বিষয়ের ভূমিকা

বিজ্ঞান পাঠের অন্যতম একটি কৌতূহলী ও মৌলিক অধ্যায় হলো নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের একাদশ অধ্যায় অর্থাৎ 'মহাকর্ষ' (Gravitation)। আমরা প্রতিদিন আমাদের চারপাশে লক্ষ্য করি যে কোনো বস্তু উপর থেকে নিচে ফেলে দিলে তা মাটিতে এসে পড়ে। গাছ থেকে আম মাটিতে পড়ে, বল ওপরের দিকে ছুড়লে তা আবার ফিরে আসে। কেন এমন ঘটে? আমাদের পৃথিবী এবং এই ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করছে। এই আকর্ষণ বলের ধারণাই হলো মহাকর্ষ। মহাকর্ষ ও অভিকর্ষের এই ধারণার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক বিরাট বিজ্ঞান। এই অধ্যায়ে আমরা নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র, অভিকর্ষজ ত্বরণ ($g$), ভর ও ওজনের পার্থক্য এবং আর্কিমিডিসের সূত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অত্যন্ত সহজ ও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

মহাকর্ষ অধ্যায়ের মূল বিষয়বস্তুগুলিকে ভালোভাবে বুঝতে হলে আমাদের একে একে প্রতিটি বৈজ্ঞানিক ধারণার গভীরে প্রবেশ করতে হবে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. মহাকর্ষ এবং অভিকর্ষের ধারণা

মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তু কণা একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। বস্তুত, এই আকর্ষণ বলকে মহাকর্ষ (Gravitation) বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যকার আকর্ষণ বল। অন্যদিকে, যখন এই মহাকর্ষ বল কোনো গ্রহ (যেমন পৃথিবী) এবং তার ওপর বা কাছাকাছি থাকা কোনো বস্তুর মধ্যে ক্রিয়া করে, তখন তাকে বিশেষভাবে অভিকর্ষ (Gravity) বলা হয়। যেমন পৃথিবী আমাদের আকর্ষণ করে নিজের কেন্দ্রের দিকে।

২. নিউটনের সর্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র (Newton's Universal Law of Gravitation)

বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুর মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বল ব্যাখ্যার জন্য একটি বিখ্যাত সূত্র প্রদান করেন, যা সর্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র নামে পরিচিত। এই সূত্রানুসারে:

  • মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু কণা একে অপরকে একটি নির্দিষ্ট বল দ্বারা আকর্ষণ করে।
  • এই আকর্ষণ বল বস্তুদ্বয়ের ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
  • এই বল বস্তুদ্বয়কে সংযোগকারী সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করে।

গণিতীয়ভাবে যদি দুটি বস্তুর ভর যথাক্রমে $m_1$ এবং $m_2$ হয় এবং তাদের মধ্যকার দূরত্ব $d$ হয়, তবে তাদের মধ্যে ক্রিয়াশীল মহাকর্ষ বল $F$ হবে:

$F = \frac{G m_1 m_2}{d^2}$

এখানে $G$-কে সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (Universal Gravitational Constant) বলা হয়। এসআই (SI) এককে $G$-এর মান হলো $6.673 \times 10^{-11} \text{ N m}^2 \text{ kg}^{-2}$। এই সূত্রের 'সর্বজনীন' নামের অর্থ হলো এই সূত্র পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, মহাশূন্যে এবং যেকোনো দুটি বস্তুর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য।

৩. মুক্ত পতন (Free Fall) এবং অভিকর্ষজ ত্বরণ ($g$)

যখন কোনো বস্তু শুধুমাত্র পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের প্রভাবে ওপর থেকে নিচে পড়ে, তখন সেই পতনকে মুক্ত পতন (Free Fall) বলা হয়। মুক্ত পতনের সময় বস্তুর যে ত্বরণ সৃষ্টি হয় তাকে অভিকর্ষজ ত্বরণ বলা হয় এবং একে '$g$' দ্বারা প্রকাশ করা হয়। পৃথিবীর পৃষ্ঠে $g$-এর আদর্শ মান প্রায় $9.8 \text{ m/s}^2$। এর অর্থ হলো, মুক্তভাবে পতনশীল কোনো বস্তুর বেগ প্রতি সেকেন্ডে $9.8 \text{ m/s}$ হারে বৃদ্ধি পায়।

অভিকর্ষজ ত্বরণ $g$ এবং মহাকর্ষীয় ধ্রুবক $G$-এর মধ্যে সম্পর্কটি হলো:

$g = \frac{G M}{R^2}$

এখানে $M$ হলো পৃথিবীর ভর এবং $R$ হলো পৃথিবীর ব্যাসার্ধ। লক্ষ করুন, এই সমীকরণে মুক্ত পতনশীল বস্তুর নিজস্ব ভর ($m$) অনুপস্থিত, যার অর্থ হলো একটি ভারী পাথর এবং একটি হালকা কাগজের টুকরো যদি বায়ুশূন্য স্থানে একসঙ্গে ফেলা হয়, তবে তারা একই সঙ্গে মাটিতে পড়বে।

