বিষয়ের ভূমিকা

পুষ্টি হলো জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সমস্ত জীবন্ত প্রাণীকে বেঁচে থাকার জন্য এবং তাদের দৈহিক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য শক্তির প্রয়োজন হয়। এই শক্তি এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলি আমরা খাদ্য থেকে গ্রহণ করি। উদ্ভিদ যেমন নিজেদের খাদ্য নিজেরা প্রস্তুত করতে পারে (স্বভোজী), তেমনি প্রাণী নিজেদের খাদ্য নিজেরা তৈরি করতে পারে না এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল (পরভোজী)। সপ্তম শ্রেণি বিজ্ঞান বিষয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে প্রাণীরা তাদের খাদ্য গ্রহণ করে এবং দেহের ভেতরে সেই খাদ্য কীভাবে প্রক্রিয়াজাত বা পরিপাক হয়। এই অধ্যায়টি আমাদের মানব শরীর এবং অন্যান্য প্রাণীদের পুষ্টিপদ্ধতি বুঝতে সাহায্য করে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

প্রাণীদের পুষ্টি প্রক্রিয়ার মধ্যে মূলত খাদ্য গ্রহণের বিভিন্ন পদ্ধতি এবং মানবদেহের জটিল পরিপাক তন্ত্রের কার্যকারিতা অন্তর্ভুক্ত। নিচে এই ধারণাগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. খাদ্য গ্রহণের বিভিন্ন পদ্ধতি

বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্যের ধরণ এবং খাদ্য গ্রহণের পদ্ধতি আলাদা হয়। যেমন:

  • মৌমাছি এবং হামিংবার্ড: এরা ফুলের মধু বা মকরন্দ চুষে খায়।
  • সাপ (যেমন অজগর): এরা তাদের শিকারকে গিলে খায়।
  • জলজ প্রাণী: এরা জলের ভাসমান সূক্ষ্ম কণা ফিল্টার করে খাদ্য গ্রহণ করে।
  • শামুক ও পিঁপড়ে: এরা খাদ্য চিবিয়ে বা কেটে খায়।

২. মানবদেহের পরিপাক তন্ত্র

মানবদেহের পরিপাক প্রক্রিয়া একটি দীর্ঘ নালী বা পরিপাক নালীর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা মুখগহ্বর থেকে শুরু করে মলদ্বারে গিয়ে শেষ হয়। এই নালীটিকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করা হয়েছে:

  • মুখগহ্বর (Buccal Cavity): খাদ্য প্রথমে মুখগহ্বরে প্রবেশ করে। এখানে দাঁত দিয়ে খাদ্য চিবিয়ে ছোট ছোট টুকরো করা হয়। লালারস বা স্যালিভা খাদ্যের সাথে মিশে শর্করাকে সরল চিনিতে পরিণত করে।
  • খাদ্যনালী বা গ্রাসনালী (Esophagus): চিবানো খাদ্য গ্রাসনালীর মাধ্যমে পাকস্থলীতে পৌঁছায়। গ্রাসনালীর সঞ্চালনের ফলে খাদ্য নিচের দিকে নামে।
  • পাকস্থলী (Stomach): পাকস্থলী একটি থলি আকৃতির অঙ্গ। এর দেওয়াল থেকে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড এবং পরিপাক রস নিঃসৃত হয়, যা খাদ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে এবং প্রোটিন ভাঙতে সাহায্য করে।
  • ক্ষুদ্রান্ত্র (Small Intestine): এটি অত্যন্ত কুন্ডলী পাকানো দীর্ঘ নল। এখানে যকৃত (Liver) থেকে পিত্তরস এবং অগ্ন্যাশয় (Pancreas) থেকে অগ্ন্যাশয় রস এসে মেশে। ক্ষুদ্রান্ত্রই হলো প্রধান স্থান যেখানে খাদ্য সম্পূর্ণ পরিপাক হয় এবং শোষিত হয়।
  • বৃহদান্ত্র (Large Intestine): পরিপাক না হওয়া অংশটি বৃহদান্ত্রে আসে, যেখানে জল ও প্রয়োজনীয় খনিজ শোষিত হয় এবং অবশিষ্ট অংশ মলরূপে দেহ থেকে বেরিয়ে যায়।

৩. ঘাস খাওয়া প্রাণীদের পরিপাক (রুমিনেন্ট বা রোমন্থক প্রাণী)

গরু, ছাগল ও অন্যান্য ঘাস খাওয়া প্রাণীরা দ্রুত ঘাস গিলে রুুমেন বা পাকস্থলীর একটি বিশেষ অংশে জমা করে। পরে সেই অর্ধপাচ্য খাদ্য মুখে ফিরিয়ে এনে আবার চিবায়, যাকে রোমন্থন বা জাবনা কাটা বলে। এ কারণে এদের রুমিনেন্ট বলা হয়। এদের খাদ্যে প্রচুর সেলুলোজ থাকে, যা বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে পাচিত হয়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: লালারসের কাজ কী?

উত্তর: লালারসে উপস্থিত অ্যামাইলেজ বা টায়ালিন নামক এনজাইম খাদ্যে উপস্থিত জটিল শর্করাকে সরল শর্করায় পরিণত করে। এছাড়া লালা খাদ্যকে পিচ্ছিল করে গিলতে সাহায্য করে।

প্রশ্ন ২: যকৃত আমাদের শরীরের কোন কাজে সাহায্য করে?

উত্তর: যকৃত মানবদেহের বৃহত্তম গ্রন্থি। এটি পিত্তরস উৎপাদন ও সঞ্চয় করে, যা খাদ্যের চর্বি বা ফ্যাট পরিপাকে সাহায্য করে।

প্রশ্ন ৩: অ্যামিবার পুষ্টি প্রক্রিয়া কীরূপ?

উত্তর: অ্যামিবা এককোষী জীব। এটি ক্ষণপদ বা সিউডোপোডিয়া (Pseudopodia) তৈরি করে খাদ্যকে ঘেরাও করে খাদ্যগহ্বর তৈরি করে এবং উৎসেচকের সাহায্যে খাদ্য পরিপাক করে।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা শিখলাম:

  • প্রাণীরা পরভোজী এবং পুষ্টির জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল।
  • মানবদেহের পরিপাকতন্ত্র মুখগহ্বর, গ্রাসনালী, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র এবং বৃহদান্ত্র নিয়ে গঠিত।
  • যকৃত এবং অগ্ন্যাশয় পরিপাক ক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম ও রস সরবরাহ করে।
  • ক্ষুদ্রান্ত্রে খাদ্যের পরিপাক সম্পূর্ণ হয় এবং পুষ্টিরস শোষিত হয়।
  • রোমন্থক প্রাণীরা সেলুলোজ হজম করার জন্য বিশেষ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে।