বিষয়ের ভূমিকা
নমস্কার বন্ধুরা! আজ আমরা দশম শ্রেণির ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করব - 'ভারতে জাতীয়তাবাদ' (Nationalism in India)। এই অধ্যায়টি কেবল পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তি বোঝার জন্যও অপরিহার্য।
'জাতীয়তাবাদ' কথাটির অর্থ কী? সহজ ভাষায়, জাতীয়তাবাদ হল একটি অনুভূতি যা একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সাধারণ লক্ষ্যের ভিত্তিতে একতার ভাবনা তৈরি করে। এটি হল 'আমরা এক' - এই বোধ। ভারতে এই অনুভূতি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারত ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। মানুষ শোষণ, বঞ্চনা এবং পরাধীনতার শৃঙ্খলে বাঁধা ছিল। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এই সময়েই মহাত্মা গান্ধীর ভারতে আগমন ঘটে এবং তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রাম এক নতুন দিকে মোড় নেয়। এই অধ্যায়ে আমরা মূলত ১৯২০ সালের পর থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়, আন্দোলন এবং তার পেছনের কারণগুলো নিয়ে বিস্তারিতভাবে জানব। আমরা দেখব কীভাবে অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে আইন অমান্য আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ এই মহৎ সংগ্রামে নিজেদের যুক্ত করেছিল এবং কীভাবে একটি সম্মিলিত পরিচয়ের জন্ম হয়েছিল। চলুন, এই emocionante যাত্রায় শামিল হওয়া যাক!
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, খিলাফত এবং অসহযোগ আন্দোলন
ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) একটি বিশাল ভূমিকা পালন করেছিল। যদিও যুদ্ধটি হচ্ছিল ইউরোপে, তার প্রভাব এসে পড়েছিল ভারতেও।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি:- অর্থনৈতিক প্রভাব: ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধের বিপুল খরচ মেটানোর জন্য ভারতীয়দের উপর করের বোঝা চাপিয়ে দেয়। আয়কর চালু করা হয় এবং শুল্ক বাড়ানো হয়। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
- সেনাবাহিনীতে জোর করে ভর্তি: গ্রামের যুবকদের জোর করে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হচ্ছিল, যা গ্রামীণ এলাকায় তীব্র অসন্তোষের জন্ম দেয়।
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ: ১৯১৮-১৯ এবং ১৯২০-২১ সালে ভারতের অনেক জায়গায় ফসল নষ্ট হয়ে যায় এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর আকার ধারণ করে। লক্ষ লক্ষ মানুষ দুর্ভিক্ষ ও মহামারীতে মারা যায়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার জনগণের দুর্দশা লাঘব করার জন্য প্রায় কিছুই করেনি।
এই পরিস্থিতিতে মানুষের মনে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। তারা আশা করেছিল, যুদ্ধের পর তাদের কষ্ট লাঘব হবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ঠিক এই সময়েই, ১৯১৫ সালে, মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে আসেন।
সত্যাগ্রহের ধারণা:গান্ধীজি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবিদ্বেষী সরকারের বিরুদ্ধে এক নতুন ধরনের আন্দোলন পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন, যার নাম 'সত্যাগ্রহ'। সত্যাগ্রহ-এর মূল কথা হলো 'সত্যের প্রতি আগ্রহ' বা সত্যের জন্য লড়াই। এটি ছিল অহিংসার উপর ভিত্তি করে একটি আন্দোলন। গান্ধীজির বিশ্বাস ছিল যে, যদি আপনার উদ্দেশ্য মহৎ এবং লড়াইটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে হয়, তাহলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শারীরিক বল প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। অহিংসার মাধ্যমেও প্রতিপক্ষের বিবেককে জাগ্রত করে জয়লাভ করা সম্ভব।
