বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের অতীত বইয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ইতিহাস বিষয়ের তৃতীয় অধ্যায়টি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব 'প্রথম শহরের কথা' নিয়ে, যা মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম নগর সভ্যতা—হরপ্পা সভ্যতা বা সিন্ধু সভ্যতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আজ থেকে প্রায় ৪৭০০ বছর আগে আমাদের এই উপমহাদেশে কীভাবে প্রথম শহরগুলি গড়ে উঠেছিল, সেখানকার মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করতেন এবং আধুনিক শহরের সাথে তাদের কী মিল বা অমিল ছিল, তা আমরা এই অধ্যায়ের মাধ্যমে বিস্তারিতভাবে জানব। ইতিহাস কেবল পুরনো দিনের কাহিনীর সংকলন নয়, এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রা এবং সংস্কৃতির এক অনবদ্য দলিল। প্রাচীন হরপ্পা সভ্যতার আবিষ্কার কেবল ভারতের ইতিহাসেই নয়, সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসেও এক যুগান্তকারী ঘটনা। তাই এই অধ্যায়টি পড়া আমাদের বর্তমান সমাজ ও নগর পরিকল্পনার শেকড় সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই অধ্যায়ের মূল আলোচ্য বিষয়গুলিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাগে ভাগ করা যায়, যা শিক্ষার্থীদের সহজে বুঝতে সাহায্য করবে:

১. শহরগুলির আবিষ্কার এবং প্রাচীন ইতিহাস

প্রায় ৮০ বছর আগে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রথম এই অঞ্চলে খননকার্য চালাতে গিয়ে প্রাচীন শহরের সন্ধান পান। তারা বুঝতে পারেন যে এটি ছিল এই উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এক সভ্যতা। এই শহরগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল হরপ্পা (যা বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থিত)। এই সভ্যতার বেশিরভাগ নেতত্বস্থানীয় শহরগুলি সিন্ধু নদ এবং তার উপনদীগুলির অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল বলেই একে সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতা বলা হয়।

২. হরপ্পা সভ্যতার অনন্য নগর পরিকল্পনা

হরপ্পা সভ্যতার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল তাদের অত্যন্ত উন্নত এবং সুপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা। এই শহরগুলির বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো:

  • দুর্গ এবং নিন্ম শহর: শহরগুলিকে সাধারণত দুটি ভাগে ভাগ করা হতো। পশ্চিম দিকের অংশটি ছিল অপেক্ষাকৃত উঁচু এবং ছোট, যাকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা 'দুর্গ' (Citadel) বলে মনে করেন। পূর্ব দিকের অংশটি ছিল আকারে বড় এবং নিচু, যা 'নিম্ন শহর' (Lower Town) নামে পরিচিত।
  • পোড় ইট ও রাজমিস্ত্রির কাজ: এখানকার বাড়িগুলি তৈরি হতো খুব ভালোমানের পোড় ইট দিয়ে। ইটগুলি এমন নিখুঁত মাপে তৈরি হতো যে সেগুলি দীর্ঘস্থায়ী হতো।
  • উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা (Drainage System): হরপ্পা সভ্যতার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল তাদের নিকাশি ব্যবস্থা। প্রতিটি বাড়ির স্নানাগার ও শৌচাগারের জল রাস্তার ধারের ঢাকা ড্রেনের সাথে যুক্ত থাকত। ড্রেনগুলি নিয়মিত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা ছিল, যা প্রাচীন যুগে স্বাস্থ্যসচেতনতার এক অনন্য নজির।
  • প্রশস্ত রাস্তাঘাট: শহরগুলির রাস্তাগুলি একে অপরকে সমকোণে কাটত, যার ফলে পুরো শহরটি সুনির্দিষ্ট ব্লকে বিভক্ত থাকত।

৩. শহরের জীবনযাত্রা এবং পেশা

হরপ্পার মানুষের দৈনন্দিন জীবন বেশ ব্যস্ততাপূর্ণ ছিল। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন:

  • শাসক ও লিপিকর: শহরের নির্মাণকাজ এবং দূরপাল্লার বাণিজ্যের পরিকল্পনা করার মতো বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ বা শাসকরা এখানে বাস করতেন। লিপিকর বা স্cribes-রাও ছিলেন, যারা মোহর বা সিলের ওপর লিপি খোদাই করতেন।
  • শিল্পী ও কারিগর: ধাতু (যেমন তামা ও ব্রোঞ্জ), পাথর, এবং পোড়ামাটি বা টেরাকোটা দিয়ে নানা ধরনের অলঙ্কার, অস্ত্র ও মূর্তি তৈরি করা হতো।
  • কৃষক ও পশুপালক: শহরবাসীদের খাদ্যের জোগান দিতে আশেপাশের গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা গম, যব, ডাল, সর্ষে ইত্যাদি চাষ করতেন। গবাদি পশু পালনও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪. ধাতু, পাথর এবং অন্যান্য দ্রব্যাদি

