ঘটনার প্রেক্ষাপট
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনো শুকোয়নি। ১৯৫১ সালের গ্রীষ্মকাল। দক্ষিণ ফ্রান্সের গার্ড প্রদেশের পন্ট-সেন্ট-এসপ্রিট শহরটা যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক শান্ত ছবি। রাইন নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট শহর তার নাগরিকদের জন্য ছিল এক টুকরো শান্তির আশ্রয়। যুদ্ধোত্তর ইউরোপের অস্থিরতার মাঝেও এখানকার জীবনযাত্রা ছিল ধীর, শান্ত এবং ছিমছাম। শহরের মানুষগুলো একে অপরকে চিনত, তাদের সুখ-দুঃখগুলোও ছিল ভাগাভাগি করা। প্রতিদিন সকালে রশ ব্রায়ান্ডের বেকারি থেকে ভেসে আসা তাজা রুটির গন্ধটাই যেন শহরবাসীর দিন শুরু হওয়ার সঙ্কেত দিত। সেই রুটি ছিল তাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, নির্ভরতার প্রতীক। কিন্তু তারা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, তাদের সবচেয়ে বড় নির্ভরতার উৎসই হতে চলেছে তাদের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের কারণ। আগস্টের এক সকালে সেই রুটির ঘ্রাণের সাথেই যেন মিশে গিয়েছিল এক অশুভ অভিশাপের গন্ধ।
রহস্যের জাল
শুরুটা হয়েছিল খুবই সাধারণ অসুস্থতার মতো। ১৫ই আগস্ট, ১৯৫১। শহরের বেশ কিছু মানুষ পেটের ব্যথা, বমি আর মাথাব্যথার মতো উপসর্গ নিয়ে ভিড় জমাতে শুরু করে স্থানীয় ডাক্তারদের কাছে। প্রথমে সবাই ভেবেছিল, এটা সাধারণ ফুড পয়জনিং বা মৌসুমী কোনো অসুখ। কিন্তু দিন গড়ানোর সাথে সাথেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করে। ১৬ই আগস্টের পর থেকে রোগীদের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। সাধারণ অসুস্থতা বদলে যেতে থাকে এক ভয়ঙ্কর মানসিক বিকারগ্রস্ততায়।
মানুষজন ভয়ঙ্কর সব হ্যালুসিনেশনের শিকার হতে শুরু করে। কেউ দেখছিল তার শরীর থেকে লাল রঙের ফুল গজিয়ে উঠছে, কেউ দেখছিল তার হাত-পা বেয়ে ভয়ঙ্কর সাপ কিলবিল করছে। একজন মানুষ নিজেকে উড়োজাহাজ ভেবে দোতলার জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মারা যায়। আরেকজন ১১ বছর বয়সী বালক তার নিজের মাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার চেষ্টা করে। এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘আমার পেট সর্প দিয়ে ভর্তি!’ চারিদিকে শুধু আর্তনাদ, চিৎকার আর উন্মাদনার প্রতিধ্বনি। শান্ত শহরটা মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পরিণত হয় এক জীবন্ত নরকে। এই রাতকে স্থানীয়রা ‘নুই ডি’অ্যাপোক্যালিপ্স’ বা ‘সর্বনাশা রাত’ বলে আখ্যায়িত করেছিল।
শহরের হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। প্রায় ৫০ জন মানুষকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং শত শত মানুষ এই ভয়ঙ্কর উপসর্গে ভুগতে থাকে। মোট ৭ জনের মৃত্যু হয় এই ঘটনায়। তদন্ত শুরু হলে সবার সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে শহরের একমাত্র নির্ভরযোগ্য বেকারি, রশ ব্রায়ান্ডের দোকানের দিকে। দেখা যায়, যারা অসুস্থ হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই সেই বেকারির রুটি খেয়েছিল। তৎকালীন বিজ্ঞানীরা প্রাথমিক তদন্তের পর জানালেন, এর কারণ ‘এরগট’ (Ergot) নামক এক ধরনের ছত্রাক। রাইয়ের সাথে মিশে থাকা এই ছত্রাক থেকে তৈরি হওয়া আটার রুটি খেলে মানুষের মধ্যে হ্যালুসিনেশন, খিঁচুনিসহ নানা রকম মানসিক বিকার দেখা দিতে পারে, যা ইতিহাসে ‘সেন্ট অ্যান্থনি’স ফায়ার’ নামে পরিচিত। বেকার রশ ব্রায়ান্ডকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তাকে জেলে পাঠানো হয়।
আপাতদৃষ্টিতে রহস্যের সমাধান হয়ে গেলেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। ফ্রান্সের মতো দেশে, যেখানে খাদ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত, সেখানে কীভাবে এত বড় মাপের ছত্রাক সংক্রমণ হতে পারে? এরগট পয়জনিংয়ের ঘটনা ইউরোপে শেষবার ঘটেছিল উনবিংশ শতাব্দীতে। তাহলে হঠাৎ করে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এর পুনরাবৃত্তি কি শুধুই কাকতালীয় ছিল?
