ঘটনার প্রেক্ষাপট

১৮৮০ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি। কানাডার অন্টারিওর লুসান শহরের আকাশ ছিল বরফ-শীতল। বাইরে কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর ঘন অন্ধকারে ঢেকে ছিল চারপাশ, কিন্তু জেমস ডোনেলি আর তার পরিবারের জন্য সেই রাতটি ছিল আর পাঁচটা রাতের মতোই সাধারণ। তারা জানত না, এই রাতেই তাদের খামারে নেমে আসতে চলেছে এক নারকীয় তাণ্ডব, যা কানাডার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ডোনেলি পরিবার আয়ারল্যান্ড থেকে কানাডায় এসেছিল ভাগ্য ফেরাতে। কিন্তু ভাগ্য তাদের সঙ্গে ছিল না। জমি নিয়ে বিবাদ, ব্যবসায়িক শত্রুতা এবং তাদের একরোখা স্বভাবের কারণে গোটা এলাকার মানুষ তাদের শত্রু হয়ে উঠেছিল। একের পর এক অপরাধমূলক কাজে তাদের নাম জড়াতে থাকে, যদিও তার বেশিরভাগই ছিল ভিত্তিহীন অভিযোগ। স্থানীয়দের চোখে ডোনেলিরা ছিল সাক্ষাৎ শয়তানের প্রতিরূপ। এই ঘৃণা আর ক্ষোভই সেই ভয়ঙ্কর রাতের মঞ্চ প্রস্তুত করেছিল।

রহস্যের জাল

সেই রাতে প্রায় ৩০ জনের একদল লোক, যারা নিজেদের ‘ভিজিল্যান্স কমিটি’ বা সতর্কমূলক দল বলে পরিচয় দিত, মশাল ও ধারালো অস্ত্র হাতে ডোনেলিদের খামারের দিকে এগিয়ে যায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই - ডোনেলি পরিবারকে চিরতরে শেষ করে দেওয়া। খামারে পৌঁছে তারা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ।

জেমস ডোনেলি, তার স্ত্রী জোহানা, ছেলে টম ও জন এবং তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসা ভাইঝি ব্রিজেটকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হয় কুঠার আর শাবলের আঘাতে। এরপর আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় গোটা খামারে, যাতে সব প্রমাণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এমনকি সেই রাতে ডোনেলিদের অন্য এক ছেলেও আততায়ীদের হাতে খুন হয়। সেই রাতের সাক্ষী ছিল শুধু ১১ বছরের এক কিশোর, জনি ও'কনর, যে কোনওক্রমে লুকিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছিল।

সত্যের উন্মোচন

এই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের পর গোটা কানাডা স্তম্ভিত হয়ে যায়। জনি ও'কনরের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, দুটি পৃথক বিচার সত্ত্বেও কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি। স্থানীয় মানুষ এতটাই ঐক্যবদ্ধ ছিল যে, তারা আততায়ীদের পরিচয় জেনেও মুখ খোলেনি। সাক্ষীদের হুমকি দেওয়া হয় এবং প্রমাণ লোপাট করে ফেলা হয়।

আইনের চোখে খুনিরা শাস্তি পায়নি, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনা ‘ব্ল্যাক ডোনেলিস ম্যাসাকার’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। আজও লুসান শহরের আকাশে কান পাতলে যেন শোনা যায় সেই রাতের কান্না আর আর্তনাদ। ডোনেলিরা কি সত্যিই অতটা অপরাধী ছিল, যতটা তাদের ভাবা হতো? নাকি তারা ছিল নিছকই প্রতিবেশীদের হিংসা আর ষড়যন্ত্রের শিকার? এই প্রশ্নের উত্তর আজও পুরোপুরি মেলেনি। রয়ে গেছে শুধু এক অমীমাংসিত রহস্য আর এক পরিবারের মর্মান্তিক পরিণতি।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)