ভারতে আসার পর গান্ধীজি কয়েকটি স্থানীয় স্তরে সত্যাগ্রহ আন্দোলন সফলভাবে পরিচালনা করেন:
- চম্পারণ সত্যাগ্রহ (১৯১৭): বিহারের চম্পারণে নীল চাষীদের উপর ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এটি ছিল তাঁর প্রথম সফল সত্যাগ্রহ।
- খেড়া সত্যাগ্রহ (১৯১৮): গুজরাটের খেড়া জেলায় ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে কৃষকরা খাজনা মকুবের দাবি জানালে গান্ধীজি তাদের সমর্থনে সত্যাগ্রহ করেন।
- আহমেদাবাদ মিল ধর্মঘট (১৯১৮): আহমেদাবাদের কাপড়ের কলের শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে তিনি सत्याग्रह করেন।
এই প্রাথমিক সাফল্যগুলো গান্ধীজিকে একজন জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং सत्याग्रह-কে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
রাওলাট আইন (১৯১৯):ভারতীয়দের মধ্যে বাড়তে থাকা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করার জন্য, ব্রিটিশ সরকার বিচারপতি সিডনি রাওলাটের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯১৯ সালে 'রাওলাট আইন' পাস করা হয়। এই আইন সরকারকে চরম ক্ষমতা প্রদান করে:
- এই আইন অনুসারে, সরকার যেকোনো ভারতীয়কে বিনা বিচারে দুই বছর পর্যন্ত আটকে রাখতে পারত।
- রাজনৈতিক কার্যকলাপ দমনের জন্য পুলিশকে অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
এই কালা কানুনের বিরুদ্ধে সারা ভারতে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। গান্ধীজি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী सत्याग्रह-এর ডাক দেন। ৬ই এপ্রিল হরতাল পালনের দিন ধার্য করা হয়। বিভিন্ন শহরে মিছিল, মিটিং এবং ধর্মঘট শুরু হয়।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (১৯১৯):রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যখন তুঙ্গে, তখন ঘটে যায় ভারতের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ঘটনা। পাঞ্জাবের অমৃতসরে ব্রিটিশ শাসন ছিল অত্যন্ত দমনমূলক। সেখানে দুজন জনপ্রিয় নেতা, ডঃ সত্যপাল এবং ডঃ সইফুদ্দিন কিচলুকে গ্রেপ্তার করা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯, বৈশাখী উৎসবের দিন, অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার জন্য সমবেত হয়েছিলেন। অনেকেই এসেছিলেন বৈশাখী মেলায় যোগ দিতে এবং তারা শহরের বাইরে থেকে আসায় মার্শাল ল' জারির কথা জানতেন না।
সেই সময়, ব্রিটিশ সেনাপতি জেনারেল ডায়ার তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে বাগের একমাত্র প্রবেশ ও প্রস্থানের পথটি আটকে দেন এবং কোনো সতর্কতা ছাড়াই নিরস্ত্র জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। প্রায় দশ মিনিট ধরে গুলি চলে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৩৭৯ জন মারা গেলেও বেসরকারি মতে মৃতের সংখ্যা ছিল হাজারের বেশি।
এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা ভারতে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, সরকারি দফতরে হামলা হয়। এই ঘটনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এতটাই ব্যথিত করেছিল যে তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া 'নাইট' উপাধি ত্যাগ করেন।