সত্যের উন্মোচন
কয়েক দশক ধরে এরগট পয়জনিংকেই এই ঘটনার মূল কারণ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে অনুসন্ধানী সাংবাদিক এইচ. পি. আলবারেলি জুনিয়র তার ‘এ টেরিবল মিস্টেক’ (A Terrible Mistake) নামক বইতে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, পন্ট-সেন্ট-এসপ্রিটের এই ঘটনা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-এর একটি ভয়ঙ্কর গোপন পরীক্ষা।
আলবারেলির গবেষণা অনুযায়ী, স্নায়ুযুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে সিআইএ ‘এমকেআলট্রা’ (MKULTRA) নামক এক গোপন প্রজেক্টের অধীনে মন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ড্রাগ নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিল। তারই অংশ হিসেবে পন্ট-সেন্ট-এসপ্রিটের সাধারণ মানুষের ওপর গোপনে এলএসডি (LSD) প্রয়োগ করা হয়েছিল। আলবারেলি কিছু ডিক্লাসিফায়েড সরকারি নথি খুঁজে পান, যেখানে পন্ট-সেন্ট-এসপ্রিটের ঘটনার উল্লেখ ছিল এবং সিআইএ-এর সাথে সুইজারল্যান্ডের স্যান্ডোজ কেমিক্যাল কোম্পানির (যেখানে এলএসডি প্রথম তৈরি হয়) যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। একটি নথিতে স্যান্ডোজের একজন কর্মকর্তার উক্তি পাওয়া যায়, যেখানে তিনি বলছেন, "পন্ট-সেন্ট-এসপ্রিটের আসল রহস্য হলো, এটি রুটির কারণে হয়নি... এটি এরগট ছিল না।"
এই তত্ত্ব প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থা কি সত্যিই অন্য একটি দেশের নিরীহ নাগরিকদের ওপর এমন ভয়ঙ্কর রাসায়নিক পরীক্ষা চালাতে পারে? যদিও সিআইএ কখনো এই অভিযোগ স্বীকার করেনি এবং অনেক বিজ্ঞানী এখনো এরগট তত্ত্বেই বিশ্বাসী, কিন্তু আলবারেলির তুলে ধরা প্রমাণগুলো এক অশুভ ষড়যন্ত্রের দিকেই ইঙ্গিত করে।
আজও পন্ট-সেন্ট-এসপ্রিটের সেই অভিশপ্ত রুটির রহস্যের কোনো definitive সমাধান হয়নি। এটি কি প্রকৃতির এক ভয়ঙ্কর খেয়াল ছিল, নাকি স্নায়ুযুদ্ধের আবহে ক্ষমতার লোভে পরিচালিত এক নির্মম انسانی পরীক্ষা? উত্তরটা হয়তো ইতিহাসের অন্ধকারেই চিরতরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু সেই ছোট্ট ফরাসি শহরের আকাশে নেমে আসা উন্মাদনার অভিশাপ আজও এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে রয়ে গিয়েছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)