বিষয়ের ভূমিকা
দশম শ্রেণির ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলো ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উদয় (Rise of Nationalism in Europe)। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গড়ে ওঠে এবং ফরাসি বিপ্লবের মতো ঐতিহাসিক ঘটনা কীভাবে গোটা ইউরোপের মানুষের মনে স্বাধীনতার ও ঐক্যের চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল। ফ্রেডেরিক সরিউ-এর মতো চিত্রশিল্পীর স্বপ্ন থেকে শুরু করে জার্মানি ও ইতালির একত্রীকরণ পর্যন্ত সমস্ত ঐতিহাসিক ঘটনা এই অধ্যায়ের মূল আলোচ্য বিষয়। ছাত্রছাত্রীদের জন্য এটি কেবল একটি পাঠ্য নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের জন্মকাহিনি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
এই অধ্যায়ে বেশ কিছু জটিল ঐতিহাসিক ধারণাকে খুব সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নিচে প্রধান বিষয়গুলি আলোচনা করা হলো:
- ফরাসি বিপ্লব এবং জাতীয়তার ধারণা (1789): জাতীয়তাবাদের প্রথম অভিব্যক্তি ঘটে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে। ফরাসি বিপ্লবীরা রাজা বা সম্রাটের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে এবং 'লা পাত্রি' (পিতৃভূমি) ও 'লা সিতোয়া' (নাগরিক) ধারণাগুলোর মাধ্যমে এক নতুন যৌথ পরিচয়ের জন্ম দেয়।
- নেপোলিয়নীয় সংহিতা (Napoleonic Code): ১৮০৪ সালের সিভিল কোড বা নেপোলিয়নীয় কোড জন্মভিত্তিক সমস্ত বিশেষ অধিকার কেড়ে নেয়, আইনের চোখে সমতা প্রতিষ্ঠা করে এবং সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করে। এটি ইউরোপের অন্য অংশেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সহজ করেছিল।
- ইউরোপে জাতীয়তাবাদের তৈরি হওয়া: সে সময় ইউরোপে কোনো সুনির্দিষ্ট জাতিরাষ্ট্র ছিল না। অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্যের মতো সাম্রাজ্যগুলোতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী একসঙ্গে বসবাস করত। এই বহুজাতিভিত্তিক সাম্রাজ্যগুলোতে জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগ ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
- উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদ: মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের হাত ধরে উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতার দাবি ওঠে। ১৮৩৪ সালে জার্মানির উদ্যোগে গঠিত 'জলভেরাইন' (Zollverein) নামক শুল্ক ইউনিয়ন অর্থনৈতিক একীকরণের পথ প্রশস্ত করে।
- ১৮৩০ থেকে ১৮৪৮: বিপ্লবগুলির যুগ: এই সময়ে ইউরোপজুড়ে উদারতাবাদীরা বিপ্লবের ডাক দেয়। গ্রিসের স্বাধীনতা যুদ্ধ (যাতে লর্ড বায়রন অংশ নেন) এবং ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লব এই যুগের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। শিল্পায়ন এবং খাদ্যাভাবের কারণে ১৮৪৮ সালে সাধারণ মানুষও বিদ্রোহে ফেটে পড়ে।
- জার্মানি এবং ইতালির একত্রীকরণ: উনবিংশ শতাব্দীতে জার্মানি ও ইতালি বর্তমানের রূপ ধারণ করে। ওটো ফন বিসমার্কের রক্ত ও লৌহ নীতির মাধ্যমে জার্মানি এবং কাউভুর, গ্যারিবল্ডি ও মাৎসিনীর অবদানে ইতালি একটি শক্তিশালী জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. ফরাসি বিপ্লবের প্রধান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কী ছিল?
উত্তর: ফরাসি বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং সার্বভৌমত্ব রাজামুকুট থেকে সাধারণ নাগরিকদের হাতে স্থানান্তরিত হয়। এটি স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের আদর্শ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়।
২. 'জলভেরাইন' (Zollverein) কী ছিল?
উত্তর: এটি ১৮৩৪ সালে প্রুশিয়ার উদ্যোগে গঠিত একটি শুল্ক সংঘ (Customs Union)। এর প্রধান কাজ ছিল বিভিন্ন জার্মান রাজ্যের মধ্যে শুল্ক বাধা দূর করা এবং মুদ্রার সংখ্যা কমিয়ে দুটি করা, যা অর্থনৈতিক একীকরণকে ত্বরান্বিত করেছিল।
৩. জার্মানির একত্রীকরণে ওটো ফন বিসমার্কের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: প্রুশিয়ার চ্যান্সেলর ওটো ফন বিসমার্ক 'রক্ত ও লৌহ নীতি' (Blood and Iron Policy) গ্রহণ করেছিলেন। তিনি অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক ও ফ্রান্সকে পরাজিত করে এবং তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে জার্মানিকে একত্রিত করতে সফল হন এবং ১৮৭১ সালে জার্মান সাম্রাজ্য ঘোষণা করেন।
সারসংক্ষেপ
- জাতীয়তাবাদ হলো একটি দেশের মানুষের মধ্যে একাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের চেতনা।
- ফরাসি বিপ্লব ছিল আধুনিক জাতীয়তাবাদের সূতিকাগার।
- উদারনীতি এবং অর্থনৈতিক শুল্ক সংঘ জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রসারিত করেছিল।
- ১৮৪৮ সালের বিপ্লব ইউরোপে পরিবর্তনের নতুন হাওয়া এনেছিল।
- বিসমার্কের নেতৃত্বে জার্মানি এবং মাৎসিনী-কাউভুর-গ্যারিবল্ডির নেতৃত্বে ইতালি একটি স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।