বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা লক্ষ্য করি যে কোনো বস্তু উপর থেকে ছেড়ে দিলে তা মাটিতে পড়ে যায়। গ্রহগুলি সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করছে এবং চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে। এই সমস্ত ঘটনার পিছনে যে মূল রহস্য কাজ করে তা হলো 'মহাকর্ষ' (Gravitation)। নবম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের দশম অধ্যায়ে এই মহাকর্ষ বল এবং এর বিভিন্ন প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা মহাকর্ষ সূত্র, অভিকর্ষজ ত্বরণ, ভর ও ওজন এবং আর্কিমিডিসের নীতি সম্পর্কে সহজ ও বিস্তারিত আলোচনা করব যাতে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি সহজেই অনুধাবন করতে পারে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. মহাকর্ষের সার্বজনীন সূত্র (Universal Law of Gravitation)

মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু কণা একে অপরকে একটি নির্দিষ্ট বল দ্বারা আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বলকে মহাকর্ষ বল বলা হয়। স্যার আইজাক নিউটন ১৬৮৭ সালে এই মহাকর্ষ সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র প্রদান করেন, যা নিউটনের মহাকর্ষের সার্বজনীন সূত্র নামে পরিচিত।

ধরা যাক, m1 এবং m2 ভরের দুটি বস্তু পরস্পরের থেকে d দূরত্বে অবস্থিত। তাদের মধ্যকার আকর্ষণ বল F হলে, সূত্রানুসারে:

বলটি বস্তু দুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক: F \propto m_1 \times m_2

বলটি বস্তু দুটির দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক: F \propto \frac{1}{d^2}

দুটি সম্পর্ককে এক করলে পাই: F = G \frac{m_1 m_2}{d^2}

এখানে G হলো সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (Universal Gravitational Constant)। এর মান হলো G = 6.673 \times 10^{-11} \text{ N m}^2 \text{ kg}^{-2}।

২. অভিকর্ষ এবং অভিকর্ষজ ত্বরণ (Gravity and Acceleration due to Gravity)

যখন মহাকর্ষ বল কোনো গ্রহ বা পৃথিবীর সাথে কোনো বস্তুর মধ্যে ক্রিয়া করে, তখন তাকে অভিকর্ষ বলা হয়। পৃথিবীর আকর্ষণের কারণে মুক্তভাবে পতনশীল কোনো বস্তুর বেগ বৃদ্ধির হারকে অভিকর্ষজ ত্বরণ (g) বলা হয়।

অভিকর্ষজ ত্বরণের মান বস্তুটির ভরের উপর নির্ভর করে না। পৃথিবীর পৃষ্ঠে এর গড় মান ধরা হয় 9.8 \text{ m/s}^2। এর সমীকরণটি হলো:

g = \frac{G M}{R^2}

যেখানে M হলো পৃথিবীর ভর এবং R হলো পৃথিবীর ব্যাসার্ধ। যেহেতু পৃথিবী সম্পূর্ণ গোল নয় (মেরু অঞ্চলে একটু চাপা এবং বিষুবীয় অঞ্চলে একটু স্ফীত), তাই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে g-এর মানের সামান্য তারতম্য দেখা যায়।

৩. ভর এবং ওজন (Mass and Weight)

দৈনন্দিন জীবনে আমরা ভর এবং ওজন শব্দ দুটিকে একই অর্থে ব্যবহার করলেও পদার্থবিজ্ঞানে এদের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।

  • ভর (Mass): কোনো বস্তুতে উপস্থিত মোট পদার্থের পরিমাণকে তার ভর বলে। এটি একটি স্কেলার রাশি এবং এর এসআই (SI) একক কিলোগ্রাম (kg)। ভর সব স্থানে ধ্রুবক থাকে।
  • ওজন (Weight): যে বল দ্বারা পৃথিবী কোনো বস্তুকে তার কেন্দ্রের দিকে টানে, তাকে ওই বস্তুর ওজন (W = mg) বলে। এটি একটি ভেক্টর রাশি এবং এর এসআই একক নিউটন (N)। স্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে ওজনের পরিবর্তন ঘটে।

৪. মুক্ত পতন (Free Fall)

বায়ুশূন্য স্থানে যখন কোনো বস্তু কেবল পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের প্রভাবে নিচে পড়ে, তখন সেই পতনকে মুক্ত পতন বলা হয়। বায়ুশূন্য স্থানে একটি ভারী লোহা এবং একটি হালকা কাগজের টুকরো একই সাথে নিচে পড়বে কারণ তাদের উপর প্রযুক্ত ত্বরণ সমান।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: মহাকর্ষের সার্বজনীন সূত্রটি বিবৃত করুন।

উত্তর: মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু কণা অন্য প্রতিটি বস্তুকণাটিকে একটি নির্দিষ্ট বল দ্বারা আকর্ষণ করে, যা বস্তু দুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যকার দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। এই বল বস্তু দুটির কেন্দ্র সংযোগকারী সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করে।

প্রশ্ন ২: ভর ও ওজনের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি কী কী?

উত্তর: ১. ভর হলো বস্তুর জড়তা ও পদার্থের পরিমাণ, পক্ষান্তরে ওজন হলো পৃথিবীর আকর্ষণ বল। ২. ভরের একক কিলোগ্রাম (kg) এবং ওজনের একক নিউটন (N)। ৩. ভর সর্বত্র অপরিবর্তিত থাকে, কিন্তু ওজন স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়।

প্রশ্ন ৩: চাঁদে কোনো ব্যক্তির ওজন পৃথিবীর ওজনের কত অংশ হয়?

উত্তর: চাঁদের ভর ও ব্যাসার্ধ পৃথিবীর তুলনায় কম হওয়ায় চাঁদের অভিকর্ষজ ত্বরণের মান পৃথিবীর অভিকর্ষজ ত্বরণের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ (1/6)। তাই চাঁদে কোনো ব্যক্তির ওজন পৃথিবীর ওজনের ঠিক এক-ষষ্ঠাংশ হয়।

সারসংক্ষেপ

  • মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে, যাকে মহাকর্ষ বলে।
  • নিউটন মহাকর্ষের সার্বজনীন সূত্র প্রদান করেছিলেন যার সমীকরণ F = G m_1 m_2 / d^2।
  • পৃথিবীর আকর্ষণের কারণে সৃষ্ট ত্বরণকে অভিকর্ষজ ত্বরণ (g) বলা হয় যার গড় মান 9.8 \text{ m/s}^2।
  • ভর একটি ধ্রুবক রাশি হলেও ওজন স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়।