বিষয়ের ভূমিকা

দ্বাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠ্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলো ভারতের বিদেশ নীতি। স্বাধীনোত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব কীভাবে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে, কোন নীতিগুলির ওপর ভিত্তি করে আমাদের দেশের পররাষ্ট্র নীতি পরিচালিত হয় এবং ঠান্ডা যুদ্ধের সময় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের ক্ষেত্রে ভারত কী ভূমিকা পালন করেছিল। বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের এই স্বতন্ত্র অবস্থান শিক্ষার্থীদের জন্য জানা অত্যন্ত জরুরি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

ভারতের বিদেশ নীতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর হাত ধরে। তাঁর চিন্তাধারাই দীর্ঘকাল ধরে ভারতের পররাষ্ট্র নীতিকে পরিচালিত করেছে। নিচে ভারতের বিদেশ নীতির প্রধান স্তম্ভ এবং ধারণাগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

  • পঞ্চশীল নীতি (Panchsheel Principles): ১৯৫৪ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে পঞ্চশীল নীতি আত্মপ্রকাশ করে। এর মূল পাঁচটি নীতি হলো একে অপরের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, পরস্পর অ-আক্রমণ, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সমতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা, এবং শান্তিতে সহাবস্থান।
  • জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (Non-Aligned Movement - NAM): ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যখন বিশ্ব দুটি পরাশক্তি (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন) শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, তখন ভারত কোনো ব্লকেই যোগ না দিয়ে একটি স্বতন্ত্র তৃতীয় শক্তি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। একেই জোটনিরপেক্ষ নীতি বলা হয়। এর মাধ্যমে ভারত নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে পেরেছিল।
  • পারমাণবিক নীতি (Nuclear Policy): ভারতের পারমাণবিক নীতির মূল কথাই হলো 'প্রথমে ব্যবহার নয়' (No First Use)। ভারত শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তি অর্জন করেছে এবং নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে জোরালো সওয়াল করে আসছে।
  • প্রতিবেশী প্রথম নীতি (Neighborhood First Policy): ভারতের বিদেশ নীতিতে তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সাথে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এর প্রধান লক্ষ্য।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: ভারতের বিদেশ নীতির মূল স্থপতি কে ছিলেন?
উত্তর: স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু ভারতের বিদেশ নীতির মূল স্থপতি ছিলেন।

প্রশ্ন ২: পঞ্চশীল নীতি কবে এবং কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?
উত্তর: পঞ্চশীল নীতি ১৯৫৪ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়।

প্রশ্ন ৩: জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা NAM-এর মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: ঠান্ডা যুদ্ধের সময় কোনো সামরিক জোটে যোগ না দিয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি বজায় রাখা এবং বিশ্ব শান্তি ও সহযোগিতা রক্ষা করা ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জানতে পেরেছে যে ভারতের বিদেশ নীতি শান্তি, সহযোগিতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন থেকে শুরু করে বর্তমান যুগে বহুমেরু বিশিষ্ট বিশ্বে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কূটনীতি—সবকিছুই এই অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। এটি কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, বরং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।