বিষয়ের ভূমিকা

ইতিহাস শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে হয় এটি কেবল কতগুলো তারিখ এবং রাজ-রাজড়ার নাম মুখস্থ করার বিষয়। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের প্রথম অধ্যায় 'কী, কোথায়, কীভাবে এবং কখন?' আমাদের এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ইতিহাস কেবল অতীতের কিছু ঘটনার সংকলন নয়, এটি হলো মানব সভ্যতার অগ্রগতির এক জীবন্ত দলিল। অতীত মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, এবং তারা কীভাবে ধীরে ধীরে আজকের আধুনিক সমাজে পৌঁছাল—তারই এক মনজ্ঞ অনুসন্ধান হলো ইতিহাস। এই অধ্যায়ে আমরা জানব কীভাবে ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকরা আমাদের অতীতকে আবিষ্কার করেন এবং সেই অতীতের সূত্র ধরে বর্তমানকে বুঝতে শেখেন।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই অধ্যায়ে বেশ কিছু মৌলিক ধারণা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে যা ইতিহাস অধ্যয়নের ভিত্তি তৈরি করে:

১. অতীতে মানুষ কোথায় বাস করত?

লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানুষ নদীর উপত্যকায় বসবাস করে আসছে। নর্মদা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে আদিম মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করত। তারা দক্ষ সংগ্রাহক ছিল এবং আশেপাশের জঙ্গল থেকে ফলমূল ও বন্যপ্রাণী শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। পরবর্তীতে, মানুষ যখন কৃষিকাজ শুরু করে, তখন তারা সিন্ধু ও তার উপনদীগুলির তীরে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। প্রায় ৪৭০০ বছর আগে সিন্ধু নদ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কিছু দুর্দান্ত শহর গড়ে ওঠে, যা ভারতীয় ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। গঙ্গা নদীর তীরেও প্রাচীনকালে বড় বড় সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, যার মধ্যে মগধ ছিল অন্যতম প্রধান।

২. দেশের নাম কীভাবে হলো?

আমাদের দেশকে আমরা সাধারণত 'ভারত' বা 'ইন্ডিয়া' বলে থাকি। 'ইন্ডিয়া' শব্দটি এসেছে 'ইন্ডাস' বা সিন্ধু নদ থেকে, যা ফার্সি এবং গ্রীক ভাষায় 'হিন্দোশ' বা 'ইন্ডোস' নামে পরিচিত ছিল। অন্যদিকে, উত্তর-পশ্চিম ভারতে বসবাসকারী একদল মানুষের উল্লেখ বেদে পাওয়া যায়, যাদের বলা হতো 'ভরত'। তাদের নামানুসারেই আমাদের দেশের নাম রাখা হয় 'ভারতবর্ষ'।

৩. অতীতকে জানার উৎসসমূহ

ইতিহাসবিদরা বিভিন্ন উপাদানের সাহায্যে অতীতকে পুনর্গঠন করেন। প্রধান উৎসগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • পাণ্ডুলিপি (Manuscripts): এগুলি মূলত হাত লেখা প্রাচীন দলিল। প্রাচীনকালে গাছের ছাল (যেমন ভূর্জপত্র) বা পশুর চামড়ার ওপর এগুলি লেখা হতো। অনেক পাণ্ডুলিপি পোকা খেয়ে নষ্ট করে ফেললেও বহু পাণ্ডুলিপি মন্দির ও মঠের মধ্যে সংরক্ষিত ছিল।
  • লিপি বা শিলালিপি (Inscriptions): পাথর বা ধাতুর মতো কঠিন পৃষ্ঠের ওপর খোদাই করা লেখাকে শিলালিপি বলে। রাজারা তাদের আদেশ বা বিজয়গাথা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারের জন্য এগুলি ব্যবহার করতেন।
  • প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান (Archaeological Sources): প্রাচীনকালের অবশিষ্টাংশ যেমন—ভবন, মূর্তি, অস্ত্র, হাতিয়ার, মুদ্রা এবং পাত্র। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মাটি খুঁড়ে এই সমস্ত বস্তু আবিষ্কার করেন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তাদের কাল নির্ধারণ করেন।

৪. অতীত এক নাকি একাধিক?

আমাদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে অতীত কি সবার জন্য এক ছিল? বইয়ের শিরোনামে 'অতীতগুলি' (Pasts) শব্দটি বহুবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হলো সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের অতীত ছিল ভিন্ন। একজন রাজার জীবনযাত্রা এবং সাধারণ কৃষক বা পশুপালকের জীবনযাত্রা কখনোই এক ছিল না। রাজা ও রানীরা তাদের রাজত্ব ও যুদ্ধ নিয়ে রেকর্ড রাখলেও, সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন কষ্টের কথা লিখে রাখতেন না। তাই ইতিহাস সবার জন্য সমানভাবে রচিত হয়নি।

৫. তারিখ ও সালের হিসাব

ইতিহাসের সময়কে আমরা কীভাবে মাপি? সাধারণত যীশু খ্রিষ্টের জন্মের সময়কে কেন্দ্র করে কালগণনা করা হয়। খ্রিষ্টপূর্বাব্দ (BCE) এবং খ্রিষ্টাব্দ (CE) বা খ্রিস্টপূর্ব (BC) ও খ্রিস্টাব্দ (AD) শব্দগুলোর মাধ্যমে আমরা ঐতিহাসিক ঘটনার সঠিক সময় নির্ধারণ করতে পারি।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: পাণ্ডুলিপি এবং শিলালিপির মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

উত্তর: পাণ্ডুলিপি সাধারণত নরম পৃষ্ঠের ওপর, যেমন গাছের ছাল বা তালপাতার ওপর হাতে লেখা হতো, যা সহজে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পক্ষান্তরে, শিলালিপি হলো পাথর বা ধাতুর মতো শক্ত জিনিসের ওপর খোদাই করা লেখা, যা অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

প্রশ্ন ২: প্রত্নতাত্ত্বিকরা কী নিয়ে কাজ করেন?

উত্তর: প্রত্নতাত্ত্বিকরা অতীতকালের অবশিষ্টাংশ যেমন ভবন, পাথর ও ইটের তৈরি কাঠামো, পেইন্টিং, ভাস্কর্য, অস্ত্র, হাতিয়ার, পাত্র এবং মুদ্রা নিয়ে গবেষণা করেন। তারা খননকাজের মাধ্যমে এই বস্তুগুলি উদ্ধার করে অতীতের মানুষের জীবনযাত্রার রূপরেখা তৈরি করেন।

প্রশ্ন ৩: আমাদের দেশ কেন 'ভারত' এবং 'ইন্ডিয়া' নামে পরিচিত?

উত্তর: ফার্সি এবং গ্রীক ভাষাভাষী মানুষ সিন্ধু নদকে 'ইন্ডাস' বলত এবং এই নদীর পূর্ব দিকের ভূমিকে 'ইন্ডিয়া' নামে অভিহিত করত। অন্যদিকে, উত্তর-পশ্চিম ভারতের একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠীর নাম 'ভরত' থেকে আমাদের দেশের নাম 'ভারত' হয়েছে।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা যা শিখলাম:

  • ইতিহাস আমাদের অতীত মানুষের জীবন, সংস্কৃতি এবং সমাজ সম্পর্কে ধারণা দেয়।
  • নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলি প্রাচীন মানব বসতি গড়ে ওঠার প্রধান কেন্দ্র ছিল।
  • পাণ্ডুলিপি, শিলালিপি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হলো অতীতকে জানার মূল চাবিকাঠি।
  • অতীত শুধুমাত্র একজন রাজা বা রানীর নয়, বরং সমাজের সমস্ত মানুষের জীবন নিয়ে গঠিত, তাই অতীত বহুবচন অর্থাৎ 'অতীতগুলি'।
  • সময় পরিমাপের জন্য আমরা খ্রিষ্টপূর্বাব্দ এবং খ্রিষ্টাব্দের সাহায্য নিই।