খিলাফত এবং অসহযোগ আন্দোলন:জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের পর গান্ধীজি বুঝতে পারেন যে একটি আরও বড় এবং সংগঠিত আন্দোলন প্রয়োজন। তিনি হিন্দু ও মুসলিমদের একত্রিত করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলার কথা ভাবেন। এই সুযোগটি আসে খিলাফত ইস্যুকে কেন্দ্র করে।
- খিলাফত ইস্যু: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানির পক্ষে ছিল এবং পরাজিত হয়। গুজব রটে যে, ব্রিটিশ সরকার তুরস্কের সুলতানের (যিনি সারা বিশ্বের মুসলিমদের খলিফা বা আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন) উপর একটি কঠোর শান্তি চুক্তি চাপিয়ে দেবে। এতে ভারতের মুসলিমরা ক্ষুব্ধ হন। খলিফার সম্মান রক্ষার জন্য ভারতে 'খিলাফত কমিটি' গঠিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মহম্মদ আলি ও শওকত আলি (আলি ভাইয়েরা)।
- হিন্দু-মুসলিম ঐক্য: গান্ধীজি খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এটিকে হিন্দু-মুসলিমদের এক ছাতার তলায় আনার একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখেন। ১৯২০ সালের কলকাতা কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে তিনি অন্য নেতাদের অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাবে রাজি করান।
অসহযোগ আন্দোলন (Non-Cooperation Movement):
গান্ধীজি তাঁর বিখ্যাত বই 'হিন্দ স্বরাজ' (১৯০৯)-এ লিখেছিলেন যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসন টিকে আছে ভারতীয়দের সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে। যদি ভারতীয়রা সহযোগিতা করতে অস্বীকার করে, তবে ব্রিটিশ শাসন এক বছরের মধ্যে ভেঙে পড়বে এবং স্বরাজ আসবে।
এই ধারণা থেকেই অসহযোগ আন্দোলনের জন্ম। আন্দোলনের দুটি দিক ছিল:
- বয়কট (বর্জনীয় দিক):
- সরকারি স্কুল, কলেজ, আদালত বর্জন।
- সরকারি উপাধি ও চাকরি ত্যাগ করা।
- বিদেশি পণ্য, বিশেষ করে বিদেশি কাপড় বর্জন করা।
- সরকারি অনুষ্ঠান বর্জন করা।
- স্বদেশী (গঠনমূলক দিক):
- জাতীয় স্কুল, কলেজ স্থাপন করা।
- গ্রাম্য পঞ্চায়েতের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থা চালানো।
- চরকার মাধ্যমে সুতো কেটে খাদি বস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার করা।
- হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং অস্পৃশ্যতা দূর করা।
আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা:
- শহরে: হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী স্কুল-কলেজ ছেড়ে দেয়, আইনজীবীরা আদালত বর্জন করেন। বিদেশি কাপড়ের দোকানে পিকেটিং করা হয় এবং বিদেশি বস্ত্রের হোলি জ্বালানো হয়। এর ফলে বিদেশি কাপড়ের আমদানি অর্ধেকে নেমে আসে।
- গ্রামে: কৃষকরা তালুকদার এবং জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে, যারা তাদের থেকে প্রচুর খাজনা এবং বেগার শ্রম আদায় করত। অযোধ্যায় বাবা রামচন্দ্রের নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন তীব্র হয়।
- আদিবাসী অঞ্চলে: অন্ধ্রপ্রদেশের গুডেম পাহাড়ে আল্লুরি সীতারাম রাজুর নেতৃত্বে আদিবাসীরা বন আইন এবং বেগার শ্রমের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। রাজু নিজেকে গান্ধীজির অনুগামী বললেও তিনি মনে করতেন, অহিংসার মাধ্যমে নয়, বল প্রয়োগের মাধ্যমেই স্বাধীনতা আসবে।
- চা বাগানে: আসামের চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য স্বরাজের অর্থ ছিল বাগানের চার দেওয়ালের বাইরে বেরিয়ে নিজের গ্রামে ফিরে যাওয়ার স্বাধীনতা। তারা বাগান ছেড়ে চলে যায়, যদিও পথে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এবং অত্যাচারিত হয়।
