বিষয়ের ভূমিকা

দ্বাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব আধুনিক বিশ্ব রাজনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা সম্পর্কে, যা হলো 'দ্বিমেরুবাদের অবসান' (End of Bipolarity)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতি প্রধানত দুটি মহাশক্তিধর শিবিরে বিভক্ত ছিল—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী শিবির এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক শিবির। এই দুই মহাশক্তির পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই দ্বিমেরুবাদ বলা হতো। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের আকস্মিক ও নাটকীয় পতনের মধ্য দিয়ে এই দ্বিমেরু ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সূচনা হয়। এই অধ্যায়ে আমরা জানব কীভাবে একটি মহাশক্তি রাতারাতি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল এবং এর পেছনে কী কী ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণ কাজ করেছিল।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

দ্বিমেরুবাদের অবসানের পেছনের কারণ এবং তার ফলাফলগুলো গভীরভাবে বুঝতে হলে আমাদের কয়েকটি মূল ধারণার ওপর আলোকপাত করতে হবে:

  • সোভিয়েত ইউনিয়নের গঠন ও প্রকৃতি: ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নের (USSR) জন্ম হয়। এটি সমাজতন্ত্রের আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল এবং দ্রুত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়।
  • মিখাইল গর্বাচেভ এবং সংস্কার নীতি: ১৯৮০-এর দশকের মাঝামা সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতি চরম সংকটের মুখে পড়ে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য মিখাইল গর্বাচেভ দুটি যুগান্তকারী সংস্কার নীতি ঘোষণা করেন—'গ্লাসনস্ত' (Glasnost বা স্বচ্ছতা) এবং 'প্রেস্ত্রোইকা' (Perestroika বা পুনর্গঠন)। কিন্তু এই সংস্কারগুলি আশানুরূপ ফল না দিয়ে উল্টো সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিকে ত্বরান্বিত করে।
  • সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মূল কারণসমূহ:
    • অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট।
    • রাজনৈতিক একনায়কতন্ত্র এবং কমিউনিস্ট পার্টির অগণতান্ত্রিক শাসন।
    • পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলিতে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের গণঅভ্যুত্থান।
    • জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যা বিভিন্ন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।
  • বার্গিন প্রাচীরের পতন (১৯৮৯): শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রতীক ছিল বার্লিন প্রাচীর। ১৯৮৯ সালের নভেম্বর মাসে এই প্রাচীরের পতন ঘটে, যা পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির একত্রীকরণ এবং সোভিয়েত প্রভাবের পতনের পথ প্রশস্ত করে।
  • শক থেরাপি (Shock Therapy): সমাজতন্ত্র থেকে পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণের জন্য রাশিয়া ও অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলিতে যে রূপান্তর নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, তাকেই 'শক থেরাপি' বলা হয়। এর ফলে এই দেশগুলির অর্থনীতিতে সাময়িকভাবে চরম বিপর্যয় নেমে আসে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রধান কারণ কী ছিল?
উত্তর: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রধান কারণগুলির মধ্যে ছিল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চরম স্থবিরতা, সামরিক খাতে অতিরিক্ত ব্যয়, কমিউনিস্ট পার্টির আমলাতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক শাসন এবং বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের মধ্যে তীব্র জাতীয়তাবাদী অসন্তোষ।

প্রশ্ন ২: 'শক থেরাপি' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) নির্দেশনায় রাশিয়া ও অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলিতে যে আকস্মিক ও কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কার নীতি প্রয়োগ করা হয়েছিল, তাকে 'শক থেরাপি' বলা হয়।

প্রশ্ন ৩: গর্বাচেভের দুটি সংস্কার নীতির নাম কী?
উত্তর: গর্বাচেভের দুটি প্রধান সংস্কার নীতি ছিল 'গ্লাসনস্ত' (স্বচ্ছতা) এবং 'প্রেস্ত্রোইকা' (পুনর্গঠন)।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়ের মূল শিক্ষাগুলি সংক্ষেপে নিচে দেওয়া হলো:

  • সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে বিশ্বে দীর্ঘকালীন 'দ্বিমেরুবাদ' বা Bipolarity-র অবসান ঘটে।
  • মিখাইল গর্বাচেভের সংস্কার নীতি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
  • সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াই 'শক থেরাপি' নামে পরিচিত, যা সাময়িকভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে চরম কষ্ট নিয়ে এসেছিল।
  • দ্বিমেরুবাদের অবসানের ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বা একমেরুবাদের (Unipolarity) যুগ শুরু হয়।