প্রেমের দুনিয়ায় কত কিছুই না হয়! কেউ গিটার হাতে গান ধরে, তো কেউ লেখে কবিতা। কেউ আবার দামী উপহার দিয়ে মন জয়ের চেষ্টা করে। কিন্তু যদি বলি, এমনও এক জগৎ আছে যেখানে প্রেম বা রোম্যান্সের লেশমাত্র নেই, অথচ একে অপরকে ছাড়া এক মুহূর্তও চলে না! যেখানে একটাই চাহিদা - ‘শুধু একটু কাছে এসে বসো, আর মশা তাড়াও!’ আজ শোনাবো তেমনই এক অদ্ভুত সম্পর্কের গল্প।

এক অদ্ভুত ‘পারফিউম’ বিভ্রাট!

ভাবুন তো, জঙ্গলের মধ্যে একদল বাঁদর মনের সুখে জীবন কাটাচ্ছে। কিন্তু তাদের জীবনে একটাই সমস্যা - মশা! শুধু মশাই নয়, রয়েছে বটফ্লাই নামের এক ধরনের মাছি, যারা ত্বকের নিচে ডিম পেড়ে ভয়ানক ইনফেকশন ঘটায়। মানুষ হলে তো কত কিছুই না করতো! মশা তাড়ানোর স্প্রে, কয়েল, কত কী! কিন্তু জঙ্গলের এই বাসিন্দারা কী করবে?

এখানেই গল্পের আসল মজা! আমাদের গল্পের নায়ক, ক্যাপুচিন বাঁদর, এই সমস্যার এক অদ্ভুত সমাধান বের করেছে। তাদের জঙ্গলেই বাস করে এক ধরনের শুঁয়োপোকা বা মিলিপিড, যাদের শরীর থেকে এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ বের হয়। আর সেটাই হলো বাঁদরদের মশা তাড়ানোর অব্যর্থ ‘পারফিউম’!

ঘটনাটা হলো, ক্যাপুচিন বাঁদররা ইচ্ছে করে এই মিলিপিডদের বিরক্ত করে, তাদের শরীর থেকে বেনজোকুইনোন (benzoquinones) নামের এক রাসায়নিক বের করতে বাধ্য করে, যা কিনা দারুণ এক মশা তাড়ানোর ওষুধ!

ব্যাপারটা অনেকটা আমাদের পাড়ার রকবাজ ছেলেদের মতো, যারা দলবেঁধে গিটার বাজিয়ে সবাইকে বিরক্ত করে! কিন্তু এখানে বাঁদরের দল বিরক্ত করে নিজেদের সুরক্ষার জন্য। ওরা মিলিপিডদের ধরে সারা গায়ে ঘষতে থাকে। এই অদ্ভুত ‘মাসাজ’ এতটাই জনপ্রিয় যে কখনও কখনও চার-পাঁচটা বাঁদর মিলে একটা মিলিপিডকে ব্যবহার করে। ভাবা যায়!

এই ‘পারফিউম’ এতটাই কড়া যে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, এটি মানুষের তৈরি রিপেলেন্টের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। কিছু বিজ্ঞানী তো মজা করে নিজেরা এই মিলিপিডের রস ব্যবহার করতে গিয়ে যন্ত্রণায় প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন! অথচ বাঁদররা দিব্যি এই কেমিক্যাল গায়ে মেখে ঘুরে বেড়ায়। আসলে, একটু গা চুলকানি হলেও মশা বা মারাত্মক মাছির কামড়ের চেয়ে তা অনেক ভালো!

এই গল্পে কোনো প্রেম নেই, নেই কোনো রোম্যান্টিক গান। যা আছে, তা হলো টিকে থাকার এক অদ্ভুত কৌশল আর বন্ধুত্বের এক মিষ্টি উদাহরণ। যেখানে একজন আরেকজনের কাছে আসে, শুধুমাত্র একটু নিরাপদ থাকার জন্য, একটু আরামে বাঁচার জন্য। ওরা একে অপরকে ব্যবহার করে, কিন্তু সেখানে কোনো ছলনা নেই, আছে শুধু একে অপরের প্রতি নির্ভরতা।

ভালোবাসার মানে তো শুধু প্রেম বা আকর্ষণ নয়। কখনও কখনও দুটো প্রাণী শুধু একে অপরকে সঙ্গ দেয়, কারণ তারা জানে, একসাথে থাকলে অনেক বিপদ এড়িয়ে যাওয়া যায়। ক্যাপুচিন বাঁদর আর মিলিপিডের এই অদ্ভুত সম্পর্ক আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। যেখানে স্বার্থ আছে, কিন্তু সেই স্বার্থের পেছনে লুকিয়ে আছে বন্ধুত্বের এক মিষ্টি আবদার - ‘তুমি থাকলে, আর কোনো ভয় নেই!’