আন্দোলন প্রত্যাহার:
অসহযোগ আন্দোলন যখন সাফল্যের শিখরে, তখন একটি ঘটনা পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়। ফেব্রুয়ারি, ১৯২২ সালে উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরি চৌরা নামক স্থানে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর পুলিশ গুলি চালালে জনতা উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং থানায় আগুন লাগিয়ে দেয়। এই ঘটনায় ২২ জন পুলিশকর্মী জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান।
এই হিংসাত্মক ঘটনায় গান্ধীজি অত্যন্ত ব্যথিত হন। তিনি মনে করতেন, সত্যাগ্রহীরা এখনও অহিংস গণ-আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত নয়। তাই তিনি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন।
আইন অমান্য আন্দোলনের দিকে
অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের পর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে একটি সাময়িক স্থবিরতা আসে। কংগ্রেসের মধ্যে দুটি গোষ্ঠীর জন্ম হয়। একদল, যেমন সি. আর. দাশ এবং মতিলাল নেহেরু, মনে করতেন যে কাউন্সিলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সরকারি নীতির বিরোধিতা করা উচিত। তারা 'স্বরাজ পার্টি' গঠন করেন। অন্যদিকে, জওহরলাল নেহেরু এবং সুভাষচন্দ্র বসুর মতো তরুণ নেতারা আরও আগ্রাসী গণ-আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন।
এই সময়ে দুটি ঘটনা ভারতের রাজনীতিকে আবার উত্তপ্ত করে তোলে:
- বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা (১৯২৯): এর প্রভাবে কৃষিপণ্যের দাম মারাত্মকভাবে কমে যায়। কৃষকদের আয় কমে গেলেও সরকার খাজনা কমাতে রাজি ছিল না, যা গ্রামীণ এলাকায় তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে।
- সাইমন কমিশন (১৯২৮): ভারতের সাংবিধানিক সংস্কার পর্যালোচনার জন্য ব্রিটিশ সরকার স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে। কিন্তু এই কমিশনের সাতজন সদস্যের সবাই ছিলেন ব্রিটিশ, কোনো ভারতীয় সদস্য ছিলেন না। এটি ভারতীয়দের জন্য একটি চরম অপমান ছিল। তাই যখন সাইমন কমিশন ভারতে আসে, তখন 'সাইমন গো ব্যাক' (Simon Go Back) স্লোগান দিয়ে তাদের কালো পতাকা দেখানো হয় এবং দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়।
সাইমন কমিশনের বিরোধিতার আবহে, ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে লাহোরে জওহরলাল নেহেরুর সভাপতিত্বে কংগ্রেসের ঐতিহাসিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে 'পূর্ণ স্বরাজ' বা সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলা হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ২৬শে জানুয়ারি, ১৯৩০ তারিখটি 'স্বাধীনতা দিবস' হিসেবে পালন করা হবে এবং মানুষ পূর্ণ স্বরাজের জন্য শপথ নেবে।
লবণ সত্যাগ্রহ এবং আইন অমান্য আন্দোলন:গান্ধীজি 'পূর্ণ স্বরাজ'-এর এই বিমূর্ত ধারণাকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে যুক্ত করার জন্য একটি পথ খুঁজছিলেন। তিনি 'লবণ'-কে বেছে নেন। লবণ ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ছিল, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এর উৎপাদন ও বিক্রির উপর একচেটিয়া অধিকার এবং কর আরোপ করেছিল।
গান্ধীজি ভাইসরয় লর্ড আরউইনকে একটি চিঠি লিখে ১১-দফা দাবি জানান, যার মধ্যে লবণ কর বাতিল করার দাবিটিও ছিল। কিন্তু আরউইন সেই দাবি মানতে রাজি হননি।