৪. ভর (Mass) এবং ওজন (Weight)-এর পার্থক্য

দৈনন্দিন জীবনে আমরা ভর এবং ওজন শব্দ দুটিকে একই অর্থে ব্যবহার করলেও পদার্থবিজ্ঞানে এদের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে:

  • ভর (Mass): কোনো বস্তুতে উপস্থিত পদার্থের মোট পরিমাণকে সেই বস্তুর ভর বলে। ভর একটি ধ্রুব রাশি এবং এটি স্থানভেদে পরিবর্তিত হয় না। ভরের এসআই একক হলো কিলোগ্রাম (kg)।
  • ওজন (Weight): যে বল দ্বারা পৃথিবী কোনো বস্তুকে নিজের কেন্দ্রের দিকে টানে, তাকে ওই বস্তুর ওজন বলে। ওজন হলো একটি বল ($W = mg$)। যেহেতু স্থানভেদে অভিকর্ষজ ত্বরণ ($g$)-এর মান পরিবর্তিত হয়, তাই ওজনও স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়। যেমন চাঁদে অভিকর্ষ বল পৃথিবীর ছয় ভাগের এক ভাগ, তাই চাঁদে কোনো বস্তুর ওজন পৃথিবীর ওজনের ছয় ভাগের এক ভাগ হবে।

৫. প্লবতা এবং আর্কিমিডিসের সূত্র

তরল বা গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে কোনো বস্তুকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ডোবালে তরল বা গ্যাস দ্বারা বস্তুর ওপর ওপরের দিকে একটি ঊর্ধ্বমুখী বল প্রয়োগ করা হয়। এই বলকে প্লবতা (Buoyancy) বলে। গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস এই বিষয়ে একটি যুগান্তকারী সূত্র আবিষ্কার করেন:

"যখন কোনো বস্তুকে স্থির তরলে বা গ্যাসে আংশিক বা সম্পূর্ণ ডোবানো হয়, তখন বস্তুটি কিছু পরিমাণ ওজন হারায় বলে মনে হয়। এই হারানো ওজন বস্তুটি দ্বারা অপসারিত তরল বা গ্যাসের ওজনের সমান হয়।"

এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই বিশাল আকারের স্টিমার বা জাহাজ জলের ওপর সহজে ভেসে থাকে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

ছাত্র-ছাত্রীদের সুবিধার্থে এই অধ্যায় থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর নিচে আলোচনা করা হলো:

প্রশ্ন ১: সার্বজনীন মহাকর্ষ ধ্রুবক ($G$)-কে কেন সার্বজনীন বলা হয়?

উত্তর: সার্বজনীন মহাকর্ষ ধ্রুবক ($G$)-এর মান বস্তুদ্বয়ের ভর, তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব, তাদের প্রকৃতি কিংবা পরীক্ষা করার মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে না। মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানে এবং যেকোনো দুটি বস্তুর ক্ষেত্রে এর মান সর্বদা ধ্রুব থাকে। এই কারণে $G$-কে সার্বজনীন মহাকর্ষ ধ্রুবক বলা হয়।

প্রশ্ন ২: মহাশূন্যে নভোচারীদের ওজনহীনতা অনুভূত হয় কেন?

উত্তর: মহাশূন্যে কৃত্রিম উপগ্রহ বা মহাকাশযান যখন পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, তখন তা মুক্ত পতনের অবস্থায় থাকে। মহাকাশযানের ভেতরে থাকা নভোচারীরাও একই ত্বরণে পড়তে থাকেন। ফলে মহাকাশযানের মেঝে দ্বারা তাদের ওপর কোনো প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োগ হয় না। এই কারণে নভোচারীরা ওজনহীনতা অনুভব করেন।

প্রশ্ন ৩: একটি লোহার পেরেক জলে ডুবে যায় কিন্তু বিশাল লোহার জাহাজ ভেসে থাকে কেন?

উত্তর: একটি লোহার পেরেকের আয়তনের তুলনায় তার ওজন বেশি এবং তা যে পরিমাণ জল অপসরণ করে তার ওজন পেরেকের নিজের ওজনের চেয়ে কম, তাই তা ডুবে যায়। অন্যদিকে, জাহাজের গঠন এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে তা নিজের ওজনের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ জল অপসরণ করতে পারে। ফলে অপসারিত জলের প্লবতা বল জাহাজটিকে ওপরের দিকে ধরে রাখে এবং এটি ভেসে থাকে।

সারসংক্ষেপ

  • মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে, যাকে মহাকর্ষ বলে।
  • নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী আকর্ষণ বল ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
  • অভিকর্ষজ ত্বরণ ($g$)-এর মান পৃথিবীর পৃষ্ঠে প্রায় $9.8 \text{ m/s}^2$।
  • ভর একটি ধ্রুব রাশি হলেও ওজন স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়।
  • আর্কিমিডিসের সূত্র প্লবতা এবং বস্তুর ভাসা বা ডোবার শর্ত ব্যাখ্যা করে।