বিষয়ের ভূমিকা

NCERT দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়টি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই অধ্যায়ের শিরোনাম হলো 'ইট, মনিকা এবং অস্থি: হরপ্পা সভ্যতা', যা সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা (Indus Valley Civilization) নামেও সমধিক পরিচিত। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে এক দুর্দান্ত নগরসভ্যতা গড়ে উঠেছিল। এই অধ্যায়ে আমরা জানবো কীভাবে প্রত্নতাত্ত্বিকরা মাটির তচ থেকে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করে একটি উন্নত মানব সমাজকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। মুদ্রণ, ইঁট, সিলমোহর বা মনিকা এবং মানুষের হাড়গোড় বা অস্থি পরীক্ষা করে কীভাবে তৎকালীন মানুষের জীবনযাত্রা নির্ধারণ করা হয়, তা এই অধ্যায়ের মূল আলোচ্য বিষয়। ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই সভ্যতা প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই অধ্যায়ে হরপ্পা সভ্যতার বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। নিচে প্রধান পয়েন্টগুলি সহজ বাংলায় আলোচনা করা হলো:

  • হরপ্পা সভ্যতার আবিষ্কার: বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে দয়ারাম সাহানি এবং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সিন্ধু নদের উপত্যকায় এই প্রাচীন সভ্যতার সন্ধান মেলে। এটি ভারতের প্রাচীনতম নগর সভ্যতা।
  • নগর পরিকল্পনা ও বসতি: হরপ্পা সভ্যতার শহরগুলি সুপরিকল্পিত ছিল। রাস্তাগুলি সমকোণে একে অপরকে ছেদ করতো। বাড়িঘর পোড়ানো ইঁট দিয়ে তৈরি হতো এবং উন্নত নিকাশী ব্যবস্থা (Drainage system) বা ড্রেনেজ সিস্টেম ছিল যা আধুনিককালের থেকেও উন্নত।
  • কৃষি ও অর্থনীতি: গম, যব, তিল এবং ডাল জাতীয় শস্য উৎপাদিত হতো। কাঠের লাঙলের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। কালিবঙ্গান এলাকায় লাঙল দিয়ে জমি চাষের প্রমাণ মিলেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মেসোপটেমিয়ার সাথে যোগাযোগের ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
  • ইট, মনিকা (Beads) এবং সিলমোহর: এই সভ্যতার প্রধান নিদর্শন হলো সুনির্দিষ্ট মাপে তৈরি পোড়ানো ইট। মনিকা বা পুঁতি তৈরির জন্য কার্নেলিয়ান, জ্যাসপার, তামা ও ব্রোঞ্জের মতো উপাদান ব্যবহৃত হতো। ইউনিকর্ন সহ বিভিন্ন প্রাণীর চিত্র সম্বলিত সিলমোহর বা মোহর ছিল বাণিজ্যের প্রতীক।
  • সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য: প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজের ফলে প্রাপ্ত কবর ও বস্তুর মান থেকে প্রতীয়মান হয় যে সমাজে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য ছিল। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শাসকদের বা অভিজাতদের আলাদা বাসস্থান ছিল।
  • সভ্যতার পতন: আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ অব্দের মধ্যে এই সভ্যতার পতন শুরু হয়। জলবায়ুর পরিবর্তন, বন্যা, সিন্ধু নদের গতিপথ পরিবর্তন বা আর্যদের আক্রমণ ইত্যাদিকে পতনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

হরপ্পা সভ্যতা সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:

প্রশ্ন ১: হরপ্পা সভ্যতার প্রধান নগরগুলির নাম কী?

উত্তর: হরপ্পা সভ্যতার প্রধান নগরগুলির মধ্যে হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, চানহুদাড়ো, কালিবঙ্গান, লোথাল এবং বনওয়ালি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রশ্ন ২: হরপ্পা সভ্যতার নিকাশী ব্যবস্থার বিশেষত্ব কী ছিল?

উত্তর: হরপ্পা সভ্যতার প্রতিটি বাড়ির জল নর্দমার মাধ্যমে রাস্তার প্রধান ড্রেনের সাথে যুক্ত থাকত। ড্রগুলি ঢাকা থাকত এবং পরিষ্কার করার জন্য ম্যানহোল বা চেম্বার ছিল, যা উন্নত জনস্বাস্থ্য সচেতনতার পরিচায়ক।

প্রশ্ন ৩: সিলমোহরগুলি কী কাজে ব্যবহৃত হতো?

উত্তর: সিলমোহর বা সিলগুলি মূলত বাণিজ্যিক লেনদেন ও পণ্য পরিবহনের সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হতো। ব্যাগে বা বাক্সে মোম বা ভেজা মাটির ওপর সিলমোহর ছাপ মেরে সিল করা হতো যাতে তা সুরক্ষিত থাকে।

সারসংক্ষেপ

  • হরপ্পা সভ্যতা ভারতের প্রাচীনতম নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা।
  • সুপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, বাড়ি এবং নিকাশী ব্যবস্থা এই সভ্যতার অনন্য বৈশিষ্ট্য।
  • ইট, মনিকা, তামা এবং সিলমোহর প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে ইতিহাসের প্রধান উপাদান।
  • মেসোপটেমিয়ার সাথে এই সভ্যতার বৈদেশিক বাণিজ্যের সুদৃঢ় প্রমাণ মেলে।
  • জলবায়ু পরিবর্তন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ অব্দ নাগাদ এই সভ্যতার পতন ঘটে।