এর প্রতিক্রিয়ায়, গান্ধীজি তাঁর বিখ্যাত ডান্ডি অভিযান বা লবণ সত্যাগ্রহ শুরু করেন।
- ১২ই মার্চ, ১৯৩০: গান্ধীজি তাঁর ৭৮ জন বিশ্বস্ত অনুগামীকে নিয়ে গুজরাটের সবরমতী আশ্রম থেকে ২৪০ মাইল দূরে অবস্থিত উপকূলীয় শহর ডান্ডির উদ্দেশ্যে পদযাত্রা শুরু করেন।
- ২৪ দিন ধরে যাত্রা করার সময় পথের ধারে হাজার হাজার মানুষ তাঁর বক্তৃতা শুনতে ভিড় জমায়।
- ৬ই এপ্রিল, ১৯৩০: তিনি ডান্ডিতে পৌঁছান এবং সমুদ্রের জল ফুটিয়ে লবণ তৈরি করে ব্রিটিশ আইন ভঙ্গ করেন।
এই ঘটনাটি ছিল আইন অমান্য আন্দোলনের (Civil Disobedience Movement) সূচনা। এই আন্দোলনটি অসহযোগ আন্দোলনের থেকে কিছুটা ভিন্ন ছিল। এবার শুধু সহযোগিতা না করাই নয়, ঔপনিবেশিক আইনগুলিকেও সরাসরি অমান্য করার ডাক দেওয়া হয়েছিল।
- সারা দেশে হাজার হাজার মানুষ লবণ আইন ভঙ্গ করে।
- বিদেশি কাপড় বর্জন করা হয়, মদের দোকানের সামনে পিকেটিং করা হয়।
- কৃষকরা খাজনা এবং চৌকিদারি কর দিতে অস্বীকার করে।
- গ্রামের সরকারি কর্মচারীরা পদত্যাগ করেন।
- অনেক জায়গায় আদিবাসীরা বন আইন অমান্য করে বনে প্রবেশ করে।
সরকার এই আন্দোলনকে কঠোরভাবে দমন করার চেষ্টা করে। আব্দুল গফফর খান (সীমান্ত গান্ধী), জওহরলাল নেহেরু এবং গান্ধীজি সহ প্রায় এক লক্ষ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গান্ধী-আরউইন চুক্তি এবং গোলটেবিল বৈঠক:ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের চাপে, ভাইসরয় আরউইন আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। ৫ই মার্চ, ১৯৩১ সালে গান্ধী-আরউইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির শর্তানুসারে:
- গান্ধীজি আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করতে সম্মত হন।
- তিনি লন্ডনে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে রাজি হন।
- সরকার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে সম্মত হয়।
গান্ধীজি লন্ডনে বৈঠকে যোগ দেন, কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হয় কারণ ব্রিটিশরা ভারতের স্বাধীনতার দাবি মানতে রাজি ছিল না। হতাশ হয়ে ভারতে ফিরে এসে তিনি দেখেন যে, সরকার নতুন করে দমন-পীড়ন শুরু করেছে। ফলে, তিনি পুনরায় আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করেন, কিন্তু ১৯৩৪ সালের মধ্যে আন্দোলন তার গতি হারিয়ে ফেলে।
আন্দোলনে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ
আইন অমান্য আন্দোলনে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী যোগ দিয়েছিল, কিন্তু প্রত্যেকের কাছে 'স্বরাজ'-এর অর্থ ছিল ভিন্ন।
- ধনী কৃষক সম্প্রদায়: গুজরাটের পাতিদার এবং উত্তরপ্রদেশের জাঠদের মতো ধনী কৃষকরা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তাদের আয় কমে গিয়েছিল, কিন্তু সরকার খাজনা কমাতে রাজি ছিল না। তাদের কাছে স্বরাজের লড়াই ছিল উচ্চ খাজনার বিরুদ্ধে লড়াই। কিন্তু ১৯৩১ সালে যখন আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয় এবং খাজনা কমানো হয়নি, তখন তারা হতাশ হয় এবং পুনরায় আন্দোলন শুরু হলে যোগ দিতে অস্বীকার করে।
- দরিদ্র কৃষক: দরিদ্র কৃষকরা কেবল খাজনা কমানো নয়, তারা জমিদারদের কাছে বকেয়া থাকা খাজনা মকুবেরও দাবি জানায়। কংগ্রেস প্রায়শই তাদের 'খাজনা বন্ধ' আন্দোলনকে সমর্থন করত না, কারণ এতে ধনী কৃষক এবং জমিদাররা রুষ্ট হতে পারত। তাই দরিদ্র কৃষক এবং কংগ্রেসের মধ্যে সম্পর্ক অনিশ্চিত ছিল।
