ঘটনার প্রেক্ষাপট

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। ফ্রান্স তখন সবেমাত্র সাত বছরের বিধ্বংসী যুদ্ধ (Seven Years' War) শেষ করে উঠেছে। রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের রাজত্বে দেশজুড়ে এক ধরনের অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট। এইরকম এক সময়ে, ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলের এক দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন প্রদেশ জেভোদানে (Gévaudan) নেমে এসেছিল এক রক্তহিম করা আতঙ্ক। পাইন আর ওক গাছে ঢাকা বিশাল অরণ্য, এবড়োখেবড়ো পাহাড়ি এলাকা আর ছোট ছোট গ্রাম নিয়ে গঠিত এই প্রদেশটি যেন সভ্য জগৎ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল।

১৭৬৪ সালের জুন মাস। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা ছিল শান্ত ও সরল, কিন্তু সেই শান্তি এক মুহূর্তে চুরমার হয়ে গেল। একদিন, মেরকোয়ার (Mercoire) জঙ্গলের কাছে এক তরুণী তার গবাদি পশু চরাচ্ছিল। হঠাৎই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে এক বিশাল, অদ্ভুতদর্শন জন্তু। প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, দেখতে অনেকটা নেকড়ের মতো, কিন্তু নেকড়ের চেয়েও বড় এবং ভয়ঙ্কর। মেয়েটি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল তার গরুর পালের জন্য, যারা দলবদ্ধভাবে জন্তুটিকে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এটিই ছিল এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়ের সূচনা মাত্র। ৩০শে জুন, ১৪ বছরের কিশোরী জ্যন বুলে (Jeanne Boulet) এতটা ভাগ্যবান ছিল না। সে-ই হলো ‘লা বেত’ (La Bête) বা ‘সেই জন্তু’র প্রথম আনুষ্ঠানিক শিকার। জেভোদানের শান্ত আকাশে জমে উঠেছিল কালো মেঘের ঘনঘটা।

রহস্যের জাল

এরপর থেকে শুরু হয় এক নারকীয় হত্যালীলা। একের পর এক আক্রমণ হতে থাকে, যার শিকার ছিল মূলত নারী ও শিশুরা, যারা মাঠে একাকী পশু চরাতে যেত। জন্তুটির আক্রমণের পদ্ধতি ছিল ভয়ানক নৃশংস। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিকারের গলা চিরে দিত অথবা মাথা শরীর থেকে ছিন্ন করে ফেলত। খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না। প্যারিসের সংবাদপত্রগুলো ফলাও করে ছাপতে শুরু করল জেভোদানের এই ভয়ঙ্কর কাহিনী, আর খুব শীঘ্রই এটি এক জাতীয় আতঙ্কে পরিণত হলো।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা জন্তুটির রহস্য আরও ঘনীভূত করে তুলেছিল। তাদের মতে, এটি ছিল গরুর বাছুরের মতো বিশাল, তার গায়ের রঙ ছিল লালচে-বাদামী আর পিঠের ওপর ছিল কালো ডোরাকাটা দাগ। তার লেজ ছিল সাধারণ নেকড়ের চেয়ে অনেক লম্বা, অনেকটা সিংহের লেজের মতো। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় ছিল তার অবিশ্বাস্য শক্তি ও ধূর্ততা। অনেক শিকারি দাবি করেন যে তারা জন্তুটিকে গুলি করেছেন, কিন্তু গুলির আঘাত তার ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। মনে হচ্ছিল যেন তার চামড়া অভেদ্য। গুজব রটে গেল যে এটি কোনো সাধারণ প্রাণী নয়, বরং এক অতিপ্রাকৃত শক্তি বা ‘লুপ-গারু’ (loup-garou) অর্থাৎ ওয়্যারউলফ।

সাধারণ মানুষের বীরত্বের কাহিনীও ছড়িয়ে পড়ছিল। ১৭৬৫ সালের জানুয়ারিতে, জ্যাক পোর্টেফেইক্স (Jacques Portefaix) নামে এক দশ বছরের বালক তার সাতজন সঙ্গীকে নিয়ে জন্তুটির মুখোমুখি হয়। তারা তাদের হাতের লাঠি দিয়ে জন্তুটিকে এমনভাবে প্রতিরোধ করে যে সেটি পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই বীরত্বের খবর রাজা পঞ্চদশ লুই পর্যন্ত পৌঁছায় এবং তিনি শিশুদের সাহসিকতার জন্য পুরস্কৃত করেন। আরেক ঘটনায়, মেরি-জ্যন ভ্যালেট (Marie-Jeanne Vallet) নামের এক তরুণী বর্শার আঘাতে জন্তুটিকে আহত করে এবং ‘জেভোদানের কুমারী’ (Maid of Gévaudan) নামে পরিচিতি পান।

পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে রাজা পঞ্চদশ লুই হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হন। তিনি তার সেরা শিকারিদের জেভোদানে পাঠান। কিন্তু পেশাদার শিকারিরাও ব্যর্থ হয়। অবশেষে, রাজা তার ব্যক্তিগত বন্দুকধারী (King's gunbearer) ফ্রাঁসোয়া አንতোয়ানকে (François Antoine) পাঠান। ১৭৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে, አንতোয়ান এক বিশাল নেকড়েকে হত্যা করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘ল্য লুপ দ‍্য শ্যাজ’ (Le Loup de Chazes)। সবাই ধরে নিয়েছিল যে আতঙ্ক শেষ হয়েছে। አንতোয়ানকে বীরের সম্মান দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক মাস পরেই, ডিসেম্বরে, আবার আক্রমণ শুরু হয়। এবার জন্তুটি যেন আরও হিংস্র ও নির্ভীক হয়ে ফিরে আসে। জেভোদানের মানুষের জন্য এই উপলব্ধি ছিল এক দুঃস্বপ্নের মতো।

সত্যের উন্মোচন

রাজা পঞ্চদশ লুই এই বিষয়ে আর কোনো সাহায্য পাঠাতে রাজি ছিলেন না, কারণ তিনি মনে করতেন যে জন্তুটিকে আগেই মারা হয়েছে। জেভোদানের মানুষ এবার নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেয়। স্থানীয় এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, মার্কি দ‍্য আপশের (Marquis d'Apcher), একটি বিশাল শিকারের আয়োজন করেন। ১৭৬৭ সালের ১৯শে জুন, জ্যঁ শ্যাসেল (Jean Chastel) নামে এক স্থানীয় কৃষক ও শিকারি সেই অভিযানে অংশ নেন। কথিত আছে, শ্যাসেল রুপোর তৈরি বুলেট ব্যবহার করেছিলেন। সেদিন, সনিয় দ'ওভের (Sogne d'Auvers) নামক স্থানে জন্তুটি শ্যাসেলের মুখোমুখি হয় এবং তার গুলিতেই তার সমাপ্তি ঘটে। এই ঘটনার পর জেভোদানে আর কোনো আক্রমণ হয়নি। terror শেষ পর্যন্ত শেষ হয়েছিল।

কিন্তু রহস্যের কি সমাধান হয়েছিল? জ্যঁ শ্যাসেলের হাতে নিহত জন্তুটি ঠিক কী ছিল? এর উত্তর আজও পুরোপুরি মেলেনি। সবচেয়ে প্রচলিত তত্ত্ব হলো, এটি ছিল এক বা একাধিক মানুষখেকো নেকড়ে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে নেকড়ের আক্রমণ অস্বাভাবিক ছিল না। তবে জন্তুটির অদ্ভুত বর্ণনা অনেককে অন্য তত্ত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কেউ বলেন, এটি ছিল চিড়িয়াখানা থেকে পালানো কোনো হায়েনা বা সিংহ। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি নেকড়ে ও বড় কোনো কুকুরের সংকর (wolfdog) হতে পারে। একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো মানুষ বিকৃত মানসিকতা থেকে একটি জন্তুকে প্রশিক্ষণ দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, এবং জ্যঁ শ্যাসেল সেই ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলেন।

আজও জেভোদানের সেই জন্তু এক ঐতিহাসিক রহস্য হয়েই রয়ে গেছে। এটি কি সত্যিই কোনো অতিপ্রাকৃত অভিশাপ ছিল, নাকি মানুষের ভয় আর কল্পনার মিশ্রণে তৈরি এক কিংবদন্তি? সত্য যাই হোক না কেন, ‘লা বেত’ বা সেই ভয়ঙ্কর জন্তুর কাহিনী আজও ফ্রান্সের সেই পাহাড়ি অঞ্চলের বাতাসে এক শিহরণ জাগানো অধ্যায় হয়ে ভেসে বেড়ায়।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)