বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম প্রধান মৌলিক চাহিদা হলো পরিচ্ছদ বা বস্ত্র। শীত নিবারণ, লজ্জা নিবারণ কিংবা সৌন্দর্য বর্ধন—সবক্ষেত্রেই কাপড়ের জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন এই কাপড়গুলো আসলে কোথা থেকে আসে? কীভাবে চারপাশের নানা উপাদান থেকে তৈরি হয় আমাদের পরিধেয় বস্ত্র? ষষ্ঠ শ্রেণীতে আমরা জেনেছি তন্তু বা ফাইবার থেকে কীভাবে সুতো তৈরি হয় এবং সেই সুতো দিয়ে কাপড় বোনা হয়। সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের তৃতীয় অধ্যায় 'তন্তু থেকে বস্ত্র' (Fibre to Fabric)-এ আমরা আরও গভীরভাবে জানবো উদ্ভিদ ও প্রাণীজ তন্তু, বিশেষ করে পশম (Wool) এবং রেশম বা সিল্ক (Silk) কীভাবে প্রস্তুত হয় সে সম্পর্কে। এই অধ্যায়টি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের বিজ্ঞানকে বুঝতে দারুণভাবে সাহায্য করে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
তন্তু মূলত দুই প্রকারের হতে পারে—প্রাকৃতিক তন্তু এবং কৃত্রিম বা সংশ্লেষিত তন্তু। প্রাকৃতিক তন্তু আবার উদ্ভিদ এবং প্রাণী থেকে পাওয়া যায়। এই অধ্যায়ের মূল আকর্ষণ হলো প্রাণীজ তন্তু, অর্থাৎ পশম এবং রেশম কীভাবে উৎপাদিত হয় তা জানা। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পশম বা উল (Wool)
শীতকালে আমরা যে পশমি সোয়েটার পরি, তা মূলত ভেড়া, ছাগল, ইয়াক এবং কিছু অন্যান্য প্রাণীর দেহ থেকে পাওয়া পশম বা লোম দিয়ে তৈরি হয়। ভেড়ার শরীরের ঘন পশমের আস্তরণ তাদের শরীরকে উষ্ণ রাখে। এই পশম সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ এবং কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
- কর্তন (Shearing): ভেড়ার শরীরের গরমের দিনে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে পাতলা চামড়াসহ পশমের উপরিভাগ কেটে নেওয়া হয়। এতে ভেড়ার কোনো কষ্ট হয় না, কারণ চামড়ার মৃত কোষের ওপর লোম থাকে।
- স্কাউরিং বা মার্জন (Scouring): কেটে নেওয়া পশমগুলো ধুলোবালি, ঘাম ও তেল দূর করার জন্য বড় বড় ট্যাঙ্কে সাবান বা ডিটারজেন্ট দিয়ে খুব ভালোভাবে ধোয়া হয়।
- বাছাইকরণ (Sorting): ধোয়ার পর পশমগুলোকে টেক্সচার বা গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়।
- রং করা এবং সুতো তৈরি (Dyeing and Spinning): প্রাকৃতিক পশমের রঙ সাধারণত কালো, বাদামী বা সাদা হয়। তাই প্রয়োজনমতো পশমগুলোকে বিভিন্ন রঙে রাঙানো হয়। এরপর সেগুলোকে সোজা করে, আঁচড়ে সুতো পাকানো হয়।
২. রেশম বা সিল্ক (Silk)
রেশম হলো একটি অত্যন্ত প্রিমিয়াম এবং বিলাসবহুল প্রাণীজ তন্তু, যা রেশম পোকা (Silkmoth) থেকে পাওয়া যায়। রেশম চাষ বা রেশম উৎপাদনের বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়াকে বলা হয় 'সেরিকালচার' (Sericulture)। রেশম পোকার জীবনচক্র অত্যন্ত চমৎকার:
- স্ত্রী রেশম পোকা তুঁত গাছের পাতায় ডিম পাড়ে।
- ডিম ফুটে লার্ভা বা শুঁয়োপোকা (Caterpillar) বের হয়, যাদের রেশম পোকা বলা হয়।
- এই পোকাগুলো দিনরাত তুঁত পাতা খেয়ে বড় হয় এবং নিজেদের মুখ থেকে এক ধরণের লালা বা প্রোটিন নিঃসরণ করে যা বাতাসের সংস্পর্শে এসে শক্ত রেশম তন্তুতে পরিণত হয়।
- পোকাটি নিজের চারপাশে এই তন্তু পেঁচিয়ে একটি আবরণ তৈরি করে, যাকে পিউপাল দশা বা কোকুন (Cocoon) বলে।
- এই কোকুনগুলো সংগ্রহ করে গরম জলে ফুটিয়ে রেশম তন্তু বা সুতো আলাদা করা হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: পশম আহরণের সময় ভেড়ার গায়ে কি ব্যথা লাগে?
উত্তর: না, পশম কর্তন বা Shearing-এর সময় ভেড়ার কোনো কষ্ট বা ব্যথা হয় না। কারণ ভেড়ার ত্বকের ওপরের স্তরটি মৃত কোষ দ্বারা গঠিত এবং পশম কেটে নেওয়ার সময় নতুন চামড়ার কোনো ক্ষতি হয় না। বরং গরমের দিনে পশম কেটে ফেলা ভেড়াদের স্বস্তি দেয়।
প্রশ্ন ২: সেরিকালচার (Sericulture) বলতে কী বোঝো?
উত্তর: বাণিজ্যিকভাবে রেশম পাওয়ার জন্য রেশম পোকার প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণকে সেরিকালচার বা রেশম চাষ বলা হয়। তুঁত গাছের চাষ করে এই পোকাদের লালন-পালন করা হয়।
প্রশ্ন ৩: ভেড়ার শরীরের ঘন লোম তাদের শীত থেকে কীভাবে রক্ষা করে?
উত্তর: ভেড়ার লোম বা পশম প্রচুর পরিমাণে বাতাস আটকে রাখতে পারে। বাতাস তাপের কুপরিবাহী হওয়ায় ভেড়ার শরীরের তাপ বাইরে বের হতে পারে না এবং বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে ভেড়ার শরীর গরম থাকে।
সারসংক্ষেপ
- বস্ত্র তৈরির মূল উপাদান হলো তন্তু, যা উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে পাওয়া যায়।
- পশম আসে ভেড়া, ছাগল ও ইয়াকের মতো পশমযুক্ত প্রাণী থেকে।
- পশম উৎপাদনের ধাপগুলো হলো: কর্তন, মার্জন, বাছাইকরণ, ছোট ফাইবার বা বার্স অপসারণ, রং করা এবং সুতো তৈরি।
- রেশম বা সিল্ক আসে রেশম পোকার কোকুন থেকে, আর এর চাষকে বলা হয় সেরিকালচার।
- প্রাকৃতিক তন্তু আমাদের পরিবেশের জন্য নিরাপদ এবং আরামদায়ক।