যখন প্রেম ছিল চিঠিতে, আর পরিচয় ছিল চোখে
আজকের দিনে ভালোবাসার মানুষটিকে কাছে রাখার কতই না উপায়! ফোনের গ্যালারিতে তার হাজার ছবি, ভিডিও কলে যখন-তখন কথা, সোশ্যাল মিডিয়ায় একসাথে ছবি পোস্ট করে ভালোবাসার জাহির। কিন্তু একবার ভাবুন তো, এমন একটা সময়ের কথা যখন স্মার্টফোন ছিল না, সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, আর ভালোবাসা প্রকাশ করাটাও ছিল ভীষণ ঝুঁকির? যখন দুটো মন এক হলেও সমাজের কড়া শাসনে তাদের মিলন ছিল প্রায় অসম্ভব? হ্যাঁ, এমনই এক সময়ের গল্প বলব আজ, যখন প্রেমিক-প্রেমিকারা তাদের ভালোবাসার মানুষটিকে নিজেদের কাছে রাখতেন এক অদ্ভুত কিন্তু ভীষণ রোমান্টিক উপায়ে।
সময়টা ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ। [1] ইংল্যান্ড, ফ্রান্স আর রাশিয়ার অভিজাত সমাজে তখন কঠোর নিয়মকানুন। [1] বিয়ে মানেই ছিল দুটো পরিবারের মধ্যে চুক্তি, সেখানে ভালোবাসার স্থান প্রায় ছিলই না। কিন্তু মন তো আর নিয়ম মেনে চলে না! তাই গোপনে দানা বাঁধত কত প্রেম, কত নিষিদ্ধ সম্পর্ক। এই গোপন ভালোবাসা জাহির করার উপায় ছিল না, আবার প্রিয় মানুষটার স্মৃতিচিহ্ন কাছে না রাখার কষ্টও ছিল অসহ্য। এই সমস্যার এক অদ্ভুত শৈল্পিক সমাধান বের করেছিল তখনকার প্রেমিক-প্রেমিকারা।
অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে ইউরোপের ধনী সমাজে প্রেমিক-প্রেমিকারা একে অপরের একটি মাত্র চোখের মিনিয়েচার ছবি আঁকিয়ে লকেট, আংটি বা ব্রোচের মতো গয়না বানিয়ে পরতেন, যাতে তাদের গোপন ভালোবাসার পরিচয় গোপন থাকে! [3, 4, 5] এই অদ্ভুত গয়নাগুলোর নাম ছিল ‘লাভার’স আই’ বা ‘প্রেমিকের চোখ’।
ভাবুন একবার, কী অসাধারণ আইডিয়া! পুরো মুখ বা চেহারার ছবি আঁকলে তো সবাই চিনে ফেলবে, কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! কিন্তু শুধু একটা চোখ? হাজার মানুষের ভিড়ে শুধু প্রেমিক বা প্রেমিকার পক্ষেই সম্ভব সেই চোখটা চিনে নেওয়া। [3] এটা ছিল তাদের দুজনের একান্ত গোপন সংকেত, সমাজের চোখে ধুলো দিয়ে ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার এক মিষ্টি ষড়যন্ত্র।
এক রাজকীয় প্রেমকাহিনীর শুরু
এই অদ্ভুত ফ্যাশনের পেছনের গল্পটাও বেশ রাজকীয়। বলা হয়, এর শুরু হয়েছিল প্রিন্স অফ ওয়েলস (পরবর্তীতে রাজা চতুর্থ জর্জ) এবং তার প্রেমিকা মারিয়া ফিটজহার্বার্টের হাত ধরে। [2] মারিয়া ছিলেন একজন সাধারণ ঘরের বিধবা এবং ক্যাথলিক, যার সাথে ব্রিটিশ রাজপরিবারের কারও বিয়ে হওয়া ছিল আইনত নিষিদ্ধ। [10] কিন্তু প্রিন্স জর্জ তাকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, তিনি মারিয়াকে নিজের ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে একটি চিঠি পাঠান। [4] সেই চিঠির সাথে ছিল নিজের ডান চোখের একটি মিনিয়েচার পোর্ট্রেট। [6, 8] এই অভিনব উপহার মারিয়ার মন জয় করে নেয় এবং তারা গোপনে বিয়ে করেন। [1, 3] পরে মারিয়াও প্রিন্সকে তার নিজের চোখের একটি ছবি উপহার দেন, যা প্রিন্স সবসময় তার কোটের আড়ালে লুকিয়ে রাখতেন। [1, 10]
এই রাজকীয় প্রেমকাহিনী জানাজানি হওয়ার পরেই অভিজাত মহলে ‘লাভার’স আই’ তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। [1] ১৭৯০ থেকে ১৮২০ সাল পর্যন্ত এই ফ্যাশনটি বেশ প্রচলিত ছিল। [2] প্রত্যেকেই তাদের গোপন ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে প্রিয়জনের চোখের ছবি দেওয়া-নেওয়া করতে শুরু করে। এই ছোট ছোট ছবিগুলো আইভরি বা হাতির দাঁতের ওপর জলরঙ দিয়ে আঁকা হতো এবং সেগুলোকে মুক্তা বা দামী পাথর দিয়ে সাজিয়ে আংটি, ব্রেসলেট, লকেট বা ব্রোচ বানানো হতো। [1, 4] অনেক সময় এই গয়নার পেছনে প্রিয়জনের একগুচ্ছ চুলও লুকিয়ে রাখা থাকত। [1]
চোখের ভাষায় লেখা প্রেমপত্র
এই ‘লাভার’স আই’ শুধু একটি গয়না ছিল না, এটা ছিল একটা আস্ত প্রেমপত্র। যে চোখে হয়তো মিশে থাকতো অপেক্ষা, যে চোখে হয়তো ছিল গভীর ভালোবাসা বা অভিমান। সেই সময়ের শিল্পীরাও ছিলেন অসাধারণ। একরত্তি ক্যানভাসে তারা শুধু একটা চোখই আঁকতেন না, ফুটিয়ে তুলতেন তার ভেতরের সমস্ত অনুভূতি। সেই চোখ দেখে হয়তো প্রেমিকের মনে হতো, তার প্রেমিকা তার দিকেই তাকিয়ে আছে, তাকে পাহারা দিচ্ছে সমস্ত বিপদ থেকে। [8]
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই প্রথাটাকে হয়তো একটু অদ্ভুত বা নাটকীয় মনে হতে পারে। কিন্তু এর পেছনের আবেগটা খাঁটি ছিল। যখন ভালোবাসা প্রকাশ করার আর কোনো উপায় ছিল না, তখন একজোড়া চোখই হয়ে উঠেছিল তাদের entire পৃথিবীর সাক্ষী। এটা ছিল একটা নিঃশব্দ অঙ্গীকার, একটা গোপনสัญญา, যা শুধু দুজন মানুষই বুঝত।
ফটোগ্রাফির আবিষ্কারের পর ধীরে ধীরে এই প্রথা হারিয়ে যায়। [3] কিন্তু ভালোবাসার ইতিহাসে ‘লাভার’স আই’ এক অদ্ভুত সুন্দর জায়গা দখল করে আছে। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভালোবাসা প্রকাশের জন্য সবসময় দামি উপহার বা লোকদেখানো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় শুধু একটু সততা, একটু মমতা আর একে অপরকে যেকোনো পরিস্থিতিতে আঁকড়ে রাখার ইচ্ছা। ঠিক যেমনটা সেই সময়ের প্রেমিক-প্রেমিকারা রাখতেন, তাদের প্রিয়জনের একজোড়া চোখ নিজেদের হৃদয়ের খুব কাছে।