- ব্যবসায়ী শ্রেণী: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা প্রচুর মুনাফা অর্জন করেছিলেন এবং তারা তাদের ব্যবসা প্রসারের জন্য ঔপনিবেশিক নীতির অবসান চেয়েছিলেন। তারা বিদেশি পণ্যের আমদানি থেকে সুরক্ষা চেয়েছিলেন। পুরুষোত্তমদাস ঠাকুরদাস এবং জি. ডি. বিড়লার মতো শিল্পপতিরা আন্দোলনকে আর্থিকভাবে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর এবং সমাজতন্ত্রের প্রসারের আশঙ্কায় তারা আন্দোলন থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন।
- শিল্প শ্রমিক শ্রেণী: শিল্প শ্রমিকরা আন্দোলনে খুব বেশি সংখ্যায় যোগ দেয়নি, কারণ শিল্পপতিরা কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ ছিল। তবে কিছু শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, যেমন নাগপুরের শ্রমিকরা। তারা কম মজুরি এবং খারাপ কাজের পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল।
- নারী: গান্ধীজির ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার নারী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। তারা মিছিলে হেঁটেছে, লবণ তৈরি করেছে, বিদেশি কাপড়ের দোকানে পিকেটিং করেছে এবং জেলে গেছে। শহরাঞ্চলে উচ্চবর্ণের পরিবারের নারীরা এবং গ্রামাঞ্চলে ধনী কৃষক পরিবারের নারীরা সক্রিয় ছিল। তবে কংগ্রেসে নারীদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হতো না। গান্ধীজি মনে করতেন, নারীর প্রধান কর্তব্য হল ঘর সামলানো, ভালো মা ও স্ত্রী হওয়া।
আইন অমান্য আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা
এই বিশাল গণ-আন্দোলনের কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। সমাজের সব অংশ সমানভাবে এতে অংশ নেয়নি।
- দলিতদের অংশগ্রহণ: দেশের অস্পৃশ্য বা দলিত সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসের আন্দোলনে যোগ দিতে দ্বিধা বোধ করছিল, কারণ কংগ্রেস উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। গান্ধীজি দলিতদের 'হরিজন' (ঈশ্বরের সন্তান) বলে অভিহিত করেন এবং অস্পৃশ্যতা দূর করার জন্য सत्याग्रह করেন। কিন্তু দলিত নেতারা, বিশেষ করে ডঃ বি. আর. আম্বেদকর, একটি ভিন্ন রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছিলেন। তিনি দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর দাবি করেন, যাতে তারা নিজেদের প্রতিনিধি নিজেরাই নির্বাচন করতে পারে।
- পুনা চুক্তি (১৯৩২): ব্রিটিশ সরকার আম্বেদকরের দাবি মেনে নিলে গান্ধীজি আমরণ অনশনে বসেন। তিনি মনে করতেন, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী সমাজে দলিতদের একীকরণ প্রক্রিয়াকে বাধা দেবে। অবশেষে, আম্বেদকর এবং গান্ধীজির মধ্যে পুনা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে, দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর পরিবর্তে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আইনসভায় আসন সংরক্ষিত করা হয়।
- মুসলিমদের অংশগ্রহণ: অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনের পর থেকে মুসলিমদের একটি বড় অংশ কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে শুরু করে। কংগ্রেসকে ক্রমবর্ধমানভাবে হিন্দু মহাসভার মতো হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনের ঘনিষ্ঠ বলে মনে হতে থাকে। মহম্মদ আলি জিন্নাহর মতো মুসলিম নেতারা মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত আসনের দাবি জানালে কংগ্রেস তা মানতে অস্বীকার করে। এর ফলে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে অবিশ্বাস ও বিভেদ বাড়তে থাকে, যা পরবর্তীতে দেশভাগের পথ প্রশস্ত করে।
জাতীয়তাবাদের অনুভূতি এবং সম্মিলিত পরিচয়ের বিকাশ
