বিষয়ের ভূমিকা

বিজ্ঞানের দুনিয়ায় প্রবেশ করলে আমরা যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি শুনতে পাই তা হলো—পদার্থ আসলে কী দিয়ে তৈরি? প্রাচীন ভারতীয় এবং গ্রিক দার্শনিকরা অনেক আগে থেকেই এই বিষয়ে ভেবেছিলেন। তাঁরা অনুমান করেছিলেন যে পদার্থকে ভাঙতে ভাঙতে এমন এক ক্ষুদ্রতম কণায় পৌঁছানো যায় যাকে আর ভাঙ্গা যায় না। এর নাম দেওয়া হয়েছিল 'পরমাণু' বা 'Atom'। আজকের পাঠে আমরা নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিষয়ের চতুর্থ অধ্যায় অর্থাৎ 'পরমাণুর গঠন' (Structure of the Atom) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এই অধ্যায়ে আমরা জানব কীভাবে বিজ্ঞানীরা পরমাণুর ভেতরে উঁকি দিয়ে তার অভ্যন্তরীণ গঠন আবিষ্কার করেছিলেন এবং বিভিন্ন পরমাণু মডেলের ধারণা লাভ করেছিলেন।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

পরমাণুর গঠন বুঝতে হলে আমাদের তার মূল উপাদানগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। পরমাণু মূলত তিনটি অবর পরমাণুক কণা (Sub-atomic particles) নিয়ে গঠিত:

  • ইলেকট্রন (Electron): এটি ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণা। জে. জে. থমসন এটি আবিষ্কার করেছিলেন।
  • প্রোটন (Proton): এটি ধনাত্মক আধানযুক্ত কণা, যা গোল্ডস্টেইনের ক্যানাল রে পরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয় এবং রাদারফোর্ড এর নামকরণ করেন।
  • নিউট্রন (Neutron): এটি আধানহীন বা প্রসম কণা, যা আবিষ্কার করেছিলেন জে. চ্যাডউইক। প্রোটন ও নিউট্রন একত্রে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে অবস্থান করে।

পরমাণুর ভেতরে এই কণাগুলো কীভাবে সাজানো থাকে তা বোঝানোর জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে নানা মডেল পেশ করেছেন। নিচে প্রধান তিনটি মডেল আলোচনা করা হলো:

১. থমসনের পরমাণু মডেল (Thomson's Model of an Atom)

জে. জে. থমসন ১৯০৪ সালে প্রথম পরমাণুর একটি মডেল পেশ করেন যা 'ওয়াটারমেলন' বা তরমুজ মডেল নামে পরিচিত। তাঁর মতে, পরমাণু হলো ধনাত্মক আধানের একটি গোলক, যার মধ্যে তরমুজের বীজের মতো ইলেকট্রনগুলো গেঁথে থাকে। এই মডেলে পরমাণুর মোট ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধান সমান থাকে, তাই পরমাণু সামগ্রিকভাবে প্রসম হয়। তবে পরবর্তীতে রাদারফোর্ডের আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষার ফলে এই মডেলটি ভুল প্রমাণিত হয়।

২. রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল (Rutherford's Model of an Atom)

আর্নেস্ট রাদারফোর্ড এবং তাঁর সহযোগীরা একটি বিখ্যাত পরীক্ষা করেন যেখানে একটি অত্যন্ত পাতলা সোনার পাতার উপর উচ্চ গতিসম্পন্ন আলফা কণা ($^{4}_{2}He$) ফেলা হয়। এই পরীক্ষার ফলাফলগুলো ছিল চমকপ্রদ:

  • বেশিরভাগ আলফা কণা সোনার পাতা ভেদ করে সোজা চলে যায়।
  • খুব কম সংখ্যক কণা সামান্য কোণে বিচ্যুত হয়।
  • খুবই কম (প্রতি ২০০০০ কণার মধ্যে ১টি) কণা সরাসরি বিপরীত দিকে ফিরে আসে।

এই পরীক্ষার ভিত্তিতে রাদারফোর্ড সিদ্ধান্ত নেন যে পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে একটি ভারী, ধনাত্মক আধানযুক্ত ক্ষুদ্র অঞ্চল রয়েছে যার নাম নিউক্লিয়াস। পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর এই নিউক্লিয়াসের মধ্যেই পুঞ্জীভূত থাকে। আর ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসের চারপাশে খুব উচ্চ গতিতে বৃত্তাকার পথে আবর্তন করে।

৩. বোরের পরমাণু মডেল (Bohr's Model of an Atom)

রাদারফোর্ডের মডেলে একটি বড় ত্রুটি ছিল যে, ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ-চৌম্বকীয় তত্ত্ব অনুযায়ী বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকা ইলেকট্রন শক্তি বিকিরণ করবে এবং অবশেষে নিউক্লিয়াসে এসে পড়বে, যা পরমাণুর স্থায়িত্বকে অসম্ভব করে তোলে। এই ত্রুটি দূর করতে নীলস বোর ১৯১৩ সালে একটি সংশোধিত মডেল প্রদান করেন:

  • ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসের চারপাশে নির্দিষ্ট কিছু অনুমোদিত কক্ষপথে ঘোরে, যেগুলোকে কক্ষপথ বা শক্তিস্তর (Orbits or Energy Levels) বলা হয়।
  • এই শক্তিস্তরগুলোকে K, L, M, N ইত্যাদি অক্ষর দিয়ে বা n = 1, 2, 3, 4 সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।
  • নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে ঘোরার সময় ইলেকট্রনগুলি কোনো শক্তি শোষণ বা বিকিরণ করে না।

ইলেকট্রন বিন্যাস (Electronic Configuration)

বিভিন্ন শক্তিস্তরে ইলেকট্রন কীভাবে বিন্যস্ত থাকে তা বোর-বেরি স্কিমের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। কোনো শক্তিস্তরে সর্বোচ্চ কতটি ইলেকট্রন থাকতে পারে তার সূত্র হলো $2n^2$, যেখানে $n$ হলো শক্তিস্তরের নম্বর। যেমন:

  • প্রথম শক্তিস্তর (K, n=1): $2(1)^2 = 2$টি ইলেকট্রন।
  • দ্বিতীয় শক্তিস্তর (L, n=2): $2(2)^2 = 8$টি ইলেকট্রন।
  • তৃতীয় শক্তিস্তর (M, n=3): $2(3)^2 = 18$টি ইলেকট্রন।

যোজ্যতা বা Valency

যেকোনো পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ কক্ষপথে থাকা ইলেকট্রন সংখ্যাকে তার যোজ্যতা ইলেকট্রন বলা হয়। একটি পরমাণু তার সবচেয়ে বাইরের কক্ষপথে ৮টি ইলেকট্রন (অষ্টক পূর্ণ করা) অর্জনের জন্য যে কয়টি ইলেকট্রন গ্রহণ, বর্জন বা শেয়ার করে, সেই সংখ্যাকেই তার যোজ্যতা (Valency) বলে।

আইসোটোপ এবং আইসোবার (Isotopes and Isobars)

প্রকৃতিতে অনেক মৌল রয়েছে যাদের পরমাণুর পারমাণবিক সংখ্যা একই কিন্তু ভরসংখ্যা আলাদা। এদেরকে আইসোটোপ বলা হয়। যেমন—হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপ রয়েছে: প্রোটিয়াম ($^1_1H$), ডিউটেরিয়াম ($^2_1H$) এবং ট্রিটিয়াম ($^3_1H$). অন্যদিকে, যে সমস্ত ভিন্ন মৌলের পরমাণুর ভরসংখ্যা সমান কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা ভিন্ন, তাদের আইসোবার বলা হয়। যেমন—আর্গন ($^{40}_{18}Ar$) এবং ক্যালসিয়াম ($^{40}_{20}Ca$).

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: পরমাণুর নিউক্লিয়াস কে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড তাঁর বিখ্যাত আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষার মাধ্যমে পরমাণুর নিউক্লিয়াস আবিষ্কার করেন।

প্রশ্ন ২: আইসোটোপ কাকে বলে? উদাহরণ দিন।
উত্তর: যে সমস্ত মৌলের পরমাণুর পারমাণবিক সংখ্যা (প্রোটন সংখ্যা) একই কিন্তু ভরসংখ্যা ভিন্ন, তাদের আইসোটোপ বলে। যেমন—কার্বনের দুটি আইসোটোপ হলো $^{12}_6C$ এবং $^{14}_6C$.

প্রশ্ন ৩: ক্যাথোড রশ্মি কী এবং এর থেকে কোন কণা আবিষ্কৃত হয়?
উত্তর: কম চাপে গ্যাসের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ পাঠালে এক প্রকার অদৃশ্য রশ্মি ক্যাথোড থেকে অ্যানোডের দিকে যায়, একে ক্যাথোড রশ্মি বলে। এই রশ্মি ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণা বা ইলেকট্রন নিয়ে গঠিত।

সারসংক্ষেপ

  • পরমাণু হলো পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক যা ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন নিয়ে গঠিত।
  • ইলেকট্রন ঋণাত্মক, প্রোটন ধনাত্মক এবং নিউট্রন আধানহীন কণা।
  • থমসনের তরমুজ মডেল এবং রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলের পর নীলস বোরের শক্তিস্তর ভিত্তিক মডেল সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হয়।
  • বোর-বেরি নিয়ম ($2n^2$) অনুসারে বিভিন্ন কক্ষপথে ইলেকট্রন বণ্টিত থাকে।
  • যোজ্যতা হলো পরমাণুর রাসায়নিক সংযোগ ক্ষমতা।
  • আইসোটোপ ও আইসোবার পরমাণুর গঠনগত বৈচিত্র্য বোঝাতে সাহায্য করে।