বিষয়ের ভূমিকা
ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি অর্জন। শুধুমাত্র বাজারের বা পুঁজিবাদের ওপর ভরসা করে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশের উন্নয়ন সম্ভব ছিল না। এই কারণেই ভারত সরকার একটি পরিকল্পিত উন্নয়নের পথ বেছে নেয়। দ্বাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা এই 'পরিকল্পিত উন্নয়নের রাজনীতি' বা Politics of Planned Development সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। কীভাবে পরিকল্পনা কমিশন গঠিত হলো, বোম্বে প্ল্যান কী ছিল এবং প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা কীভাবে ভারতের অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তুলেছিল, তা এই অধ্যায়ের মূল বিষয়।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক ধারার এক অনন্য মিশ্রণ। নিচে এর প্রধান দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
- বোম্বে প্ল্যান (The Bombay Plan): ১৯৪৪ সালে দেশের কিছু শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি একসাথে মিলে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি প্রস্তাব পেশ করেন, যা 'বোম্বে প্ল্যান' নামে পরিচিত। এর মূল কথা ছিল রাষ্ট্র যেন শিল্পায়ন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে।
- পরিকল্পনা কমিশন গঠন (Planning Commission): ১৯৫০ সালের মার্চ মাসে ভারত সরকার একটি রেজোলিউশনের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশন (Planning Commission) গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এর পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান। এর কাজ ছিল দেশের সম্পদ মূল্যায়ন করা এবং পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা তৈরি করা।
- প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (First Five Year Plan): ১৯৫১ সালে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা চালু হয়, যা ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত চলে। কে. এন. রাজ (K.N. Raj) তরুণ অর্থনীতিবিদ এই পরিকল্পনা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এই পরিকল্পনায় মূলত কৃষির ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়, কারণ দেশ তখন খাদ্য সংকটে ভুগছিল। ভাকড়া নাঙ্গাল বাঁধের মতো বড় সেচ প্রকল্পগুলিতে প্রচুর বিনিয়োগ করা হয়।
- দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (Second Five Year Plan): ১৯৫৬ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় পরিকল্পনাটি তৈরি করেছিলেন প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশ (P.C. Mahalanobis)। এই পরিকল্পনায় কৃষির পরিবর্তে ভারী শিল্পের ওপর জোর দেওয়া হয়। শিল্পায়নকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর ধাঁচে মিশ্র অর্থনীতি গ্রহণ করা হয়।
- খাদ্য সংকট এবং সবুজ বিপ্লব (Green Revolution): ১৯৬0-এর দশকে ভারতে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার উচ্চফলনশীল বীজ, সার ও সেচ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করে, যা 'সবুজ বিপ্লব' নামে পরিচিত। এটি পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কৃষকদের অত্যন্ত লাভবান করে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: পরিকল্পনা কমিশন কবে গঠিত হয় এবং এর প্রধান কাজ কী ছিল?
উত্তর: পরিকল্পনা কমিশন ১৯৫০ সালের মার্চ মাসে গঠিত হয়। এর প্রধান কাজ ছিল দেশের উপলব্ধ সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন করা এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। বর্তমান সময়ে এর পরিবর্তে নীতি আয়োগ (NITI Aayog) কাজ করছে।
প্রশ্ন ২: প্রথম এবং দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল ফারাক কোথায় ছিল?
উত্তর: প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৫১-৫৬) প্রধান জোর দেওয়া হয়েছিল কৃষির ওপর এবং বাঁধ নির্মাণ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে। পক্ষান্তরে, দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৫৬-৬১) ভারী শিল্পের বিকাশ এবং দ্রুত শিল্পায়নের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল।
প্রশ্ন ৩: সবুজ বিপ্লব বলতে কী বোঝো?
উত্তর: ১৯৬০-এর দশকে ভারতের কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়ানোর জন্য যে আধুনিক কৌশল প্রয়োগ করা হয়—যেমন উচ্চফলনশীল (HYV) বীজের ব্যবহার, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রয়োগ এবং উন্নত সেচ ব্যবস্থা—তাকে একত্রে 'সবুজ বিপ্লব' বলা হয়। এর ফলে ভারত খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে।
সারসংক্ষেপ
- ভারত স্বাধীনতার পর মিশ্র অর্থনীতি এবং পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়নের পথ বেছে নেয়।
- ১৯৫০ সালে গঠিত পরিকল্পনা কমিশন দেশের প্রথম ও দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা রূপায়ণে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
- প্রথম পরিকল্পনায় কৃষি ও দ্বিতীয় পরিকল্পনায় ভারী শিল্পকে প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
- ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে সবুজ বিপ্লব ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।