ঘটনার প্রেক্ষাপট
সালটা ১৯০৮। জুন মাসের ৩০ তারিখ। রাশিয়ার সাইবেরিয়ার তুঙ্গুস্কা নদীর তীরবর্তী দুর্গম তাইগা অরণ্যের এক শান্ত, নির্জন সকাল। এখানকার আদিবাসী এভেঙ্কি যাযাবর আর কিছু রুশ শিকারী ছাড়া এই বিশাল প্রান্তরে মানুষের দেখা পাওয়া ভার। সেদিনও সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছিল। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা বেজে ১৭ মিনিট। কিন্তু পরের কয়েক মিনিটের মধ্যে যা ঘটতে চলেছিল, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না মানব ইতিহাস।
এই জনবিরল প্রান্তরের মানুষরা প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার সঙ্গে পরিচিত, কিন্তু সেদিন আকাশে যা দেখা গিয়েছিল, তা ছিল তাদের কল্পনারও অতীত। হঠাৎই উত্তর-পশ্চিম আকাশে উদয় হলো এক তীব্র নীল আলোর ঝলকানি, যা ছিল প্রায় সূর্যের মতোই উজ্জ্বল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, যেন আকাশ চিরে দ্বিতীয় এক সূর্য নেমে আসছে পৃথিবীর দিকে। [5] এক অপার্থিব আতঙ্ক গ্রাস করল গোটা এলাকাকে। তারা জানত না, এক ভয়ঙ্কর মহাজাগতিক বিপর্যয় তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
রহস্যের জাল
সেই আগুনের গোলা মাটি স্পর্শ করার আগেই, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার উপরে এক প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণে ফেটে পড়ে। সেই বিস্ফোরণের শক্তি ছিল হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়ে প্রায় হাজার গুণ বেশি, প্রায় ১৫ মেগাটন টিএনটি-র সমান। মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ২,১৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা ৮ কোটি গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে গাছগুলো বাইরের দিকে এমনভাবে পড়েছিল, যেন কোনও বিশাল অদৃশ্য হাত সেগুলোকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে।
বিস্ফোরণের শব্দ ছিল খুব জোরালো। শত শত কিলোমিটার দূরে বাড়িঘরের জানালার কাচ ভেঙে গিয়েছিল এবং মানুষজন শক ওয়েভের ধাক্কায় ছিটকে পড়েছিল। একজন প্রত্যক্ষদর্শী, এস. সেমেনভ, যিনি বিস্ফোরণস্থল থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে ছিলেন, জানান যে হঠাৎ এক তীব্র উত্তাপের হলকা এসে তার গায়ের জামায় প্রায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল এবং এক অদৃশ্য শক্তি তাকে ছিটকে ফেলে দেয়। ইউরোপ এবং এশিয়ার রাতের আকাশ বেশ কয়েকদিন ধরে এক রহস্যময় আলোয় আলোকিত ছিল, যা ছিল সেই বিস্ফোরণের ফলে বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে ছড়িয়ে পড়া ধূলিকণার প্রভাব।
কিন্তু সবচেয়ে বড় রহস্য ছিল অন্য জায়গায়। এত বড় এক বিস্ফোরণের পরেও, সেখানে কোনও অভিঘাত খাদ বা ইমপ্যাক্ট ক্রেটার (Impact Crater) খুঁজে পাওয়া যায়নি। সাধারণত, কোনও উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে আছড়ে পড়লে একটি বিশাল গর্ত তৈরি হয়। কিন্তু তুঙ্গুস্কার ক্ষেত্রে এমন কিছুই ছিল না। এই ঘটনাই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে তোলে।
ঘটনার পর প্রায় দুই দশক কেটে যায়। রাশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এলাকাটির দুর্গমতার কারণে কোনও বৈজ্ঞানিক অভিযান পাঠানো সম্ভব হয়নি। অবশেষে ১৯২৭ সালে, সোভিয়েত খনিজবিদ লিওনিড কুলিকের নেতৃত্বে প্রথম একটি অভিযান সেই রহস্যময় স্থানে পৌঁছায়। কুলিক নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি একটি বিশাল উল্কাপিণ্ডের অবশেষ খুঁজে পাবেন। কিন্তু তার বদলে তিনি যা দেখেন, তা তাকে অবাক করে দেয়। এক বিশাল এলাকা জুড়ে গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে শুয়ে আছে, কিন্তু কোনও উল্কাপিণ্ডের চিহ্নমাত্র নেই। কুলিক তার বাকি জীবন তুঙ্গুস্কার রহস্য সমাধানে উৎসর্গ করলেও, কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন।
সত্যের উন্মোচন
কুলিকের অভিযানের পর প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা তুঙ্গুস্কার রহস্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। উঠে এসেছে নানা তত্ত্ব। কেউ বলেছেন, এটি ছিল একটি ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল যা পৃথিবীর মধ্যে দিয়ে চলে গিয়েছিল। আবার কারও মতে, এটি ছিল পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে নির্গত প্রাকৃতিক গ্যাসের বিস্ফোরণ। এমনকি ভিনগ্রহের মহাকাশযান বিস্ফোরণের মতো কল্পবিজ্ঞানের তত্ত্বও উঠে এসেছে।
তবে বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটি হলো, তুঙ্গুস্কার ঘটনাটি ছিল একটি গ্রহাণু বা ধূমকেতুর বায়বীয় বিস্ফোরণ (Air Burst)। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রায় ৫০-৬০ মিটার চওড়া একটি পাথুরে গ্রহাণু বা বরফ ও ধূলিকণায় তৈরি ধূমকেতু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে প্রবেশ করে। বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে প্রবল ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট প্রচণ্ড চাপ ও তাপে বস্তুটি মাটি স্পর্শ করার আগেই আকাশে বিস্ফোরিত হয় এবং সম্পূর্ণরূপে বাষ্পীভূত হয়ে যায়। এই তত্ত্বটিই কেন কোনও অভিঘাত খাদ পাওয়া যায়নি এবং কেন বিস্ফোরণের ধ্বংসলীলা এত ব্যাপক ছিল, তার সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দেয়।
তবে একটি প্রশ্ন আজও বিজ্ঞানীদের ভাবায়। যদি কোনও গ্রহাণু বা ধূমকেতুই এই ঘটনার জন্য দায়ী হয়, তবে তার কোনও অবশেষ আজ পর্যন্ত কেন খুঁজে পাওয়া গেল না? [5] আধুনিক গবেষণা এবং মডেলিং তুঙ্গুস্কার বিস্ফোরণের একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরলেও, সেই মহাজাগতিক বস্তুর প্রকৃত পরিচয় আজও এক রহস্যের চাদরে ঢাকা। তুঙ্গুস্কার সেই সকাল হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই মহাবিশ্বে আমরা কতটা ক্ষুদ্র এবং প্রকৃতি তার বুকে কত অজানা বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)