বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেক সময় অনুভব করি যে কিছু জিনিস খুব গরম আবার কিছু জিনিস বেশ ঠান্ডা। যেমন—শীতকালে আমাদের রোদে বসতে ভালো লাগে কারণ রোদ আমাদের উষ্ণতা দেয়, আবার গ্রীষ্মকালে ঘরের ভেতরের গরম সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এই গরম বা ঠান্ডার অনুভূতি আসলে কী? বিজ্ঞানের ভাষায় একেই আমরা 'তাপ' (Heat) বলি।
সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞানের চতুর্থ অধ্যায় 'তাপ' আমাদের শেখায় কেন কোনো বস্তু গরম বা ঠান্ডা হয় এবং কীভাবে এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে তাপ প্রবাহিত হয়। এই অধ্যায়টি কেবল পরীক্ষার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আমাদের চারপাশের প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো বোঝার জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. গরম এবং ঠান্ডা (Hot and Cold)
আমরা সাধারণত কোনো বস্তুকে স্পর্শ করে বোঝার চেষ্টা করি সেটি গরম না ঠান্ডা। যেমন, আইসক্রিম ঠান্ডা কিন্তু চা-এর কাপ গরম। তবে স্পর্শের মাধ্যমে তাপমাত্রা বোঝা সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়। একটি মজার পরীক্ষার মাধ্যমে এটি বোঝা যায়—যদি আমরা একটি হাত গরম জলে এবং অন্য হাত ঠান্ডা জলে ডুবিয়ে রাখি, তারপর উভয় হাত সাধারণ জলে ডুবাই, তবে আমাদের মস্তিষ্ক সঠিক তাপমাত্রা অনুভব করতে বিভ্রান্ত হয়। তাই গরম বা ঠান্ডার মাত্রাকে সঠিকভাবে মাপার জন্য আমাদের এক বিশেষ এককের প্রয়োজন হয়, যাকে বলা হয় তাপমাত্রা (Temperature)।
২. তাপমাত্রা পরিমাপ এবং থার্মোমিটার
তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য যে যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয় তাকে বলা হয় থার্মোমিটার। আমাদের পাঠ্যসূচিতে প্রধানত দুই ধরনের থার্মোমিটারের কথা বলা হয়েছে:
- ক্লিনিক্যাল থার্মোমিটার (Clinical Thermometer): এটি মানুষের শরীরের তাপমাত্রা মাপতে ব্যবহৃত হয়। এর গঠন খুব সূক্ষ্ম এবং এতে ৩৫° সেলসিয়াস থেকে ৪২° সেলসিয়াস পর্যন্ত দাগ কাটা থাকে। মানুষের স্বাভাবিক শরীরের তাপমাত্রা সাধারণত ৩৭° সেলসিয়াস (বা ৯৮.৬° ফারেনহাইট)। ক্লিনিক্যাল থার্মোমিটারে একটি 'কিঙ্ক' (Kink) বা বাঁক থাকে, যা পারদকে নিজে থেকে নিচে নামতে বাধা দেয়, ফলে নির্ভুল পরিমাপ পাওয়া যায়।
- ল্যাবরেটরি থার্মোমিটার (Laboratory Thermometer): এটি গবেষণাগারে বিভিন্ন বস্তুর তাপমাত্রা মাপতে ব্যবহৃত হয়। এর পাল্লা সাধারণত -১০° সেলসিয়াস থেকে ১১০° সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়। এটি ব্যবহারের সময় উল্লম্বভাবে রাখতে হয় এবং বস্তু থেকে বের করার আগেই এর পাঠ নিতে হয়, কারণ এতে কোনো কিঙ্ক থাকে না।
৩. তাপ সঞ্চালনের পদ্ধতি (Transfer of Heat)
তাপ সবসময় উচ্চ তাপমাত্রার বস্তু থেকে নিম্ন তাপমাত্রার বস্তুর দিকে প্রবাহিত হয়। তাপ সঞ্চালনের প্রধান তিনটি পদ্ধতি নিচে আলোচনা করা হলো:
- পরিবহন (Conduction): কঠিন পদার্থের মধ্যে তাপ এক কণা থেকে অন্য কণায় প্রবাহিত হওয়ার পদ্ধতিকে পরিবহন বলে। উদাহরণস্বরূপ, আগুনের শিখায় ধাতব চামচ ধরলে এর অন্য প্রান্তটিও গরম হয়ে যায়। যে সব পদার্থ সহজে তাপ পরিবহন করে তাদের সুপরিবাহী (যেমন—লোহা, তামা, অ্যালুমিনিয়াম) এবং যারা সহজে তাপ পরিবহন করে না তাদের কুপরিবাহী বা অন্তরক (যেমন—কাঠ, প্লাস্টিক) বলা হয়।
- পরিচলন (Convection): তরল এবং বায়বীয় পদার্থের মধ্যে তাপ যখন কণাগুলোর স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়, তাকে পরিচলন বলে। যখন জল গরম করা হয়, নিচের গরম জল হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় এবং ওপরের ঠান্ডা জল নিচে নেমে আসে। এভাবে পুরো জল গরম হয়।
- বিকিরণ (Radiation): যে পদ্ধতিতে তাপ কোনো মাধ্যম ছাড়াই (শূন্যস্থান দিয়েও) এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছায়, তাকে বিকিরণ বলে। সূর্য থেকে তাপ পৃথিবীতে এই বিকিরণ পদ্ধতিতেই পৌঁছায়। বিকিরণ পদ্ধতিতে তাপ ছড়িয়ে পড়ার জন্য কোনো কঠিন, তরল বা গ্যাসীয় মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না।
৪. সমুদ্র বায়ু এবং স্থল বায়ু (Sea Breeze and Land Breeze)
উপকূলীয় অঞ্চলে পরিচলন পদ্ধতির একটি চমৎকার উদাহরণ দেখা যায়।
- সমুদ্র বায়ু: দিনের বেলায় স্থলভাগ জলভাগের চেয়ে দ্রুত গরম হয়। ফলে স্থলের ওপরের বাতাস গরম হয়ে উপরে উঠে যায় এবং সমুদ্র থেকে ঠান্ডা বাতাস স্থলের দিকে প্রবাহিত হয়। একে সমুদ্র বায়ু বলে।
- স্থল বায়ু: রাতে জলভাগের তুলনায় স্থলভাগ দ্রুত ঠান্ডা হয়। ফলে সমুদ্রের ওপরের উষ্ণ বাতাস উপরে উঠে গেলে স্থলভাগ থেকে ঠান্ডা বাতাস সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়। একে স্থল বায়ু বলা হয়।
৫. পোশাক এবং তাপ শোষণ
আমরা ঋতুভেদে আলাদা পোশাক পরি কেন? গাঢ় রঙের বস্তু হালকা রঙের বস্তুর তুলনায় বেশি তাপ শোষণ করে। তাই শীতকালে আমরা গাঢ় রঙের বা পশমের (Woolen) কাপড় পরি যা আমাদের শরীরকে উষ্ণ রাখে। অন্যদিকে, গ্রীষ্মকালে হালকা রঙের সুতির কাপড় পরলে তা তাপ প্রতিফলিত করে এবং আমাদের শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। পশমি কাপড় অন্তরক হিসেবে কাজ করে এবং শরীরের তাপকে বাইরে বের হতে বাধা দেয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. ক্লিনিক্যাল থার্মোমিটারে কিঙ্ক (Kink)-এর কাজ কী?
উত্তর: ক্লিনিক্যাল থার্মোমিটারের বাল্বের ঠিক উপরে একটি কিঙ্ক বা সূক্ষ্ম বাঁক থাকে। এটি থার্মোমিটারকে মুখ থেকে বের করার পরেও পারদের স্তম্ভকে হঠাৎ নিচে নেমে যেতে বাধা দেয়, ফলে চিকিৎসকরা সহজেই রোগীর সঠিক তাপমাত্রা নোট করতে পারেন।
২. স্টিলের চামচ গরম দুধে ডুবিয়ে রাখলে কেন অন্য প্রান্ত গরম হয়?
উত্তর: স্টিল একটি তাপের সুপরিবাহী পদার্থ। যখন চামচের এক প্রান্ত গরম দুধে থাকে, তখন 'পরিবহন' পদ্ধতির মাধ্যমে তাপ চামচের গরম প্রান্ত থেকে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা প্রান্তের দিকে প্রবাহিত হয়।
৩. সমুদ্র বায়ু এবং স্থল বায়ু কোন পদ্ধতির উদাহরণ?
উত্তর: সমুদ্র বায়ু এবং স্থল বায়ু তাপের 'পরিচলন' (Convection) পদ্ধতির বাস্তব উদাহরণ। বায়ুর ঘনত্বের পরিবর্তনের ফলে এই বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি হয়।
সারসংক্ষেপ
- তাপমাত্রা হলো কোনো বস্তুর গরম বা ঠান্ডার পরিমাপ।
- ক্লিনিক্যাল থার্মোমিটার শুধুমাত্র শরীরের তাপমাত্রা মাপতে ব্যবহৃত হয়।
- পরিবহন পদ্ধতিতে কঠিন পদার্থে তাপ সঞ্চালিত হয়।
- পরিচলন পদ্ধতি তরল ও বায়বীয় পদার্থের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
- সূর্য থেকে বিকিরণ পদ্ধতিতে পৃথিবীতে তাপ আসে।
- গাঢ় রঙের কাপড় বেশি তাপ শোষণ করে এবং হালকা রঙের কাপড় তাপ প্রতিফলিত করে।
- পশমি কাপড় বায়ু আটকে রেখে আমাদের শরীরকে উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে।