ঘটনার প্রেক্ষাপট
১৫২০ সালের উত্তাল শীতকাল। পর্তুগিজ অভিযাত্রী ফের্দিনান্দ ম্যাগেলান তার জাহাজবহর নিয়ে বিশ্বজয়ের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন এক অজানা প্রান্তরে। পৃথিবীর দক্ষিণতম প্রান্তে, আজকের আর্জেন্টিনা ও চিলির সীমান্ত ঘেঁষা পটাগোনিয়ার রুক্ষ ও বরফঠাণ্ডা উপকূলে যখন তাদের জাহাজ ভিড়ল, তখন কেউ ঘুণাক্ষরেও টেরও পায়নি যে ইতিহাসের পাতায় এক অদ্ভুত ও রোমহর্ষক অধ্যায় অপেক্ষা করছে। সমুদ্রের বুক চিরে বয়ে চলা হিমশীতল হাওয়া আর দিগন্তবিস্তৃত ধূসর প্রান্তর। ঠিক সেই সময়েই সমুদ্র সৈকতে এমন এক দৃশ্য দেখা গেল যা নাবিকদের রক্ত হিম করে দিয়েছিল!
রহস্যের জাল
জাহাজের ক্রনিকলার আন্তোনিও পিগাফেত্তার ডায়েরির পাতায় উঠে এসেছিল এক অবিশ্বাস্য বিবরণ। একদিন হঠাৎ করেই উপকূলের বালুকাবেলায় এক অদ্ভুতদর্শন, প্রায় নগ্ন মানুষকে দেখা গেল যে আকারে ছিল সাধারণ মানুষের দ্বিগুণ। সেই বিশালকায় মানুষটি আনন্দে বা উন্মাদনায় নাচছিল, গান গাইছিল এবং নিজের মাথায় ধুলোবালি ছড়াচ্ছিল। ম্যাগেলান কৌতূহল ও সতর্কতার সাথে তার এক নাবিককে নির্দেশ দিলেন তার মতো করে নাচতে ও শান্তির বার্তা নিয়ে এগিয়ে যেতে। যখন সেই প্রকাণ্ড মানবকে ম্যাগেলানের সামনে আনা হলো, তখন ইউরোপীয় নাবিকদের মাথা তার কোমর পর্যন্ত পৌঁছাত! ভীতি এবং বিস্ময়ে হতবাক সেই মানুষটি আকাশের দিকে এক আঙুল তুলে ইশারা করেছিল, যার অর্থ সে ভেবেছিল এই ভিনদেশী নাবিকেরা আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো স্বর্গীয় দেবতা। এই ঘটনা কোনো একক অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; পরবর্তী সময়ে ইংরেজ অভিযাত্রী স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক এবং কমোডোর জন বাইরনের অভিযানেও এই পটাগোনীয় দানবদের দেখা পাওয়ার দাবি জোরালো হয়। ইউরোপের মানচিত্রে পটাগোনিয়া পরিচিত হয়ে ওঠে ‘বিশালপায়ের দেশ’ বা দানবদের ভূমি হিসেবে!
সত্যের উন্মোচন
শত শত বছর ধরে ইউরোপীয়দের মনে ভয় ও কৌতূহল জাগিয়ে রাখা এই পটাগোনীয় দানবরা কি আসলেই কোনো পৌরাণিক মানবজাতি ছিল? আধুনিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, এটি আসলে ছিল একটি অতিরঞ্জিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভুল ধারণার ফল। পটাগোনিয়ার আদিবাসী ‘তেহুয়েলচে’ (Tehuelche) উপজাতির মানুষেরা তৎকালীন ইউরোপীয়দের তুলনায় কিছুটা দীর্ঘকায় এবং সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। তাছাড়া, তারা পায়ের পাতা ঢাকতে পশুর চামড়ার যে বিশেষ জুতো বা মোকাসিন ব্যবহার করতেন, বরফের ওপর তার ছাপ দেখে ইউরোপীয়দের মনে বিশাল আকারের ভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। কল্পনার রঙে মিশে সেই সাধারণ উচ্চতার মানুষগুলোই ইউরোপের কাছে হয়ে উঠেছিল ১৫-২০ ফুট লম্বা রক্তমাংসের দানব। তবুও, ম্যাগেলানের সেই লগ্নে আকাশের দিকে সেই প্রকাণ্ড মানুষটির আঙুল তোলার রহস্য আর অভিযাত্রীদের মনে জাগা কাঁপুনি আজও ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর উপাখ্যান হয়ে রয়েছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)