প্রত্নতাত্ত্বিকরা হরপ্পা শহরে নানা মূল্যবান ধাতু ও পাথরের জিনিস আবিষ্কার করেছেন। তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা এবং রূপার ব্যবহার তারা জানতেন। তামা ও টিন মিশিয়ে ব্রোঞ্জ বা কাঁসা তৈরি করা হতো। পাথর দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ওজনের বাটখারা তৈরি করা হতো, যা বাণিজ্যের সময় দ্রব্য পরিমাপে ব্যবহৃত হতো। এছাড়াও, সুদৃশ্য পাথর দিয়ে তৈরি পুতি এবং বিশেষ নকশা করা সিল বা মোহর এই সভ্যতার শিল্পকলার উৎকর্ষের প্রমাণ দেয়।

৫. মহেঞ্জোদাড়োর মহা-স্নানাগার (Great Bath)

মহেঞ্জোদাড়ো শহরে একটি বিশেষ জলাশয় পাওয়া গেছে, যাকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা 'মহা-স্নানাগার' বা Great Bath বলেছেন। এটি ইট দিয়ে বাঁধানো ছিল এবং চারপাশে আলকাতরার প্রলেপ দেওয়া থাকত যাতে জল চুইয়ে বেরিয়ে না যায়। ধারণা করা হয়, কোনো বিশেষ ধর্মানুষ্ঠান বা পবিত্র স্নানের জন্য এটি ব্যবহৃত হতো।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য এই অধ্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো:

প্রশ্ন ১: হরপ্পা সভ্যতার শহরগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

উত্তর: হরপ্পা সভ্যতার শহরগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অত্যন্ত উন্নত নগর পরিকল্পনা। শহরগুলি গ্রিড পদ্ধতিতে নির্মিত হতো, রাস্তাঘাট একে অপরকে সমকোণে কাটত। বাড়িগুলি পোড় ইটের তৈরি হতো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভূগর্ভস্থ ঢাকা নিকাশি ব্যবস্থা, যা আধুনিক যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়।

প্রশ্ন ২: মহেঞ্জোদাড়োর মহা-স্নানাগারটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল?

উত্তর: মহেঞ্জোদাড়োর মহা-স্নানাগারটি ইট দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল। জলের লিক রোধ করতে ইটের জোড়গুলির মাঝে টার বা আলকাতরার আস্তরণ দেওয়া হতো। নামার জন্য দুপাশে সিঁড়ি এবং জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছিল।

প্রশ্ন ৩: হরপ্পার মানুষের প্রধান পেশাগুলি কী ছিল?

উত্তর: হরপ্পার মানুষের প্রধান পেশার মধ্যে ছিল কৃষি কাজ, পশুপালন, বাণিজ্য, মৃৎশিল্প তৈরি, ধাতুশিল্প এবং কারুশিল্প। তারা বিভিন্ন দূরবর্তী অঞ্চলের সাথে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যেও যুক্ত ছিলেন।

প্রশ্ন ৪: হরপ্পা সভ্যতার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কেন অপরিসীম?

উত্তর: আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগেও ভারতীয় উপমহাদেশে যে এমন এক উন্নত, পরিচ্ছন্ন এবং সুশৃঙ্খল নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তা আমাদের প্রাচীন প্রযুক্তিগত ও সামাজিক উৎকর্ষের সাক্ষ্য বহন করে। তাই এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।

সারসংক্ষেপ

  • হরপ্পা সভ্যতা বা সিন্ধু সভ্যতা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম নগর সভ্যতা।
  • এটি প্রায় ৪৭০০ বছর আগে সিন্ধু নদ ও তার উপনদীগুলির অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল।
  • শহরগুলির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল পোড় ইটের ব্যবহার, উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা এবং সমকোণে কাটা রাস্তাঘাট।
  • মহেঞ্জোদাড়োর মহা-স্নানাগার এবং হরপ্পার সুপরিকল্পিত দুর্গ এই সভ্যতার প্রকৌশলবিদ্যার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।
  • কৃষি, বাণিজ্য, এবং কারুশিল্প ছিল এই সভ্যতার অর্থনীতির মূল ভিত্তি।