বিষয়ের ভূমিকা
পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা হলো চল তড়িৎ বা Current Electricity। দ্বাদশ শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আলো জ্বালানো, পাখা চালানো থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন চার্জ করা—সবকিছুই চল তড়িতের ওপর নির্ভরশীল। এই অধ্যায়ে আমরা শিখবো কীভাবে আধানের প্রবাহ ঘটে এবং কীভাবে বৈদ্যুতিক শক্তিকে কাজে লাগানো হয়। বিশেষ করে ওহমের সূত্র, রোধের সমবায় এবং কার্শফের সূত্র এই অধ্যায়ের মূল স্তম্ভ। এই আলোচনায় আমরা অত্যন্ত সহজভাবে এই জটিল ধারণাগুলি বোঝার চেষ্টা করব যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের বোর্ড পরীক্ষায় এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
চল তড়িৎ বোঝার জন্য আমাদের প্রথমে কিছু মৌলিক রাশির সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। নিচে প্রধান ধারণাগুলি আলোচনা করা হলো:
১. তড়িৎ প্রবাহ মাত্রা (Electric Current)
কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্তুতচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তাকে তড়িৎ প্রবাহ মাত্রা বলে। যদি $t$ সময়ে পরিবাহীর মধ্য দিয়ে $Q$ পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তবে তড়িৎ প্রবাহ মাত্রা $I$ হবে:
$I = \frac{Q}{t}$
তড়িৎ প্রবাহের এসআই (SI) একক হলো অ্যাম্পিয়ার (Ampere, A)। এটি একটি স্কেলার রাশি হলেও এর দিক ও মান উভয়ই বিবেচনা করা হয়। অ্যাম্পিয়ারের সংজ্ঞা অনুসারে, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে এক কুলম্ব আধান প্রবাহিত হলে তাকে এক অ্যাম্পিয়ার বলে।
২. ওহমের সূত্র (Ohm's Law)
জার্মান পদার্থবিদ জর্জ সাইমন ওহম তড়িৎ প্রবাহ এবং বিভব পার্থক্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আবিষ্কার করেন যা ওহমের সূত্র নামে পরিচিত। এই সূত্র অনুযায়ী:
উষ্ণতা ও অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহ মাত্রা ওই পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্যের সমানুপাতিক হয়।
যদি পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য $V$ এবং প্রবাহ মাত্রা $I$ হয়, তবে:
$V \propto I$ বা, $V = IR$
এখানে $R$ হলো পরিবাহীর রোধ (Resistance)। রোধের এসআই একক হলো ওহম ($\Omega$)।
৩. রোধের সমবায় (Combination of Resistors)
বৈদ্যুতিক বর্তনীতে একাধিক রোধকে মূলত দুইভাবে যুক্ত করা যায়:
- শ্রেণী সমবায় (Series Combination): যখন একাধিক রোধকে এমনভাবে যুক্ত করা হয় যাতে প্রথমটির শেষ প্রান্তের সঙ্গে দ্বিতীয়টির আদি প্রান্ত যুক্ত থাকে, তখন তাকে শ্রেণী সমবায় বলে। এই সমবায়ে তুল্য রোধ $R_s$ হয় ব্যক্তিগত রোধগুলির যোগফলের সমান: $R_s = R_1 + R_2 + R_3 + \dots$
- সমান্তরাল সমবায় (Parallel Combination): যখন একাধিক রোধের আদি প্রান্তগুলি একটি সাধারণ বিন্দুতে এবং শেষ প্রান্তগুলি অপর একটি সাধারণ বিন্দুতে যুক্ত থাকে, তখন তাকে সমান্তরাল সমবায় বলে। এর তুল্য রোধ $R_p$-এর অনন্যক ব্যক্তিগত রোধগুলির অনন্যকের সমষ্টির সমান: $\frac{1}{R_p} = \frac{1}{R_1} + \frac{1}{R_2} + \dots$
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: রোধ কাকে বলে এবং এর ওপর উষ্ণতার প্রভাব কী?
উত্তর: পরিবাহীর যে ধর্মের জন্য এর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ বাধা পায়, তাকে রোধ বলে। পরিবাহীর দৈর্ঘ্য, প্রস্থচ্ছেদ এবং উপাদানের প্রকৃতির ওপর রোধ নির্ভরশীল। ধাতব পরিবাহীর ক্ষেত্রে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে রোধ বৃদ্ধি পায়, কারণ উষ্ণতা বাড়লে ইলেকট্রনের সাথে পরমাণুর সংঘর্ষ বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্ন ২: সুপারকন্ডাক্টর বা অতিপরিবাহী কী?
উত্তর: নির্দিষ্ট কিছু পদার্থকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা করলে তাদের রোধ প্রায় শূন্য হয়ে যায়। এই অবস্থাকে অতিবাহিতা এবং ওই পদার্থগুলিকে অতিপরিবাহী (Superconductor) বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, পারদের ক্ষেত্রে প্রায় 4.2 K তাপমাত্রায় অতিপরিবাহিতা দেখা যায়।
প্রশ্ন ৩: অভ্যন্তরীণ রোধ এবং কোষের তড়িচ্চালক বল বলতে কী বোঝো?
উত্তর: কোনো তড়িৎ কোষের ভেতরকার তরল বা পদার্থের জন্য যে রোধের সৃষ্টি হয় তাকে অভ্যন্তরীণ রোধ ($r$) বলে। আর কোষের দুই মেরুর মধ্যে বিভব পার্থক্যের সর্বোচ্চ মানকে তড়িচ্চালক বল (Electromotive Force বা EMF) বলে যখন কোষ থেকে কোনো বহিঃস্থ বর্তনীতে তড়িৎ নেওয়া হয় না।
সারসংক্ষেপ
- চল তড়িৎ হলো আধানের গতিশীল অবস্থার আলোচনা।
- তড়িৎ প্রবাহ মাত্রার এসআই একক অ্যাম্পিয়ার ($A$)।
- ওহমের সূত্র অনুসারে $V = IR$, যেখানে $R$ হলো রোধ।
- রোধ দুটি প্রধান উপায়ে যুক্ত হতে পারে: শ্রেণী সমবায় এবং সমান্তরাল সমবায়।
- কার্শফের সূত্র জটিল বর্তনী বিশ্লেষণে অত্যন্ত সহায়ক।