বিষয়ের ভূমিকা

NCERT দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাসের চতুর্থ অধ্যায় 'চিন্তাবিদ, বিশ্বাস এবং বিল্ডিং' (Thinkers, Beliefs and Buildings) প্রাচীন ভারতের সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যভাগ থেকে খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যে প্রাচীন ভারতে ধর্মীয় চিন্তাধারা, দর্শন এবং স্থাপত্যের ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটেছিল, তা এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সময়ে বেদ ও উপনিষদের ঐতিহ্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বহু নতুন চিন্তাধারার জন্ম হয়, যার মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম এবং জৈন ধর্ম অন্যতম। একই সাথে স্তূপ, মন্দির এবং বিভিন্ন স্থাপত্যকলার বিকাশ ঘটে যা তৎকালীন সমাজের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির পরিচয়বাহী।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. নতুন প্রশ্ন ও চিন্তার উত্থান

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দকে পৃথিবীর ইতিহাসের একটি টার্নিং পয়েন্ট বলা চলে। এই সময়ে গঙ্গার উপত্যকায় নতুন শহর ও রাজ্যের বিকাশ ঘটে। সাধারণ মানুষ জীবনের অর্থ এবং মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। তক্ষশীলা ও বারানসীর মতো শহরে দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয় যে জীবন ও মৃত্যুর প্রকৃত সত্য কী। মহাবীর এবং গৌতম বুদ্ধ এই সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তাবিদ হিসেবে আবির্ভূত হন।

২. বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান ও বিস্তার

গৌতম বুদ্ধ (সিদ্ধার্থ) মানব জীবনের দুঃখের কারণ এবং তা থেকে মুক্তির উপায় অনুসন্ধান করেন। বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি ছিল 'চারটি আর্য সত্য' এবং 'অষ্টাঙ্গিক মার্গ'। বুদ্ধ বিশ্বাস করতেন যে অতিরিক্ত ভোগবিলাসমূলক জীবন বা অত্যন্ত কঠোর তপস্যা—কোনোটিই কাম্য নয়, বরং 'মধ্যম পন্থা' অবলম্বন করা উচিত। বুদ্ধের বাণী প্রাকৃত ভাষায় (সাধারণ মানুষের ভাষা) প্রচার করার কারণে তা দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়। বৌদ্ধ সঙ্ঘের মাধ্যমে নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সবাই ভিক্ষু বা ভিক্ষুণী হিসেবে যোগদানের সুযোগ পেত।

৩. জৈন ধর্মের আদর্শ

জৈন ধর্মের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন মহাবীর বর্ধমান। জৈন দর্শন অনুসারে এই জগতের প্রতিটি বস্তু, এমনকি পাথর বা জলেরও প্রাণ আছে। অহিংসা জৈন ধর্মের প্রধান মূলমন্ত্র। জৈন ধর্মে কঠোর তপস্যা এবং সংযমের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হতো। কর্মফল থেকে মুক্তি পেতে এবং আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটাতে ত্রি রত্ন (সঠিক বিশ্বাস, সঠিক জ্ঞান এবং সঠিক আচরণ) অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে।

৪. স্তূপ ও স্থাপত্যের বিকাশ

বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রসারের সাথে সাথে স্থাপত্য শিল্পেও বিপ্লব ঘটে। বুদ্ধের অবশেষ বা পবিত্র স্মারক যেখানে রাখা হতো, তাকে বলা হতো 'স্তূপ'। মধ্যপ্রদেশের সাঁচী স্তূপ এবং ভরত স্তূপ এর দুর্দান্ত উদাহরণ। স্তূপগুলির চারপাশে বেদি, তোরণ এবং প্রদক্ষিণ পথ থাকত যা অত্যন্ত সুন্দর ভাস্কর্যে খোদাই করা হতো। স্তূপের গায়ে তৎকালীন সমাজের মানুষের জীবনযাত্রা, জাতক কথাসমূহ এবং প্রকৃতির রূপ ফুটিয়ে তোলা হতো।

৫. পৌরাণিক হিন্দুধর্ম ও মন্দিরের উদ্ভব

এই যুগেই বৈষ্ণব ও শৈব ধর্মের মতো পৌরাণিক ধর্মের বিকাশ ঘটে। বিষ্ণু এবং শিবের বিভিন্ন অবতার বা রূপের পূজা শুরু হয়। সাধারণ মানুষের ভক্তি ও উপাসনার কেন্দ্র হিসেবে মন্দির তৈরি হতে শুরু করে। প্রথম দিকে মন্দিরগুলি ছোট হলেও, ধীরে ধীরে গহ্বর, গর্ভগৃহ, মণ্ডপ এবং শিখরযুক্ত বিশাল বিশাল পাথরের মন্দির নির্মিত হতে শুরু করে, যেমন দেওগড়ের দশা অবতার মন্দির।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

  • প্রশ্ন ১: বৌদ্ধ ধর্মের চারটি আর্য সত্য কী কী?উত্তর: বৌদ্ধ ধর্মের চারটি আর্য সত্য হলো—১. জীবন দুঃখময়, ২. দুঃখের একটি কারণ আছে (তৃষ্ণা বা বাসনা), ৩. দুঃখ নিবারণ সম্ভব, এবং ৪. দুঃখ নিবারণের মার্গ বা পথ রয়েছে (অষ্টাঙ্গিক মার্গ)।
  • প্রশ্ন ২: সাঁচী স্তূপ কোথায় অবস্থিত এবং এটি কার দ্বারা প্রভাবিত?উত্তর: সাঁচী স্তূপ মধ্যপ্রদেশের ভোপালের কাছে অবস্থিত। এটি মৌর্য সম্রাট অশোকের সময় নির্মিত হতে শুরু করে এবং পরবর্তীতে শুঙ্গ ও সাতবাহন রাজাদের সময়ে এর সংস্কার ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়।
  • প্রশ্ন ৩: জৈন ধর্মে অহিংসার গুরুত্ব কতখানি?উত্তর: জৈন ধর্মে অহিংসাকে সর্বোচ্চ ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। কোনো জীবকে মনে, বাক্যে বা কর্মে আঘাত না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই ধর্মে।
  • প্রশ্ন ৪: জাতক কথা কী?উত্তর: জাতক হলো বৌদ্ধ ধর্মের পালি ভাষায় রচিত কিছু লোককথা, যেগুলিতে বুদ্ধের আগের জন্মগুলির বিভিন্ন নৈতিক গল্প ও শিক্ষা বর্ণিত রয়েছে।

সারসংক্ষেপ

দ্বাদশ শ্রেণি ইতিহাসের চতুর্থ অধ্যায় আমাদের প্রাচীন ভারতের সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত করে। বুদ্ধ এবং মহাবীরের শিক্ষা সমাজকে কুসংস্কার মুক্ত করতে সাহায্য করেছিল এবং সমতার বার্তা দিয়েছিল। অন্যদিকে, স্তূপ এবং প্রাচীন মন্দিরগুলি আমাদের স্থাপত্য শিল্পের উৎকর্ষ এবং সেকালের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের ইতিহাস সগৌরবে বহন করে চলেছে। এই সমস্ত তথ্যগুলি ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতিকে বুঝতে অত্যন্ত সহায়ক।