প্রেমের জগতে কতই না অদ্ভুত ঘটনা ঘটে! কেউ তাজমহল গড়ে, কেউ পাহাড় কাটে, আবার কেউ সঙ্গীর জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দেয়। কিন্তু পশু-পাখিদের জগতটাও যে ভালোবাসার নানা রঙ্গে রঙিন, তা আমরা অনেকেই জানি না। এদের ভালোবাসার প্রকাশভঙ্গি এতটাই মিষ্টি আর আন্তরিক যে, মাঝে মাঝে আমাদের মানুষদের প্রেমও তার কাছে হার মেনে যায়। আজ আমরা এমন এক ছোট্ট প্রাণীর কথা বলব, যাদের ভালোবাসার গল্প শুনলে আপনি অবাক তো হবেনই, হয়তো একটু লজ্জাও পেয়ে যেতে পারেন!

ছোট্ট প্রাণী কিন্তু বিশাল হৃদয়: প্রেইরি ভোলের গল্প

আমরা কথা বলছি প্রেইরি ভোল (Prairie Vole) নামের এক বিশেষ প্রজাতির ইঁদুর নিয়ে। উত্তর আমেরিকার তৃণভূমিতে এদের বাস। দেখতে সাধারণ ইঁদুরের মতো হলেও, এদের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে খুবই বিরল। মানুষ যেমন তার সঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকে, ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়, প্রেইরি ভোলরাও ঠিক তেমনই। ওরা কেবল একজনকেই ভালোবাসে এবং সারা জীবন তার সাথেই কাটিয়ে দেয়। ভাবুন তো, মাত্র ৩-৫% স্তন্যপায়ী প্রাণী এমন একগামী (monogamous) সম্পর্ক বজায় রাখে, আর এই ছোট্ট প্রেইরি ভোল তাদের মধ্যে অন্যতম।

ওদের সম্পর্ক কিন্তু শুধু এক ছাদের নিচে বাস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ওরা একে অপরের যত্ন নেয়, একসাথে বাসা তৈরি করে এবং বাচ্চাদেরও একসাথে বড় করে তোলে। পুরুষ ভোল ঠিক মানুষের মতোই একজন দায়িত্বশীল বাবার ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যে বিষয়টা সবচেয়ে অবাক করার মতো, তা হলো ওদের একে অপরকে সান্ত্বনা দেওয়ার ক্ষমতা।

জানেন কি? প্রেইরি ভোলরা যখন দেখে তাদের সঙ্গী কোনো কারণে কষ্ট পাচ্ছে বা মানসিক চাপে আছে, তখন তারা এগিয়ে আসে এবং ঠিক মানুষের মতোই তাকে জড়িয়ে ধরে, আদর করে সান্ত্বনা দেয়।

ভালোবাসার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

বিজ্ঞানীরা এই মিষ্টি আচরণের পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছু আকর্ষণীয় তথ্য খুঁজে পেয়েছেন। এমোরি ইউনিভার্সিটির গবেষকরা একটি পরীক্ষায় দেখেন, যখন একটি ভোলকে তার সঙ্গীর থেকে আলাদা করে সামান্য বৈদ্যুতিক শক দিয়ে ভয় দেখানো হয়, তখন সে প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়ে যায়। এরপর যখন তাকে আবার তার সঙ্গীর কাছে ফিরিয়ে আনা হয়, তখন তার সঙ্গী ছুটে এসে তাকে চাটা শুরু করে এবং গা ঘেঁষে বসে থাকে। এই আচরণটা অনেকটা মানুষের জড়িয়ে ধরার মতোই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সান্ত্বনা দেওয়ার প্রবণতা তাদের মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন (oxytocin) নামক এক হরমোনের কারণে হয়, যা 'লাভ হরমোন' নামেও পরিচিত। এই হরমোনই ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং সামাজিক বন্ধন তৈরি করতে সাহায্য করে। মজার ব্যাপার হলো, এই একই হরমোন মানুষের মধ্যেও ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি করে।

শুধু তাই নয়, যখন প্রেইরি ভোলরা তাদের সঙ্গীর সাথে পুনরায় মিলিত হয়, তখন তাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টারে ডোপামিন (dopamine) নামক আরেকটি হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। এই হরমোন আমাদের আনন্দ এবং পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি দেয়। অর্থাৎ, ভালোবাসার মানুষের সাথে থাকাটা তাদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই একটি পুরস্কারের মতো। এই রাসায়নিক বিক্রিয়াই তাদের বন্ধনকে এতটা মজবুত করে তোলে।

শুধু সঙ্গী নয়, বন্ধুত্বেরও দাম দেয় ওরা

প্রেইরি ভোলের ভালোবাসা শুধু তাদের সঙ্গীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা তাদের পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের প্রতিও একই রকম সহানুভূতি দেখায়। তবে অচেনা বা বাইরের কারো প্রতি তারা ততটা বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। ঠিক যেমন আমরা আমাদের কাছের মানুষের দুঃখে বেশি কষ্ট পাই এবং তাদের পাশে দাঁড়াই, এই ছোট্ট প্রাণীগুলোও তাই করে। তাদের এই আচরণ প্রমাণ করে যে, সহানুভূতি এবং ভালোবাসাแสดง করার জন্য বিশাল শরীর বা উন্নত মস্তিষ্কের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় শুধু একটি সুন্দর মনের।

তাহলে পরেরবার যখন ভালোবাসার কোনো উদাহরণ খুঁজবেন, তখন শুধু তাজমহল বা লাইলি-মজনুর কথাই ভাববেন না। একবার এই ছোট্ট প্রেইরি ভোলের কথাও মনে করবেন। যারা কোনো জাঁকজমক ছাড়াই, খুব সাধারণভাবেই শিখিয়ে দেয় ভালোবাসার আসল অর্থ – দুঃসময়ে সঙ্গীর পাশে থাকা, তাকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা। ওদের এই মিষ্টি ভালোবাসার গল্প আমাদের শেখায়, ভালোবাসা মানে শুধু একসাথে পথ চলাই নয়, বরং পথের কাঁটাগুলোকেও একসাথে সরিয়ে ফেলা।