ঘটনার প্রেক্ষাপট
ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের শান্ত, মনোরম একটি দ্বীপ বার্বাডোস। কিন্তু এর রোদে ঝলমলে তটের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক গা ছমছমে রহস্য, যা আজও যুক্তি আর বিজ্ঞানের কাছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। গল্পটা ক্রাইস্ট চার্চ প্যারিশের এক কবরস্থানে অবস্থিত একটি পাথরের সমাধিকে ঘিরে, যা ‘চেজ ভল্ট’ নামে পরিচিত। এই ভল্টটি তৈরি হয়েছিল ১৭২৪ সালে, কিন্তু এর কুখ্যাতি শুরু হয় উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে, যখন চেজ পরিবার এর মালিকানা লাভ করে।
পরিবারের কর্তা ছিলেন কর্নেল টমাস চেজ, ঔপনিবেশিক বার্বাডোসের একজন ধনী এবং অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির মানুষ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের মধ্যে তাকে নিয়ে নানা রকম গুঞ্জন ছিল। চেজ পরিবারের আগমনের পরেই এই শান্ত সমাধিটি এক অশুভ ছায়ার নিচে চলে যায়, যা পরবর্তীকালে বার্বাডোসের ইতিহাসে অন্যতম এক অমীমাংসিত অধ্যায় হয়ে ওঠে।
রহস্যের জাল
সবকিছুর শুরু ১৮১২ সালে, যখন কর্নেল চেজের শিশুকন্যা ডোরকাস চেজকে সমাধিস্থ করার জন্য ভল্টটি খোলা হয়। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করে শ্রমিকদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো! এর আগে সমাধিস্থ করা টমাসিনা গডার্ড এবং চেজের আরেক শিশুকন্যা মেরি অ্যানের কফিনগুলো তাদের নির্ধারিত জায়গা থেকে সরে সম্পূর্ণ এলোমেলো অবস্থায় পড়ে ছিল। বিশেষ করে মেরি অ্যানের ভারী সীসার কফিনটি উল্টে ভল্টের অন্য কোণায় দাঁড়িয়ে ছিল। ভল্টের দরজাটি ছিল একটি বিশাল পাথরের স্ল্যাব, যা বেশ কয়েকজন শক্তিশালী লোক ছাড়া সরানো অসম্ভব এবং খোলার আগে সেটি সিমেন্ট দিয়ে সম্পূর্ণ সিল করা ছিল। কোনো লুঠেরা বা দুষ্ট লোকের পক্ষে এমন কাজ করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
পরিবারের লোকেরা আতঙ্কিত হলেও, তারা এটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয়। কফিনগুলোকে আগের মতো সাজিয়ে রেখে ভল্টটি আবার সিল করে দেওয়া হয়। কিন্তু এই ভুতুড়ে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। ১৮১২ সালের আগস্ট মাসে যখন স্বয়ং কর্নেল টমাস চেজকে সমাধিস্থ করার জন্য ভল্ট খোলা হলো, তখন দেখা গেল ভেতরের সব কফিন আবার ভয়াবহভাবে ছড়ানো-ছিটানো। এরপর ১৮১৬ এবং ১৮১৯ সালে আরও দুটি শবদেহ সমাধিস্থ করার সময় একই দৃশ্য দেখা যায়। প্রতিবারই ভারী সীসার কফিনগুলো এমনভাবে ছিটকে পড়ে থাকত, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি সেগুলোকে সজোরে ছুড়ে ফেলেছে।
এই রহস্যময় ঘটনায় পুরো দ্বীপজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি তৎকালীন বার্বাডোসের গভর্নর লর্ড কম্বারমেয়ারের কানে পৌঁছায়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এর তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৮১৯ সালে থমাসিনা ক্লার্কের শবদেহ রাখার সময় গভর্নর নিজে উপস্থিত ছিলেন। কফিনগুলো ঠিকঠাক রাখার পর, তিনি ভল্টের মেঝেতে বালির একটি পাতলা আস্তরণ বিছিয়ে দেন, যাতে কেউ প্রবেশ করলে তার পায়ের ছাপ পড়ে। এরপর নিজের সীলমোহর দিয়ে ভল্টের দরজা বন্ধ করে দেন।
সত্যের উন্মোচন
প্রায় আট মাস পর, ১৮২০ সালের এপ্রিলে, গভর্নর তার সিল অক্ষত আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে ভল্টটি খোলার আদেশ দেন। বাইরে থেকে সবকিছু নিখুঁত ছিল। গভর্নরের সীলমোহর ভাঙা হয়নি, দরজায় কোনো আঁচড়ের দাগও ছিল না। কিন্তু যখন সেই বিশাল পাথরের দরজা সরানো হলো, ভেতরের দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবাই ভয়ে জমে গেল। কফিনগুলো আগের মতোই ভয়ঙ্করভাবে এলোমেলো হয়ে ছিল, কয়েকটি তো দেয়ালের গায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, মেঝের বালিতে একটিও পায়ের ছাপ ছিল না! গভর্নরের সীল অক্ষত ছিল, বালিতে কোনো চিহ্ন ছিল না, তবুও কফিনগুলো নড়ে গিয়েছিল।
এই ঘটনার পর চেজ পরিবার সিদ্ধান্ত নেয় যে তাদের স্বজনরা এই অভিশপ্ত ভল্টে শান্তিতে থাকতে পারবে না। একে একে সব কফিন সেখান থেকে বের করে কবরস্থানের অন্য জায়গায় আলাদাভাবে সমাধিস্থ করা হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত চেজ ভল্ট খালি পড়ে আছে।
এই রহস্যের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আজও মেলেনি। কেউ বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্রোতের কারণে এমনটা হতে পারে, কিন্তু ভল্টে কোনোদিন পানির চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কেউ আবার ভূমিকম্পের তত্ত্ব দেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে কবরস্থানের অন্য কোনো সমাধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি কেন, তার উত্তর মেলে না। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, কর্নেল চেজের নিষ্ঠুরতার কারণে অতৃপ্ত আত্মারা এই ভল্টে বিশ্রাম নিতে দেয়নি। আবার অনেকে মনে করেন, আত্মহত্যা করা ডোরকাস চেজের অতৃপ্ত আত্মাই এর জন্য দায়ী। কারণ যাই হোক না কেন, বার্বাডোসের এই চলমান কফিনের রহস্য আজও এক শিহরণ জাগানো অমীমাংসিত অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)