ঘটনার প্রেক্ষাপট
সালটা ১৯৩২। সারা বিশ্বজুড়ে মহামন্দার কালো ছায়া নেমে এসেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ফেরত হাজার হাজার অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যকে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার প্রান্তিক জমিতে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। সরকার তাদের গম চাষে উৎসাহিত করেছিল, কিন্তু প্রতিশ্রুত ভর্তুকি আর দেয়নি। ফলন ভালো হলেও গমের দাম পড়ে যাওয়ায় কৃষকদের মাথায় হাত। ঠিক এমনই এক সংকটময় মুহূর্তে তাদের জীবনে নেমে এল এক নতুন উপদ্রব। প্রায় ২০,০০০ ইমু পাখির এক বিশাল দল খাবারের সন্ধানে হানা দিল তাদের শস্যক্ষেত্রে।
ইমু, অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পাখি। উড়তে না পারা এই বিশাল পাখিগুলো তাদের প্রজনন মৌসুমের পর খাবারের সন্ধানে দেশান্তরিত হয়। কৃষকদের তৈরি করা নতুন শস্যক্ষেত্র আর জলের উৎস তাদের কাছে স্বর্গের মতো মনে হলো। দেখতে নিরীহ হলেও, এই হাজার হাজার পাখির দল যখন ফসলের ক্ষেতে নামত, তখন ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়া আর কিছুই বাকি থাকত না। তারা শুধু ফসলই খেত না, পায়ের তলায় মাড়িয়ে নষ্ট করত এবং বেড়া ভেঙে দিয়ে খরগোশের মতো অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীদের প্রবেশের পথ তৈরি করে দিত। উপায় না দেখে, প্রাক্তন সৈনিক-কৃষকরা সরকারের কাছে সাহায্য চাইলেন। তাদের দাবি ছিল অদ্ভুত—মেশিনগান দিয়ে এই পাখিদের দমন করতে হবে।
রহস্যের জাল
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, স্যার জর্জ পিয়ার্স, প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও, প্রচারের সুযোগ এবং কৃষকদের চাপ উপেক্ষা করতে পারলেন না। তিনি রাজকীয় অস্ট্রেলিয়ান আর্টিলারির মেজর জি.পি.ডব্লিউ. মেরেডিথের নেতৃত্বে একটি ছোট সেনাদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। দলের সাথে ছিল দুটি লুইস মেশিনগান এবং দশ হাজার রাউন্ড গুলি। কাগজের হিসেবে এটি ছিল এক অসম লড়াই। একদিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনী, অন্যদিকে একদল পাখি। ফলাফল কী হতে পারে, তা নিয়ে কারও মনে কোনো সন্দেহ ছিল না।
১৯৩২ সালের ২ নভেম্বর, ‘দ্য গ্রেট এমু ওয়ার’ বা ‘ইমু মহাযুদ্ধ’ শুরু হলো। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র ছিল ধারণার চেয়েও অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। মেজর মেরেডিথ ভেবেছিলেন, পাখিরা এক জায়গায় জড়ো হবে এবং তিনি সহজেই গুলি করে তাদের শেষ করে দেবেন। কিন্তু ইমুরা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের ধূর্ত। গুলির শব্দ শুনলেই তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে যেত এবং ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার বেগে দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে যেত। তাদের আটকানোর জন্য কোনো কার্যকর কৌশলই কাজে আসছিল না।
প্রথম দিনের অভিযানে মাত্র গোটা পঞ্চাশেক ইমু দেখা গিয়েছিল, কিন্তু বন্দুকের পাল্লার বাইরে থাকায় তাদের মারা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়রা চেষ্টা করেছিল পাখিদের ফাঁদে ফেলার, কিন্তু ইমুরা এতটাই চালাক ছিল যে তারা সহজেই সেই ফাঁদ এড়িয়ে যায়। এমনকি একবার প্রায় ১,০০০ পাখির একটি দলকে জলের উৎসের কাছে অ্যামবুশ করেও লাভ হয়নি। মেশিনগানটি কয়েক রাউন্ড গুলি চালানোর পরেই জ্যাম হয়ে যায় এবং পাখিরা সামান্য ক্ষতি স্বীকার করেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মেজর মেরেডিথ তার রিপোর্টে হতাশা প্রকাশ করে লিখেছিলেন, "এই পাখিদের প্রত্যেকে যেন এক একটি ট্যাঙ্ক, যাদের বুলেট ভেদ করতে পারে না।" সেনারা ক্লান্ত, হতাশ এবং ক্রমশ হাসির পাত্রে পরিণত হচ্ছিল।
সত্যের উন্মোচন
কয়েক সপ্তাহের নিষ্ফল চেষ্টার পর, সেনাবাহিনী মাত্র ৯৮৬টি ইমু হত্যা করতে সক্ষম হয়, যদিও এর জন্য খরচ হয়েছিল প্রায় দশ হাজার গুলি। অর্থাৎ, প্রতি পাখি মারতে প্রায় ১০টি বুলেট লেগেছিল! এই অভিযান এতটাই ব্যর্থ হয়েছিল যে, সংবাদমাধ্যম এটিকে নিয়ে ব্যঙ্গ করতে শুরু করে। তীব্র জনমত এবং মিডিয়ার চাপের মুখে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এই অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দেন। সেনাবাহিনী লজ্জাজনকভাবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসে। বিজয়ী হয় ইমু বাহিনী।
এই অদ্ভুত যুদ্ধ প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, প্রকৃতিকে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে জয় করা যায় না। পরবর্তীতে সরকার bounty system বা পুরস্কারের বিনিময়ে ইমু শিকারের প্রথা চালু করে এবং বেড়া দেওয়ার জন্য ভর্তুকি দেয়, যা মেশিনগানের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। আজ ‘দ্য গ্রেট এমু ওয়ার’ অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এক মজাদার অথচ শিক্ষণীয় অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। এটি এক অদ্ভুত প্রহেলিকা, যেখানে মানুষ তার সমস্ত প্রযুক্তি নিয়েও প্রকৃতির এক সাধারণ সৃষ্টির কাছে পরাজিত হয়েছিল। এ যেন এক শিহরণ জাগানো গল্প, যা আমাদের প্রকৃতির শক্তি এবং মানব অহঙ্কারের সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)