স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধুমাত্র ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল না, এটি ছিল একটি জাতি গঠনের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াতেই ভারতীয়দের মধ্যে একটি সম্মিলিত পরিচয়ের অনুভূতি গড়ে ওঠে। এই অনুভূতি তৈরিতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া সাহায্য করেছিল:
- চিত্রকলা ও প্রতীক: 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি এবং ভারতমাতার চিত্র জাতীয়তাবাদের প্রতীকে পরিণত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে 'বন্দেমাতরম' স্তোত্রটি রচনা করেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতমাতার বিখ্যাত চিত্রটি আঁকেন, যেখানে তাঁকে একজন তপস্বিনীর রূপে দেখানো হয়েছে—শান্ত, সমাহিত এবং আধ্যাত্মিক। এই চিত্রটি ভারতীয়দের মধ্যে মাতৃভূমির প্রতি ভক্তির भावना জাগিয়ে তোলে।
- জাতীয় পতাকা: স্বদেশী আন্দোলনের সময় বাংলায় একটি ত্রিবর্ণ পতাকা (লাল, সবুজ, হলুদ) তৈরি করা হয়। পরে গান্ধীজি একটি স্বরাজ পতাকার (সাদা, সবুজ, লাল) নকশা তৈরি করেন, যার কেন্দ্রে একটি চরকা ছিল। এই চরকা স্বনির্ভরতার প্রতীক ছিল। পতাকা হাতে নিয়ে মিছিলে হাঁটা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার প্রতীকে পরিণত হয়।
- ইতিহাসের পুনঃব্যাখ্যা: ব্রিটিশরা ভারতীয়দের একটি অনগ্রসর এবং অসভ্য জাতি হিসেবে চিত্রিত করত, যারা নিজেদের শাসন করতে অক্ষম। এর প্রতিক্রিয়ায়, ভারতীয় ঐতিহাসিকরা ভারতের গৌরবময় অতীতকে yeniden আবিষ্কার করতে শুরু করেন। তারা প্রাচীনকালের শিল্প, স্থাপত্য, বিজ্ঞান, গণিত, ধর্ম এবং সংস্কৃতির মহান ঐতিহ্যকে তুলে ধরেন। এই গৌরবময় অতীত ভারতীয়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং জাতীয় গর্বের भावना জাগিয়ে তোলে।
- লোককথা ও লোকগীতি: জাতীয়তাবাদীরা লোককাহিনী, লোকগীতি এবং কিংবদন্তি সংগ্রহ করতে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নাটেশা শাস্ত্রী (তামিলনাড়ুতে) এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা মনে করতেন যে, এই লোককথাগুলোই একটি জাতির প্রকৃত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। এটি জাতীয় পরিচয়কে পুনরুদ্ধার করতে এবং মানুষের মধ্যে একতার অনুভূতি তৈরি করতে সাহায্য করে।
এই সমস্ত আন্দোলনের এবং সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অঞ্চলের মানুষ একত্রিত হয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠে এবং একটি আধুনিক জাতি হিসেবে ভারতের জন্ম হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: রাওলাট আইন কী ছিল এবং ভারতীয়রা এর বিরোধিতা করেছিল কেন?
উত্তর: রাওলাট আইন ছিল ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পাস করা একটি দমনমূলক আইন। এই আইন অনুসারে, ব্রিটিশ সরকার কোনো ভারতীয়কে বিনা বিচারে দুই বছর পর্যন্ত কারারুদ্ধ করতে পারত। এটি সরকারকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ দমন করার জন্য সীমাহীন ক্ষমতা দেয়। ভারতীয়রা এর বিরোধিতা করেছিল কারণ এটি ছিল একটি 'কালা কানুন' যা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, যেমন বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, কেড়ে নিয়েছিল। এটি ছিল গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী, তাই গান্ধীজির নেতৃত্বে সারা দেশে এর বিরুদ্ধে सत्याग्रह আন্দোলন শুরু হয়।
প্রশ্ন ২: অসহযোগ আন্দোলন এবং আইন অমান্য আন্দোলনের মধ্যে মূল পার্থক্য কী ছিল?
