ঘটনার প্রেক্ষাপট
অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরু। প্রাশিয়ার রাজা প্রথম ফ্রেডরিক এক অবিশ্বাস্য স্বপ্ন দেখলেন। তিনি এমন একটি ঘর তৈরি করতে চাইলেন যা সোনার চেয়েও দামী, যার প্রতিটি দেওয়াল থেকে ঠিকরে পড়বে অপার্থিব আলো। রাজার এই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে এগিয়ে এলেন জার্মানির শ্রেষ্ঠ ভাস্কর আন্দ্রেয়াস শ্লুটার এবং ডেনমার্কের অ্যাম্বার শিল্পী গটফ্রিড উলফ্র্যাম। শুরু হলো এক ঐতিহাসিক শিল্পকর্মের জন্ম। ছয় টনেরও বেশি অ্যাম্বার, সোনা এবং মূল্যবান পাথর দিয়ে তৈরি হলো সেই আশ্চর্য ঘর—'অ্যাম্বার রুম'। এর দেয়ালগুলো এমনভাবে তৈরি হয়েছিল যে মোমবাতির আলোয় পুরো ঘরটি এক জ্বলন্ত সোনার মতো আভায় ভরে উঠত। একে দেখে মানুষ বলত—এ তো পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য! ১৭১৬ সালে, প্রাশিয়ার রাজা রাশিয়ার জার পিটার দ্য গ্রেটের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তির নিদর্শন হিসেবে এই অবিশ্বাস্য ঘরটি তাকে উপহার দেন। এরপর প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এই ঘরটি সেন্ট পিটার্সবার্গের কাছে ক্যাথরিন প্যালেসের শোভা বাড়িয়েছিল। কিন্তু কেউ জানত না, এই আশ্চর্য সুন্দর শিল্পকর্মের ভাগ্যে লেখা ছিল এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়।
রহস্যের জাল
১৯৪১ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নে। হিটলারের নাৎসি বাহিনী দানবের মতো এগিয়ে আসছে লেলিনগ্রাদের দিকে। ক্যাথরিন প্যালেসের কিউরেটররা প্রমাদ গুনলেন। তারা বুঝতে পারলেন, এই ভয়ংকর যুদ্ধের হাত থেকে 'অ্যাম্বার রুম'-কে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। তারা ঘরটি খুলে ফেলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু বহু বছরের পুরনো অ্যাম্বারের প্যানেলগুলো শুকিয়ে ভঙ্গুর হয়ে গিয়েছিল। সামান্য আঘাতেই ভেঙে গুঁড়িয়ে যাওয়ার ভয়। উপায় না দেখে, তাঁরা সাধারণ ওয়ালপেপার দিয়ে পুরো ঘরটি ঢেকে দিলেন, এই আশায় যে নাৎসিদের চোখে হয়তো পড়বে না।
কিন্তু তাদের চালাকি কাজে এলো না। নাৎসিরা আগে থেকেই জানত এই গুপ্তধনের কথা। মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে জার্মান সেনারা ঘরটি খুলে ফেলে এবং বাক্সবন্দী করে জার্মানির কোনিগসবার্গ (বর্তমানে কালিনিনগ্রাদ) শহরের ক্যাসলে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে ঘরটিকে আবার নতুন করে সাজানো হয়। কিন্তু যুদ্ধের মোড় ঘুরতে শুরু করে। ১৯৪৪ সালের দিকে মিত্রশক্তির আক্রমণে কোনিগসবার্গ যখন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত, তখন নাৎসিরা আবার ঘরটি খুলে ফেলে এবং ক্যাসেলের বেসমেন্টে লুকিয়ে রাখে। এরপর? এরপর সবটাই যেন এক গভীর কুয়াশা। ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে সোভিয়েত সেনারা যখন কোনিগসবার্গ দখল করে, তখন সেই ক্যাসেল ছিল প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। তারা তন্নতন্ন করে খুঁজেও অ্যাম্বার রুমের কোনো চিহ্ন পায়নি। পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল!
সত্যের উন্মোচন
অ্যাম্বার রুমের কী পরিণতি হয়েছিল, সেই রহস্যের সমাধান আজও হয়নি। সবচেয়ে প্রচলিত তত্ত্বটি হলো, কোনিগসবার্গের উপর মিত্রশক্তির বিমান হামলায় ক্যাসেলটি ধ্বংস হওয়ার সময় ঘরটিও চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। রাশিয়ার জাতীয় আর্কাইভের দস্তাবেজও এই তত্ত্বকেই সমর্থন করে। অনেকে আবার বিশ্বাস করেন, নাৎসিরা এটিকে কোনো গোপন বাঙ্কারে লুকিয়ে রেখেছিল অথবা কোনো জাহাজে করে সরিয়ে ফেলার সময় তা সমুদ্রে ডুবে যায়। বছরের পর বছর ধরে বহু গুপ্তধন শিকারি এর সন্ধান করেছেন, কিন্তু ফলাফল শূন্য।
যদিও আসল ঘরটি হারিয়ে গেছে, তার আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। ১৯৭৯ সালে, রাশিয়া সরকার ঐতিহাসিক ছবি এবং নকশার উপর ভিত্তি করে অ্যাম্বার রুমটিকে নতুন করে তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। দীর্ঘ ২৪ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর, ২০০৩ সালে ক্যাথরিন প্যালেসে সেই নতুন অ্যাম্বার রুমের দরজা দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। নতুন ঘরটি পুরনোটির মতোই জাঁকজমকপূর্ণ, কিন্তু ইতিহাসের সেই হারিয়ে যাওয়া আশ্চর্যকে নিয়ে রহস্যের জাল আজও অটুট। কোথায় হারিয়ে গেল সেই ছয় টন অ্যাম্বার আর সোনার ঐশ্বর্য? উত্তরটা হয়তো সময়ের অতল গহ্বরেই চিরতরে চাপা পড়ে গেছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)