বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের চারপাশে এমন অনেক পদার্থ বা বস্তু রয়েছে যা সরাসরি এককভাবে পাওয়া যায় না। এগুলি একাধিক পদার্থের মিশ্রণ। বাতাস, সমুদ্রের জল, মাটির জল—সবকিছুই মিশ্রণ। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে আমাদের বিশুদ্ধ পদার্থের প্রয়োজন হয়। মিশ্রণ থেকে প্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর উপাদানগুলিকে আলাদা করার প্রক্রিয়াকে উপাদানের পৃথকীকরণ বলা হয়। এনসিইআরটি (NCERT) ষষ্ঠ শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকের দ্বিতীয় অধ্যায়ে এই পৃথকীকরণের নানা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই ব্লগে আমরা সহজ ভাষায় সমস্ত পৃথকীকরণ প্রক্রিয়াগুলি বিস্তারিতভাবে জানব।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
মিশ্রণ থেকে উপাদান পৃথক করার অনেক পদ্ধতি আছে। পদার্থের অবস্থা (কঠিন, তরল, গ্যাস) এবং তাদের গুণাবলীর ওপর ভিত্তি করে সঠিক পদ্ধতি নির্বাচন করা হয়। নিচে প্রধান পদ্ধতিগুলি আলোচনা করা হলো:
১. হাত দিয়ে বাছা (Handpicking)
খাবারের চাল, ডাল বা ডালের মধ্যে মাঝে মাঝে পাথরের টুকরো, ছোট কাঁকর বা পোকা থাকে। এই ধরনের কঠিন উপাদানগুলির আকার বা রঙ আলাদা হলে হাত দিয়ে সহজেই তা বেছে আলাদা করা যায়। এটি খুব সাধারণ এবং প্রাচীন একটি পদ্ধতি। এর সুবিধা হলো বড় আকারের অপদ্রব্য সহজেই দূর করা যায়।
২. ঝাড়াই (Threshing)
শস্য কাটার পর ধান বা গমের গাছ থেকে দানাগুলিকে আলাদা করতে হয়। গাছগুলিকে শুকিয়ে শক্ত মাটিতে বা পাথরের ওপর পেটালে ধানের দানা গাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াটিকে ঝাড়াই বলা হয়। অনেক সময় বলদ বা ট্রাক্টরের সাহায্যেও এই কাজ করা হয়।
৩. উদ্ত বা ঝাড়া (Winnowing)
হালকা তুষ বা ধুলোবালি থেকে ভারী শস্যের দানাকে আলাদা করার জন্য বাতাসের সাহায্য নেওয়া হয়। একে উইনোয়িং বা ঝাড়া বলে। বাতাস হালকা উপাদানগুলিকে দূরে উড়িয়ে নিয়ে যায় এবং ভারী শস্যের দানাগুলি নিচে একটি স্তূপে জমা হয়।
৪. চালনি দিয়ে চালা (Sieving)
ময়দা থেকে ভুসি বা বড় কণা আলাদা করার জন্য চালনি ব্যবহার করা হয়। ছোট কণা চালনির ছিদ্র দিয়ে নিচে পড়ে যায় এবং বড় কণাগুলি চালনির ওপরে থেকে যায়। নির্মাণকাজে বালি থেকে ছোট পাথর বা কাঁকর আলাদা করতেও বড় চালনি ব্যবহার করা হয়।
৫. থিতানো, নিস্কাশন এবং ছাঁকন (Sedimentation, Decantation and Filtration)
- থিতানো: মিশ্রণে থাকা ভারী কঠিন কণাগুলি জল বা অন্য তরলে দীর্ঘক্ষণ রেখে দিলে পাত্রের তলায় থিতিয়ে বা জমে যায়। একে থিতানো বা Sedimentation বলে।
- নিস্কাশন: থিতিয়ে যাওয়ার পর ওপরের পরিষ্কার জল বা তরলটি অন্য পাত্রে ঢেলে নেওয়াকে নিস্কাশন বলে।
- ছাঁকন: ফিল্টার পেপার বা কাপড়ের সাহায্যে তরল ও অদ্রবণীয় কঠিন পদার্থের মিশ্রণকে আলাদা করার প্রক্রিয়াকে ছাঁকন বলে। যেমন চা তৈরি করার পর ছাঁকনি দিয়ে চা পাতা আলাদা করা হয়।
৬. বাষ্পীভবন (Evaporation)
জল বা অন্য কোনো তরলে দ্রবীভূত কঠিন পদার্থকে আলাদা করার জন্য বাষ্পীভবন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সমুদ্রের জল থেকে নুন প্রস্তুত করতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সূর্যতাপে সমুদ্রের জল বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে যায় এবং নুন পিছনে পড়ে থাকে।
৭. ঘনীভবন (Condensation)
জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে তরলে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ঘনীভবন বলে। বাষ্পীভবনের সময় ঢাকনার ওপর ঠান্ডা বরফ রাখলে বাষ্প ঠান্ডা হয়ে আবার জলের ফোঁটায় পরিণত হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: মিশ্রণ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
উত্তর: দুই বা ততোধিক পদার্থ যে কোনো অনুপাতে মিশে থাকলে তাকে মিশ্রণ বলে। যেমন—বাতাস, লেবুর শরবত ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: সমুদ্রের জল থেকে নুন কীভাবে তৈরি করা হয়?
উত্তর: সমুদ্রের জল অগভীর গর্তে জমিয়ে রাখা হয়। সূর্যের তাপে জল বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে যায় এবং তলানিতে নুন পড়ে থাকে।
প্রশ্ন ৩: ছাঁকন এবং থিতানোর মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: থিতানোতে ভারী কণা নিজে থেকেই নিচে জমে যায়, আর ছাঁকনে ফিল্টার পেপার বা কাপড়ের সাহায্যে কণাগুলিকে আটকে তরল আলাদা করা হয়।
সারসংক্ষেপ
- মিশ্রণ থেকে বিভিন্ন উপাদান আলাদা করা অত্যন্ত জরুরি।
- হাত দিয়ে বাছা, ঝাড়াই ও ঝাড়া হলো কঠিন পদার্থ পৃথক করার পদ্ধতি।
- থিতানো ও ছাঁকন অদ্রবণীয় কঠিন ও তরল মিশ্রণ পৃথক করে।
- বাষ্পীভবন এবং ঘনীভবন জলের চক্র এবং দ্রবণ থেকে কঠিন পদার্থ আলাদা করতে সাহায্য করে।