক্ষের সম্মতি প্রয়োজন। লোকসভাকে 'নিম্নকক্ষ' এবং রাজ্যসভাকে 'উচ্চকক্ষ' বলা হয়।
প্রশ্ন ২: বিরোধী দলের ভূমিকা কী?
উত্তর: গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রধান কাজগুলি হলো:
- সরকারের সমালোচনা: সরকারের নীতি এবং কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করা।
- জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: প্রশ্নোত্তর পর্ব, বিতর্ক এবং অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা।
- বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া: সরকারের নীতির বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া এবং জনমত গঠন করা।
- জনস্বার্থ রক্ষা: সরকার যাতে কোনো জনস্বার্থবিরোধী আইন বা সিদ্ধান্ত না নেয়, সেদিকে নজর রাখা। একটি শক্তিশালী বিরোধী দল একটি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ।
প্রশ্ন ৩: 'জোট সরকার' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: যখন লোকসভা নির্বাচনে কোনো একটি রাজনৈতিক দল এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২৭২টি আসন) অর্জন করতে পারে না, তখন কয়েকটি দল একত্রিত হয়ে একটি জোট গঠন করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে সরকার গঠন করে। এই ধরনের সরকারকে 'জোট সরকার' বা 'Coalition Government' বলা হয়। জোট সরকারে বিভিন্ন দলের মতামতের সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
প্রশ্ন ৪: প্রশ্নোত্তর পর্ব (Question Hour) কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: প্রশ্নোত্তর পর্ব সংসদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ কারণ:
- সরকারের জবাবদিহিতা: এটি সরকারকে তার কাজের জন্য সরাসরি সংসদের কাছে এবং তার মাধ্যমে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করে।
- তথ্যের উৎস: এমপিরা প্রশ্ন করার মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কাজকর্ম এবং পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারেন।
- জনগণের সমস্যা তুলে ধরা: এমপিরা এই সময়ে তাদের নির্বাচনী এলাকার সমস্যাগুলি তুলে ধরেন, যা সরকারকে সেই সমস্যাগুলি সম্পর্কে অবহিত করে এবং সমাধানের জন্য চাপ সৃষ্টি করে।
- স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে সরকারি কাজকর্মের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায় থেকে আমরা যা শিখলাম, তা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের মাধ্যমে মনে রাখা যেতে পারে:
- জনগণের অংশগ্রহণ: সংসদ হলো সেই প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে ভারতের নাগরিকরা দেশ পরিচালনায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়।
- প্রতিনিধিত্ব: আমরা আমাদের প্রতিনিধিদের (এমপি) নির্বাচন করি যারা সংসদে আমাদের হয়ে কথা বলেন।
- সরকার গঠন ও নিয়ন্ত্রণ: সংসদ জাতীয় সরকার নির্বাচন করে এবং প্রশ্নোত্তর পর্ব, আলোচনা ও অনাস্থা প্রস্তাবের মতো বিভিন্ন উপায়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- সর্বোচ্চ আইনসভা: দেশের সমস্ত আইন সংসদেই তৈরি হয়।
- বৈচিত্র্যের প্রতিফলন: একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য সংসদে সমাজের সকল স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকা অপরিহার্য।
আশা করি, এই বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে তোমরা বুঝতে পেরেছ কেন আমাদের দেশে একটি সংসদের প্রয়োজন এবং এটি কীভাবে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করে। সংসদ কেবল ইট-পাথরের একটি ভবন নয়, এটি ভারতের কোটি কোটি মানুষের আশা, আকাঙ্খা এবং স্বপ্নের প্রতীক।