বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের চারপাশের দৈনন্দিন জীবনে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে চলেছে। কখনও তা ভৌত পরিবর্তন, আবার কখনও রাসায়নিক পরিবর্তন। দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের প্রথম অধ্যায় 'রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং সমীকরণ' (Chemical Reactions and Equations)-এ আমরা মূলত রাসায়নিক পরিবর্তন এবং সেগুলি লেখার ও সমতা বিধান করার নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারব। যখন এক বা একাধিক পদার্থ নিজেদের মধ্যে বিক্রিয়া করে সম্পূর্ণ নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এক বা একাধিক নতুন পদার্থের সৃষ্টি করে, তখন তাকে রাসায়নিক বিক্রিয়া বলা হয়। এই অধ্যায়টি রসায়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই অধ্যায়ে আমরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণার মুখোমুখি হই:

  • রাসায়নিক পরিবর্তন: যে পরিবর্তনে পদার্থের রাসায়নিক গঠন এবং ধর্ম সম্পূর্ণ বদলে যায়, তাকে রাসায়নিক পরিবর্তন বলে। যেমন—দুধ থেকে দই তৈরি, লোহায় মরচে পড়া ইত্যাদি।
  • রাসায়নিক সমীকরণ: কথায় লেখার পরিবর্তে যখন কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়াকে বিক্রিয়ক ও উৎপাদগুলির সংকেত এবং প্রতীকের সাহায্যে সংক্ষেপে প্রকাশ করা হয়, তখন তাকে রাসায়নিক সমীকরণ বলা হয়। যেমন, ম্যাগনেসিয়ামের বায়ুতে দহন: $2Mg + O_2 \rightarrow 2MgO$।
  • ভারসাম্যযুক্ত রাসায়নিক সমীকরণ: ভর সংরক্ষণের সূত্র অনুসারে, কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভর সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। তাই বিক্রিয়ক ও উৎপাদ উভয় দিকে প্রতিটি মৌলের পরমাণুর সংখ্যা সমান হতে হয়। একে সমীকরণ ভারসাম্য রক্ষা করা বা Balancing বলা হয়।

রাসায়নিক বিক্রিয়ার বিভিন্ন প্রকারভেদ নিচে আলোচনা করা হলো:

  • সংযোজন বিক্রিয়া (Combination Reaction): যে বিক্রিয়ায় দুই বা ততোধিক বিক্রিয়ক মিলিত হয়ে একটিমাত্র উৎপাদ উৎপন্ন করে। যেমন—কুইক লাইম বা পোড়াচুনের ($CaO$) সাথে জলের বিক্রিয়া।
  • বিযোজন বিক্রিয়া (Decomposition Reaction): যে বিক্রিয়ায় একটিমাত্র বিক্রিয়ক ভেঙে সরলতর উৎপাদে পরিণত হয়। যেমন—ক্যালসিয়াম কার্বনেটের তাপীয় বিযোজন: $CaCO_3 \rightarrow CaO + CO_2$।
  • অপসারণ বিক্রিয়া (Displacement Reaction): অধিক সক্রিয় মৌল কম সক্রিয় মৌলকে তার যৌগ থেকে অপসারিত করে। যেমন—কপার সালফেটের দ্রবণে লোহা বা জিংক যোগ করলে কপারের অপসারণ ঘটে।
  • দ্বি-অপসারণ বিক্রিয়া (Double Displacement Reaction): যে বিক্রিয়ায় দুটি যৌগের মধ্যে আয়রনের বিনিময় ঘটে নতুন যৌগ উৎপন্ন হয়।
  • জারণ ও বিজারণ (Oxidation and Reduction): অক্সিজেনের সংযোজন বা হাইড্রোজেনের অপসারণকে জারণ বলা হয়, এবং অক্সিজেনের অপসারণ বা হাইড্রোজেনের সংযোজনকে বিজারণ বলে। জারণ-বিজারণ একসঙ্গে ঘটলে তাকে রেডক্স বিক্রিয়া (Redox Reaction) বলে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: রাসায়নিক সমীকরণকে কেন ভারসাম্যযুক্ত করতে হয়?
উত্তর: ভর সংরক্ষণের সূত্র অনুসারে, যেকোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিক্রিয়কের মোট ভর এবং উৎপাদের মোট ভর সমান থাকতে হয়। অর্থাৎ বিক্রিয়ার আগে ও পরে প্রতিটি মৌলের পরমাণুর সংখ্যা সমান হতে হবে। তাই সমীকরণ সমতাযুক্ত করা বাধ্যতামূলক।

প্রশ্ন ২: জারণ ও বিজারণ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: যে প্রক্রিয়ায় কোনো পদার্থের সাথে অক্সিজেন যুক্ত হয় বা হাইড্রোজেন অপসারিত হয় তাকে জারণ বলে। আর যে প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন অপসারিত হয় বা হাইড্রোজেন যুক্ত হয় তাকে বিজারণ বলে।

প্রশ্ন ৩: কুইক লাইম জলের সাথে বিক্রিয়া করলে কী ঘটে?
উত্তর: কুইক লাইম বা ক্যালসিয়াম অক্সাইড ($CaO$) জলের ($H_2O$) সাথে তীব্রভাবে বিক্রিয়া করে স্লেকড লাইম বা ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড [$Ca(OH)_2$] উৎপন্ন করে এবং প্রচুর পরিমাণে তাপশক্তি নির্গত হয়।

সারসংক্ষেপ

  • রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নতুন পদার্থ উৎপন্ন হয়।
  • রাসায়নিক সমীকরণকে সবসময় ভর সংরক্ষণের সূত্র মেনে ভারসাম্যযুক্ত করতে হয়।
  • বিক্রিয়া প্রধানত সংযোজন, বিযোজন, অপসারণ, দ্বি-অপসারণ এবং জারণ-বিজারণ ভাগে বিভক্ত।
  • খাবারে তেল বা চর্বি জারিত হয়ে পচে যাওয়াকে র্যান্সিডিটি বা গন্ধহীনতা নষ্ট হওয়া বলা হয়, যা রোধ করতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবহার করা হয়।