বিষয়ের ভূমিকা

ভারতের ইতিহাসের প্রথম সহস্রাব্দ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ (1st millennium BCE) বিশ্ব ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি ছিল এক আধ্যাত্মিক এবং বৌদ্ধিক পরিবর্তনের যুগ। এই সময়েই মহাবীর এবং বুদ্ধের মতো মহাপুরুষদের আবির্ভাব ঘটে এবং ভারতে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের ভিত্তি স্থাপিত হয়। দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাসের এই চতুর্থ অধ্যায়, 'বিচারক, বিশ্বাস ও ইমারত', আমাদের এই পরিবর্তনের সময়ের সামাজিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক পটভূমি বোঝার সুযোগ করে দেয়। বিশেষ করে সাঁচি স্তূপের মতো স্থাপত্যের মাধ্যমে সেই সময়ের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শিল্পকলার বিবর্তন সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. পরিবর্তনের প্রথম সহস্রাব্দ: একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীকে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে ধরা হয়। এই সময়ে জারাথ্রুস্ট (পারস্য), সক্রেটিস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটল (গ্রিস), কনফুসিয়াস (চীন) এবং ভারতে মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধ মানুষের অস্তিত্বের অর্থ এবং মহাবিশ্বের সাথে মানুষের সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। ভারতে এই সময় গঙ্গা উপত্যকায় নতুন নতুন শহর ও রাজ্য গড়ে উঠছিল এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছিল। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেই বৈদিক রীতিনীতির বাইরে নতুন চিন্তাধারার জন্ম হয়।

২. সাঁচি স্তূপের সংরক্ষণ এবং গুরুত্ব

সাঁচি স্তূপ প্রাচীন ভারতের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয়রা সাঁচি স্তূপের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। ফরাসি এবং ব্রিটিশরা এই স্তূপের তোরণ বা গেটওয়েগুলো নিজেদের দেশে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ভোপালের শাসকরা, বিশেষ করে শাহজাহান বেগম এবং তার উত্তরসূরি সুলতান জাহান বেগম, এই স্মৃতিস্তম্ভটির সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা সাঁচি স্তূপের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচুর অর্থ দান করেছিলেন এবং সেখানে একটি জাদুঘর ও অতিথি ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাদের এই দূরদর্শিতার কারণেই আজ সাঁচি স্তূপ ভারতের একটি প্রধান ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে।

৩. যজ্ঞ ও বিতর্ক: উপনিষদের ধারণা

বৈদিক যুগে যজ্ঞ বা বলিদানের প্রথা ছিল অত্যন্ত প্রচলিত। ঋগ্বেদে অগ্নি, ইন্দ্র এবং সোমের মতো দেবতাদের স্তুতি পাওয়া যায়। যজ্ঞগুলি মূলত গবাদি পশু, পুত্রসন্তান এবং দীর্ঘায়ুর জন্য করা হতো। তবে সময়ের সাথে সাথে মানুষ জীবনের অর্থ এবং পুনর্জন্ম সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। কুতাহারাশালা (Kutagarashala) বা বিতর্কের কুটিরে দার্শনিকদের মধ্যে এই সব বিষয়ে আলোচনা ও বিতর্ক চলত। যদি কোনো দার্শনিক অন্যকে তর্কে পরাজিত করতে পারতেন, তবে পরাজিত ব্যক্তি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করতেন। এই পরিবেশ থেকেই বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উদ্ভব হয়।

৪. মহাবীর ও জৈন ধর্ম

জৈন ধর্মের মৌলিক ধারণাগুলো মহাবীরের জন্মের আগেই বিদ্যমান ছিল। জৈন বিশ্বাস অনুসারে, জগত প্রাণময় – অর্থাৎ পাথর, জল এবং বায়ুরও প্রাণ আছে। জৈন ধর্মের প্রধান স্তম্ভগুলি হলো:

  • অহিংসা (Non-violence): প্রাণীকুল, এমনকি ক্ষুদ্রতম কীটপতঙ্গের প্রতিও অহিংসা পালন করা। এটি জৈন ধর্মের কেন্দ্রীয় দর্শন।
  • কর্মফল: মানুষ তার কর্মের মাধ্যমে পুনর্জন্মের চক্রে আবদ্ধ হয়। ত্যাগ এবং তপস্যার মাধ্যমেই এই চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
  • সংসার ত্যাগ: জৈন ধর্মমতে, মোক্ষ লাভের জন্য সংসার ত্যাগ করা এবং সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করা অপরিহার্য।
জৈন সন্ন্যাসীদের জন্য পাঁচটি ব্রত পালন করা বাধ্যতামূলক ছিল: হত্যা না করা, চুরি না করা, মিথ্যা না বলা, ব্রহ্মচর্য পালন করা এবং সম্পদ সংগ্রহ না করা।

৫. গৌতম বুদ্ধ ও নির্বাণের পথ

সিদ্ধার্থ (গৌতম বুদ্ধ) শাক্য বংশের এক রাজপুত্র ছিলেন। তিনি জীবনের দুঃখ-কষ্ট দেখে বিচলিত হন এবং সত্যের সন্ধানে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করেন। দীর্ঘ সাধনার পর তিনি বোধি জ্ঞান লাভ করেন। বুদ্ধের প্রধান শিক্ষাগুলি ছিল:

  • চারটি আর্য সত্য (Four Noble Truths): জগত দুঃখময়, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখ নিরোধ সম্ভব এবং নিরোধের পথ হলো অষ্টাঙ্গিক মার্গ।
  • অষ্টাঙ্গিক মার্গ: সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎ কাজ এবং সঠিক ধ্যানের মাধ্যমে মধ্যম পন্থায় জীবনযাপন।
  • নির্বাণ: ব্যক্তিগত অহং এবং ইচ্ছার বিনাশ ঘটানোর মাধ্যমে জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি লাভ।
বুদ্ধের মতে, সমাজ কোনো ঐশ্বরিক সৃষ্টি নয়, বরং মানুষের তৈরি। তাই তিনি রাজাদের এবং গৃহস্থদের দয়ালু ও নীতিবান হওয়ার পরামর্শ দিতেন।

৬. বৌদ্ধ সংঘ ও ধর্ম প্রচার

বুদ্ধের বাণী প্রচারের জন্য 'সংঘ' বা সন্ন্যাসী সংগঠনের সৃষ্টি হয়। প্রাথমিকভাবে কেবল পুরুষরা সংঘে যোগ দিতে পারতেন, কিন্তু পরবর্তীতে বুদ্ধের শিষ্য আনন্দ-এর অনুরোধে নারীদেরও সংঘে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। বুদ্ধের বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমী ছিলেন প্রথম নারী ভিক্ষুণী। বৌদ্ধ ধর্ম খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল কারণ এটি বর্ণপ্রথার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে সমান মর্যাদা প্রদান করত।

৭. স্তূপ: নির্মাণ ও স্থাপত্যকলা

বৌদ্ধ ধর্মে স্তূপ হলো পবিত্র স্থান যেখানে বুদ্ধের দেহাবশেষ বা তাঁর ব্যবহৃত জিনিস সংরক্ষিত থাকত। অশোকের মতো রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারে অনেক স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন। স্তূপের প্রধান অংশগুলো হলো:

  • অণ্ড (Anda): এটি একটি অর্ধগোলাকার মাটির স্তূপ।
  • হার্মিকা (Harmika): অণ্ডের উপরে অবস্থিত একটি বারান্দার মতো অংশ যা দেবতাদের বাসস্থান হিসেবে গণ্য হয়।
  • যষ্টি (Yashti): হার্মিকা থেকে উঠে আসা একটি দণ্ড, যার মাথায় ছত্রী (Chattri) থাকত।
সাঁচি ও অমরাবতী ছিল বিখ্যাত স্তূপ। তবে অমরাবতী স্তূপটি সংরক্ষণের অভাবে এবং মানুষের অবহেলায় প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, যেখানে সাঁচি স্তূপটি ভোপালের রাজাদের সহায়তায় অক্ষত থাকে।

৮. পুরাণীয় হিন্দুধর্মের উত্থান

একই সময়ে বৈষ্ণবধর্ম এবং শৈবধর্মের বিকাশ ঘটে। এখানে অবতারবাদ এবং ভক্তির উপর জোর দেওয়া হতো। দেবতাদের উপাসনার জন্য মন্দির নির্মাণ শুরু হয়। শুরুর দিকের মন্দিরগুলি ছিল ছোট বর্গাকার ঘর, যাকে 'গর্ভগৃহ' বলা হতো। পরবর্তীতে মন্দিরের উপরে উচুঁ শিখর এবং প্রবেশপথে মণ্ডপ তৈরি করা হতে থাকে। অজন্তা ও ইলোরার গুহা মন্দিরগুলি এই যুগের স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: সাঁচি স্তূপ কেন টিকে গেল কিন্তু অমরাবতী স্তূপ নয়?
উত্তর: সাঁচি স্তূপ টিকে থাকার প্রধান কারণ ছিল ভোপালের বেগমদের আর্থিক অনুদান এবং সংরক্ষণের সঠিক উদ্যোগ। অন্যদিকে, অমরাবতী স্তূপটি অনেক আগেই আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং সেখানকার অমূল্য ভাস্কর্যগুলো ব্রিটিশ ও অন্যান্য সংগ্রহকারীরা নিজেদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ বা জাদুঘরের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে অমরাবতী তার জৌলুস হারিয়ে ফেলে।

প্রশ্ন ২: জৈন ধর্মের প্রধান শিক্ষা কী?
উত্তর: জৈন ধর্মের প্রধান শিক্ষা হলো অহিংসা। জগতের সমস্ত জীব, এমনকি জড় বস্তুর প্রতিও মমতা দেখানো এবং কঠোর তপস্যার মাধ্যমে কর্মফল থেকে মুক্তি লাভ করাই হলো এই ধর্মের মূল উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন ৩: বৌদ্ধ ধর্মের 'ত্রিপিটক' কী?
উত্তর: বুদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর বাণীগুলো সংকলিত হয়, যা 'ত্রিপিটক' নামে পরিচিত। এগুলি হলো—বিনয় পিটক (সংঘের নিয়ম), সুত্ত পিটক (বুদ্ধের শিক্ষা) এবং অভিধম্ম পিটক (দার্শনিক আলোচনা)।

সারসংক্ষেপ

  • খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী ছিল ভারতের আধ্যাত্মিক বিপ্লবের কাল।
  • সাঁচি স্তূপ প্রাচীন ভারতের শিল্প ও স্থাপত্যের এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন যা শাহজাহান বেগমের মতো শাসকদের দাক্ষিণ্যে রক্ষা পেয়েছে।
  • জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম বর্ণপ্রথা ও যজ্ঞের আড়ম্বরকে অস্বীকার করে নৈতিকতা ও ত্যাগের উপর জোর দেয়।
  • স্তূপ নির্মাণ এবং মন্দিরের বিবর্তন প্রাচীন ভারতের সাংস্কৃতিক বিকাশের পরিচয় দেয়।
  • এই যুগটি শুধু ধর্মের নয়, বরং স্থাপত্য, ভাস্কর্য এবং মানবিক দর্শনের এক মহা-মিলনমেলা ছিল।