বিষয়ের ভূমিকা

দশম শ্রেণির ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো "ভারতে জাতীয়তাবাদ"। এই অধ্যায়ে আমরা জানতে পারি কীভাবে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর মনে তীব্র অসন্তোষ গড়ে উঠেছিল এবং সেই অসন্তোষ কীভাবে একটি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এক নতুন মোড় নেয়। অহিংসা এবং সত্যাগ্রহের পথ ধরে কীভাবে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ এই সংগ্রামে শামিল হয়েছিলেন, তা এই অধ্যায়ের মূল আলোচনার বিষয়। আধুনিক ভারতের জন্ম এবং এর গণতান্ত্রিক কাঠামোর পেছনে এই আন্দোলনের ভূমিকা অপরিসীম। তাই প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর জন্য এই অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয়।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

ভারতের জাতীয়তাবাদের উত্থান ও বিকাশ কোনো একদিনে ঘটেনি। এর পেছনে কাজ করেছে বহু রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ। নিচে এই অধ্যায়ের প্রধান ধারণাগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, খিলাফত এবং অসহযোগ আন্দোলন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। যুদ্ধের ফলে ব্রিটিশদের প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রচুর বেড়ে যায়, যা মেটাতে ভারতে নতুন কর ধার্য করা হয় এবং দ্রব্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। গ্রামের তরুণদের জোর করে সেনাবাহিনীতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় (Force recruitment)। এর ওপর ১৯১৮-১৯ ও ১৯২১-২২ সালে দেশের বিভিন্ন অংশে ফসলের বিপর্যয় এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর কারণে চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে ভারতবাসীর আশা ছিল যে যুদ্ধ শেষ হলে ব্রিটিশ সরকার তাদের স্বায়ত্তশাসন বা মুক্তির পথ দেখাবে, কিন্তু তা হয়নি। ঠিক এই সময়েই মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে আসেন এবং "সত্যাগ্রহ" (সত্য ও অহিংসার ওপর ভিত্তি করে আন্দোলন)-এর নতুন পদ্ধতি চালু করেন। তিনি চম্পারণ, খেদা এবং আমেদাবাদে সফল সত্যাগ্রহ পরিচালনা করে নিজের নেতৃত্ব প্রমাণ করেন।

  • রাওলাট আইন (১৯১৯): ব্রিটিশ সরকার ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল কর্তৃক পাস করা এই আইনের মাধ্যমে বিনা বিচারে রাজনৈতিক বন্দীদের দুই বছর পর্যন্ত কারাবন্দী রাখার ক্ষমতা পায়। এর বিরুদ্ধে সারা দেশে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয় এবং মহাত্মা গান্ধী 'রাওলাট সত্যাগ্রহ' শুরু করেন।
  • জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড: ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে বৈশাখী মেলা এবং রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশে জেনারেল ডায়ার নির্মমভাবে গুলি চালান, যাতে শত শত নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। এই ঘটনার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশ প্রদত্ত 'নাইটহুড' উপাধি বর্জন করেন।
  • খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর তুরস্কের খলিফার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে ভারতে মওলানা মহম্মদ আলি ও শওকত আলির নেতৃত্বে 'খিলাফত আন্দোলন' শুরু হয়। মহাত্মা গান্ধী হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে এটিকে দেখেন এবং ১৯২০ সালের নাগাদ কংগ্রেসকে সাথে নিয়ে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব দেন। অসহযোগ আন্দোলনে ব্রিটিশ পণ্য বর্জন, সরকারি স্কুল-কলেজ ও আদালত ত্যাগ এবং কর প্রদানে অস্বীকৃতির ডাক দেওয়া হয়।

২. আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা ও অংশগ্রহণ

অসহযোগ আন্দোলন কেবল শহর বা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। শহরগুলোতে মধ্যবিত্তরা স্কুল-কলেজ ও আদালত বর্জন করেন, বিদেশী কাপড় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে শহরের এই আন্দোলন নানা কারণে স্তিমিত হতে শুরু করে, যেমন খাদি বস্ত্রের দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে ছিল এবং বিকল্প ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের অভাব ছিল। অন্যদিকে, গ্রামের দিকে কৃষকরাও এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন:

  • আওয়াধে কৃষক আন্দোলন: বাবা রামচন্দ্রের নেতৃত্বে কৃষকরা জমিদারদের উচ্চ খাজনা ও জোরপূর্বক বেগার শ্রমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।
  • উপজাতীয় আন্দোলন: অন্ধপ্রদেশের গুডেম পাহাড়ে অল্লুরী সীতারাম রাজুর নেতৃত্বে উপজাতীয় বিদ্রোহীরা গوریলা যুদ্ধ শুরু করেন, কারণ ব্রিটিশ সরকার তাদের ঐতিহ্যবাহী জঙ্গল আইন প্রয়োগ করে বনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল।
  • বাগিচা শ্রমিকরা: অসমে 'ইনল্যান্ড ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট' (১৮৫৯)-এর কারণে চা বাগানের শ্রমিকদের বাগান ছেড়ে বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। অসহযোগ আন্দোলনের বার্তা পেয়ে হাজার হাজার শ্রমিক চা বাগান ছেড়ে নিজেদের বাড়ির পথ ধরেন।

৩. আইন অমান্য আন্দোলন এবং পূর্ণ স্বরাজের দাবি

১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরা থানায় একটি হিংসাত্মক ঘটনার পর মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেন। এরপর সি. আর. দাস ও মতিলাল হালের মতো নেতারা 'স্বরাজ পার্টি' গঠন করে আইনসভায় প্রবেশ করে রাজনীতি করার পক্ষপাতী ছিলেন। ১৯৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে জওহরলাল নেহেরুর সভাপতিত্বে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে "পূর্ণ স্বরাজ" বা সম্পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব পাশ হয় এবং ঠিক করা হয় যে ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি দিনটিকে 'স্বাধীনতা দিবস' হিসেবে পালন করা হবে।

এই পূর্ণ স্বরাজ অর্জনের জন্যই মহাত্মা গান্ধী ১৯৩০ সালের ১২ মার্চ বিখ্যাত "ডান্ডি মার্চ" বা লবণ সত্যাগ্রহ শুরু করেন। তিনি তাঁর ৭-জন বিশ্বস্ত অনুগ্ৰামীকে নিয়ে সবরমতী আশ্রম থেকে গুজরাটের সমুদ্র উপকূলবর্তী গ্রাম ডান্ডি পর্যন্ত ২৪০ মাইল পথ পায়ে হেঁটে যান এবং ৬ এপ্রিল সমুদ্রের জল ফুটিয়ে লবণ তৈরি করে ব্রিটিশ লবণ আইন ভঙ্গ করেন। এই আন্দোলন সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মহাত্মা গান্ধীর এই আইন অমান্য আন্দোলন দমনের জন্য ব্রিটিশ সরকার হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করে, যার মধ্যে গান্ধীজিও ছিলেন। পরে ১৯৩১ সালে গান্ধী-আরউইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং গান্ধীজি দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে লন্ডন যান, যদিও সেই বৈঠক ব্যর্থ হয়। ভারতে ফিরে এসে তিনি আবারও আন্দোলন শুরু করলেও ১৯৩৪ সালের মধ্যে এর গতি মন্থর হয়ে যায়।

৪. যৌথ পরিচয়ের অনুভূতি এবং সংস্কৃতির ভূমিকা

ভারতের জাতীয়তাবাদ কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি দেশের মানুষের মনে একটি 'যৌথ জাতীয় পরিচয়ের' জন্ম দিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা 'বন্দে মাতরম' গানটি এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা 'ভারত মায়ের' ছবি ভারতবাসীর মনে দেশপ্রেমের বীজ বপন করেছিল। এ ছাড়াও, লোককথা, লোকগীতি এবং লোকনৃত্য সংগ্রহের মাধ্যমে ভারতীয়রা তাদের হারানো ঐতিহ্য ও গৌরব পুনরুদ্ধার করতে শুরু করেন। জাতীয় পতাকা বা স্বরাজের প্রতীক হিসেবে তেরঙ্গা পতাকার (লাল, হলুদ ও সবুজ রঙের, যাতে চরকা আঁকা ছিল) রূপায়ন মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে সাহায্য করেছিল।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: রাওলাট আইন কী এবং এর বিরুদ্ধে ভারতবাসীদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
উত্তর: ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল কর্তৃক পাস করা রাওলাট আইনের মাধ্যমে পুলিশকে বিনা বিচারে যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার এবং দুই বছর পর্যন্ত কারাবন্দী রাখার অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই আইন বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী ও মৌলিক অধিকার হরণকারী ছিল। এর বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধী রাওলাট সত্যাগ্রহের ডাক দেন। সারা দেশে দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়, রেলওয়ে ওয়ার্কশপে শ্রমিকরা ধর্মঘট করেন এবং বিভিন্ন স্থানে র‍্যালি ও মিছিল বের হয়। ব্রিটিশ সরকার এই আন্দোলন দমনে কঠোর দমনপীড়ন চালায়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

প্রশ্ন ২: অসহযোগ আন্দোলন কেন প্রত্যাহার করা হয়েছিল?
উত্তর: ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা নামক স্থানে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী মিছিলের ওপর পুলিশ গুলি চালালে জনতা উত্তেজিত হয়ে থানায় আক্রমণ করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। এই হিংসাত্মক ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী নিহত হন। মহাত্মা গান্ধী অহিংসার নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশবাসী এখনও পুরোপুরি অহিংস সত্যাগ্রহের জন্য প্রস্তুত নয়। তাই আন্দোলন হিংসার পথে চলে যাওয়ায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং ১৯২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তাৎক্ষণিকভাবে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।

প্রশ্ন ৩: 'ডান্ডি মার্চ' কেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ?
উত্তর: ডান্ডি মার্চ (১৯৩০) ছিল মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা বিন্দু। লবণ ছিল ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বস্তু, যার ওপর ব্রিটিশ সরকার একচেটিয়া কর বসিয়েছিল। গান্ধীজি লবণকে একটি হাতিয়ার বানিয়ে সবরমতী আশ্রম থেকে ডান্ডি সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত ২৪০ মাইল পদযাত্রা করেন এবং আইন অমান্য করে লবণ তৈরি করেন। এই প্রতীকী প্রতিবাদ সারা দেশের মানুষকে সরাসরি সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড় করায় এবং এটি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।

সারসংক্ষেপ

  • ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শোষণমূলক নীতি এবং প্রথম বিশ্বাবস্থার ফলাফল ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটায়।
  • মহাত্মা গান্ধীর আগমন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে 'সত্যাগ্রহ' এবং 'অহিংসা'র নতুন দর্শন নিয়ে আসে।
  • রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা 'অসহযোগ আন্দোলন' ভারতীয় রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।
  • ১৯৩০ সালের 'ডান্ডি মার্চ' এবং 'আইন অমান্য আন্দোলন' পূর্ণ স্বরাজের দাবিকে আরও জোরালো করে তোলে।
  • সাহিত্য, শিল্পকলা এবং লোকসংসৃতির চর্চা ভারতবাসীর মধ্যে এক গভীর যৌথ জাতীয় পরিচয় ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলে।