বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের চারপাশে লক্ষ লক্ষ পদার্থ রয়েছে। এই সমস্ত পদার্থ কী দিয়ে তৈরি? এগুলো মৌল বা উপাদান দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানীদের সামনে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সমস্ত মৌলকে সঠিকভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা, যাতে তাদের ধর্ম ও বৈশিষ্ট্যগুলো সহজে অধ্যয়ন করা যায়। দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা মৌলগুলির পর্যায়গত শ্রেণibibhag বা Periodic Classification of Elements সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। এটি রসায়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্বরূপ। কীভাবে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন উপায়ে মৌলগুলোকে সাজালেন এবং বর্তমানের আধুনিক পর্যায় সারণী (Modern Periodic Table) তৈরি হলো, তা এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
মৌলগুলির শ্রেণীবিন্যাসের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং রোমাঞ্চকর। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সূত্র ও নিয়ম আবিষ্কার করে মৌলগুলোকে সাজানোর চেষ্টা করেছেন। নিচে প্রধান পর্যায়ক্রমিক প্রচেষ্টাগুলো আলোচনা করা হলো:
- ডোবেরিনারের ত্রয়ী সূত্র (Dobereiner's Triads): জার্মানি রসায়নবিদ জোহান উলফগ্যাং ডোবেরিনার ১৮১৭ সালে মৌলগুলোকে তিনটি করে দলের বিন্যস্ত করেন, যাকে ত্রয়ী বলা হয়। এই ত্রয়ীগুলির ক্ষেত্রে, মাঝের মৌলটির পারমাণবিক ভর অন্য দুটি মৌল বা উপাদানের পারমাণবিক ভরের গাণিতিক গড়ের প্রায় সমান হতো। যেমন—লিথিয়াম, সোডিয়াম এবং পটাশিয়াম।
- নিউল্যান্ডের অষ্টক সূত্র (Newlands' Law of Octaves): জন নিউল্যান্ডস ১৮৬৬ সালে মৌলগুলোকে তাদের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক ভর অনুসারে সাজান। তিনি লক্ষ করেন যে, প্রতিটি অষ্টম মৌলের ধর্ম প্রথম মৌলের ধর্মের সাথে হুবহু মিল রয়েছে, যা ঠিক সঙ্গীতের সাতটি স্বরের (সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি) পুনরবৃত্তির মতো। একে নিউল্যান্ডের অষ্টক সূত্র বলা হয়।
- মেন্ডেলিভের পর্যায় সারণী (Mendeleev's Periodic Table): রুশ রসায়নবিদ দিমিত্রি মেন্ডেলিভ মৌলগুলির ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মগুলোকে তাদের পারমাণবিক ভরের পর্যায়গত ফাংশন হিসেবে প্রকাশ করেন। তিনি সেই সময় অজানা কিছু মৌলের জন্য সারণীতে ফাঁকা স্থান রেখে গিয়েছিলেন এবং তাদের ধর্ম সঠিকভাবে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন।
- আধুনিক পর্যায় সারণী (Modern Periodic Table): ১৯১৩ সালে হেনরি মোসলে দেখান যে পারমাণবিক ভরের চেয়ে মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা ($Atomic Number, Z$) তার ধর্ম নির্ধারণের জন্য অনেক বেশি কার্যকরী। আধুনিক পর্যায় সূত্র অনুযায়ী, মৌলগুলির ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম তাদের পারমাণবিক সংখ্যার পর্যায়গত ফাংশন। এতে ১৮টি লম্বালম্বি স্তম্ভ বা 'গ্রুপ' এবং ৭টি অনুভূমিক সারি বা 'পর্যায়' বা 'পিরিয়ড' রয়েছে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: মেন্ডেলিভের পর্যায় সূত্রের মূল ভিত্তি কী ছিল?
উত্তর: মেন্ডেলিভের পর্যায় সূত্রের মূল ভিত্তি ছিল মৌলগুলির ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক ভর।
প্রশ্ন ২: আধুনিক পর্যায় সারণীতে কয়টি গ্রুপ ও পর্যায় আছে?
উত্তর: আধুনিক পর্যায় সারণীতে ১৮টি গ্রুপ এবং ৭টি পর্যায় রয়েছে।
প্রশ্ন ৩: ডোবেরিনারের ত্রয়ী সূত্রের একটি সীমাবদ্ধতা উল্লেখ কর।
উত্তর: ডোবেরিনারের সময়ে আবিষ্কৃত সমস্ত মৌলকে ত্রয়ী হিসেবে সাজানো সম্ভব হয়নি। এটি অল্প কয়েকটি মৌলের ক্ষেত্রেই কেবল প্রযোজ্য ছিল।
সারসংক্ষেপ
- মৌলগুলির সুশৃঙ্খল অধ্যয়নের জন্য শ্রেণীবিন্যাস অত্যন্ত জরুরি।
- ডোবেরিনার এবং নিউল্যান্ডস প্রাথমিক চেষ্টা করেছিলেন যথাক্রমে ত্রয়ী ও অষ্টক সূত্রের মাধ্যমে।
- মেন্ডেলিভ পারমাণবিক ভরের ভিত্তিতে প্রথম কার্যকরী পর্যায় সারণী তৈরি করেন।
- হেনরি মোসলে পারমাণবিক সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক পর্যায় সারণী প্রবর্তন করেন।
- আধুনিক পর্যায় সারণীতে গ্রুপ ও পর্যায়ের সাহায্যে মৌলগুলির ধাতব, অধাতব ও অন্যান্য ধর্ম সহজেই বোঝা যায়।