বিষয়ের ভূমিকা
দ্বাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি অংশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলো 'দ্বিমেরুবাদের অবসান' (The End of Bipolarity)। এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব কীভাবে মহাশক্তিধর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কী ধরনের গভীর পরিবর্তন সাধিত হলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্ব রাজনীতি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন—এই দুই মহাশক্তির মেরুতে বিভক্ত ছিল। এই অবস্থাকেই দ্বিমেরুবাদ বলা হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে এই দ্বিমেরুবাদের অবসান ঘটে এবং বিশ্ব রাজনীতি একমেরুকরণের দিকে মোড় নেয়। আজকের এই বিস্তারিত আলোচনায় আমরা এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পেছনের কারণ, প্রক্রিয়া এবং ফলাফলগুলো খুব সহজ বাংলায় বোঝার চেষ্টা করব। ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং সাধারণ জ্ঞানের প্রসারের জন্য এই অধ্যায়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন কোনো একদিনে ঘটেনি। এর পেছনে দীর্ঘকালীন অর্থনৈতিক স্থবিরতা, রাজনৈতিক অনমনীয়তা এবং সামাজিক অসন্তোষ কাজ করেছিল। নিচে প্রধান ধারণাগুলি পয়েন্ট আকারে আলোচনা করা হলো:
- সোভিয়েত ব্যবস্থা কী ছিল?: ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর সোশ্যালিস্ট ব্লক বা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ওপর ভিত্তি করে 'ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশালিষ্ট রিপাবলিকস' বা ইউএসএসআর (USSR) গঠিত হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রই সমস্ত সম্পত্তির মালিক ছিল এবং অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে সরকারের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে এই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়।
- গর্ভাচেভ ও সংস্কার নীতি (Glasnost and Perestroika): আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে মিখাইল গর্ভাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। তিনি দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক করতে দুটি বিখ্যাত সংস্কার নীতি চালু করেন—'গ্লাসনস্ত' (খোলাখুলি বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা) এবং 'পরেস্ত্রোইকা' (অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন)। তবে তার এই সংস্কার নীতিগুলি হিতে বিপরীত হয়। সাধারণ মানুষ আরও বেশি স্বাধীনতার দাবি তোলে এবং কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়।
- সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মূল কারণসমূহ:
- অর্থনৈতিক সংকট: আমেরিকার সাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় টিকতে গিয়ে সোভিয়েত অর্থনীতি দারুণভাবে ভেঙে পড়েছিল। ভোগ্যপণ্যের তীব্র ঘাটতি দেখা দেয় এবং সাধারণ মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হতো।
- আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি: কমিউনিস্ট পার্টির আমলাদের অদক্ষতা, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার অভাব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল।
- জাতীয়তাবাদের উত্থান: সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন প্রজাতন্ত্র যেমন রাশিয়া, ইউক্রেন, বাল্টিক রাষ্ট্রগুলিতে স্বাধীনতার দাবি তীব্র আকার ধারণ করে।
- শক থেরাপি (Shock Therapy): সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া ও অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলিকে সমাজতন্ত্র থেকে সম্পূর্ণ পুঁজিবাদী বা মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করতে হয়। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) পরামর্শে এই রূপান্তরের যে নীতি নেওয়া হয়, তাকেই 'শক থেরাপি' বলা হয়। এর ফলে এই দেশগুলির অর্থনীতি সাময়িক ধ্বংসের মুখে পড়েছিল, যা ইতিহাসে 'সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়' হিসেবে পরিচিত।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রধান কারণ কী ছিল?
উত্তর: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রধান কারণগুলির মধ্যে ছিল তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, কমিউনিস্ট পার্টির আমলাতান্ত্রিক শাসন ও দুর্নীতি, প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে পড়া এবং বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের মধ্যে তীব্র জাতীয়তাবাদী অসন্তোষ। মিখাইল গর্ভাচেভের সংস্কার নীতিও এই পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
প্রশ্ন ২: 'শক থেরাপি' বলতে কী বোঝো?
উত্তর: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি যখন এক ঝটকায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন অর্থনীতি থেকে মুক্তবাজার বা পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করে, তখন তাকে 'শক থেরাপি' বলা হয়। এটি অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার বদলে বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছিল।
প্রশ্ন ৩: বার্লিন প্রাচীরের পতন কবে ঘটে এবং এর গুরুত্ব কী?
উত্তর: ১৯৮৯ সালের নভেম্বর মাসে বার্লিন প্রাচীরের পতন ঘটে। এটি ছিল ঠান্ডা লড়াই এবং পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত প্রভাবের পতনের সবচেয়ে বড় প্রতীক। এর মাধ্যমে জার্মানির একত্রীকরণ নিশ্চিত হয়।
সারসংক্ষেপ
- ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক ভাঙনের মধ্য দিয়ে দ্বিমেরুবাদের অবসান ঘটে।
- মিখাইল গর্ভাচেভের 'গ্লাসনস্ত' ও 'পরেস্ত্রোইকা' সংস্কার নীতি সোভিয়েত পতনে অনুঘটকের কাজ করেছিল।
- সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য 'শক থেরাপি' প্রয়োগ করা হয়েছিল যা সাময়িকভাবে ক্ষতিকর ছিল।
- এর ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বা একমেরুবাদের সূচনা হয়।