উত্তর: দুটি আন্দোলনই গান্ধীজির নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও তাদের মধ্যে কিছু মূল পার্থক্য ছিল।
- অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-২২): এর মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের সাথে সমস্ত ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে দেওয়া। যেমন—সরকারি চাকরি, স্কুল, কলেজ ও আদালত বর্জন করা এবং বিদেশি পণ্য বর্জন করা। এখানে আইন ভাঙার চেয়ে সহযোগিতা না করার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল।
- আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০-৩৪): এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল আরও এক ধাপ এগিয়ে—কেবল সহযোগিতা না করাই নয়, বরং সক্রিয়ভাবে ঔপনিবেশিক আইন ভঙ্গ করা। যেমন—গান্ধীজির ডান্ডি অভিযানের মাধ্যমে লবণ আইন ভঙ্গ করা। এছাড়া, কৃষকরা খাজনা ও চৌকিদারি কর দিতে অস্বীকার করে এবং আদিবাসীরা বন আইন অমান্য করে। অর্থাৎ, এটি ছিল সরাসরি আইন ভাঙার আন্দোলন।
প্রশ্ন ৩: 'সাইমন কমিশন' কেন বয়কট করা হয়েছিল?
উত্তর: সাইমন কমিশন ১৯২৮ সালে ভারতে এসেছিল ভারতের সাংবিধানিক ব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করতে। কিন্তু ভারতীয়রা এই কমিশনকে তীব্রভাবে বয়কট করেছিল কারণ এর সাতজন সদস্যের সবাই ছিলেন ব্রিটিশ; কোনো ভারতীয় সদস্য ছিলেন না। ভারতীয়দের কাছে এটি ছিল একটি চরম অপমান। তাদের মনে হয়েছিল যে, ব্রিটিশরা ভারতীয়দের নিজেদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার যোগ্য বলে মনে করে না। তাই, যেখানেই কমিশন গিয়েছিল, সেখানেই 'সাইমন গো ব্যাক' স্লোগান এবং কালো পতাকা দেখিয়ে এর বিরোধিতা করা হয়েছিল।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়টি থেকে আমরা ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় সম্পর্কে জানতে পারলাম। আসুন মূল বিষয়গুলো একবার দেখে নিই:
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব: যুদ্ধের ফলে ভারতে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয় এবং ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাব তীব্র হয়।
- গান্ধীজির আগমন ও সত্যাগ্রহ: গান্ধীজি অহিংস सत्याग्रह-এর মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক নতুন পথ দেখান।
- রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালাবাগ: এই দুটি ঘটনা ব্রিটিশ শাসনের দমনমূলক চরিত্রকে প্রকাশ করে এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।
- অসহযোগ আন্দোলন: এটি ছিল গান্ধীজির নেতৃত্বে প্রথম সর্বভারতীয় গণ-আন্দোলন, যেখানে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেয়। চৌরি চৌরা ঘটনার পর এটি প্রত্যাহার করা হয়।
- আইন অমান্য আন্দোলন: পূর্ণ স্বরাজের দাবিতে লবণ সত্যাগ্রহের মাধ্যমে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। এতে সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী অংশ নিলেও প্রত্যেকের লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা ছিল ভিন্ন।
- আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা: দলিত ও মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের আন্দোলনে পূর্ণ অংশগ্রহণ না করা ছিল এর অন্যতম দুর্বলতা, যা পুনা চুক্তি এবং হিন্দু-মুসলিম দূরত্বের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
- সম্মিলিত পরিচয়ের বিকাশ: ভারতমাতার চিত্র, জাতীয় পতাকা, ইতিহাসের পুনঃব্যাখ্যা এবং লোকসংস্কৃতির মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে একতার भावना ও জাতীয় পরিচয় গড়ে ওঠে।
আশা করি, 'ভারতে জাতীয়তাবাদ' অধ্যায়টি তোমরা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছ। এটি আমাদের দেশের ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায় যা আমাদের পূর্বপুরুষদের ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়।