বিষয়ের ভূমিকা
গণতন্ত্রের কথা ভাবলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে নির্বাচন, সরকার, নেতা-নেত্রী এবং বিভিন্ন দলের পতাকা-স্লোগানের ছবি। এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজনৈতিক দল। দশম শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়টি আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। রাজনৈতিক দল ছাড়া আধুনিক গণতন্ত্র প্রায় অকল্পনীয়। কেন তাদের এত গুরুত্ব? তারা কীভাবে কাজ করে? একটি দেশে কতগুলো দল থাকা উচিত? এই সমস্ত মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি বিস্তারিত সফর হল এই অধ্যায়টি।
রাজনৈতিক দলগুলি কেবল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তৈরি কিছু মানুষের গোষ্ঠী নয়, বরং তারা সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের মতামত, দাবি এবং স্বার্থকে একত্রিত করে সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম। তারা একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ এবং সরকারের মধ্যে সেতুর মতো কাজ করে, তেমনই অন্যদিকে দেশের নীতি নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন এবং শাসনব্যবস্থাকে সচল রাখতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। এই অধ্যায়ে আমরা রাজনৈতিক দলের অর্থ, তাদের বিভিন্ন কাজ, গণতন্ত্রে তাদের প্রয়োজনীয়তা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচলিত দলীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীরভাবে জানব। বিশেষ করে, ভারতের মতো বিশাল এবং বৈচিত্র্যময় দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং তাদের প্রকারভেদ সম্পর্কে আমরা একটি স্বচ্ছ ধারণা লাভ করব। চলুন, গণতন্ত্রের এই 'প্রাণভোমরা'-দের কার্যকলাপ এবং তাদের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
রাজনৈতিক দল কাকে বলে?
সহজ কথায়, একটি রাজনৈতিক দল হল এমন একদল সংগঠিত নাগরিক যারা কিছু সাধারণ নীতি ও আদর্শে বিশ্বাস করে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মাধ্যমে সরকারি ক্ষমতা দখল করতে চায়। তাদের মূল উদ্দেশ্য হল নিজেদের নীতি ও কর্মসূচিগুলিকে সরকারি নীতিতে রূপান্তরিত করা এবং দেশের শাসনকার্য পরিচালনা করা। একটি রাজনৈতিক দল সমাজের সম্মিলিত স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে।
যেকোনো রাজনৈতিক দলের প্রধানত তিনটি অংশ থাকে:
- নেতা (The Leaders): দলের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা, যারা দলের নীতি নির্ধারণ করেন, নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই করেন এবং সরকার গঠন হলে গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণ করেন। যেমন - দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ইত্যাদি।
- সক্রিয় সদস্য (The Active Members): এরা হলেন দলের একনিষ্ঠ কর্মী, যারা দলের কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নেন, প্রচার চালান, সভা-সমাবেশে যোগ দেন এবং নেতাদের নির্দেশ মেনে চলেন। দলের ভিত্তিস্তরের সংগঠন এদের হাত ধরেই শক্তিশালী হয়।
- অনুগামী বা সমর্থক (The Followers): এরা হলেন সাধারণ নাগরিক, যারা কোনো নির্দিষ্ট দলের আদর্শ বা নীতির প্রতি আস্থা রাখেন এবং নির্বাচনে সেই দলকে ভোট দেন। তারা দলের সদস্য না হলেও মানসিকভাবে দলের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
এই তিনটি অংশের সমন্বয়েই একটি রাজনৈতিক দল পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়।
রাজনৈতিক দলের কাজ কী?
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে। তাদের কাজগুলি কেবল সরকার গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে তাদের প্রভাব বিস্তৃত থাকে। নীচে রাজনৈতিক দলগুলির প্রধান কাজগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল:
- নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা (Contesting Elections): রাজনৈতিক দলগুলির সবচেয়ে প্রাথমিক এবং দৃশ্যমান কাজ হল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। দলগুলি তাদের মধ্য থেকে যোগ্য প্রার্থীদের মনোনীত করে এবং নির্বাচনে জয়লাভের জন্য সবরকম প্রচেষ্টা চালায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু দেশে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া দলের সদস্য এবং সমর্থকদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা 'প্রাইমারি' নামে পরিচিত। কিন্তু ভারতের মতো দেশে দলের শীর্ষ নেতারাই প্রার্থী চূড়ান্ত করেন।
- নীতি ও কর্মসূচি प्रस्तुत করা (Putting forward Policies and Programmes): প্রতিটি রাজনৈতিক দল দেশের বিভিন্ন সমস্যা (যেমন - অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদেশনীতি) সম্পর্কে তাদের নিজস্ব মতামত ও সমাধানসূত্র জনগণের সামনে তুলে ধরে। এগুলিকে বলা হয় দলের নীতি বা কর্মসূচি। নির্বাচনের আগে তারা একটি 'ইস্তাহার' (Manifesto) প্রকাশ করে, যেখানে তারা ক্ষমতায় এলে কী কী কাজ করবে তার প্রতিশ্রুতি দেয়। ভোটাররা বিভিন্ন দলের নীতি ও কর্মসূচির মধ্যে তুলনা করে তাদের পছন্দের দলকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়।
- আইন প্রণয়নে ভূমিকা (Making Laws): দেশের জন্য আইন তৈরি হয় আইনসভায় (যেমন - ভারতের সংসদ বা রাজ্যের বিধানসভা)। আইনসভার অধিকাংশ সদস্যই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি। কোনো বিল বা আইন পাশ করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। দলের নির্দেশ বা 'হুইপ' (Whip) মেনে সদস্যরা বিলের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেন। তাই, আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াটি মূলত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামতের উপর নির্ভরশীল।
- সরকার গঠন ও পরিচালনা করা (Forming and Running Governments): নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তারা সরকার গঠন করে এবং দেশ পরিচালনা করে। দলীয় নেতারা মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তর চালান। দল তার ইস্তাহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশ শাসনের চেষ্টা করে। যদি কোনো একটি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তখন একাধিক দল মিলে 'জোট সরকার' (Coalition Government) গঠন করে।
- বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা (Playing the Role of Opposition): নির্বাচনে যারা হেরে যায়, তারা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা সরকারের ভুল নীতি ও ব্যর্থতার সমালোচনা করে, সরকারের স্বৈরাচারী প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং জনস্বার্থ বিরোধী কাজের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারকে সর্বদা সজাগ ও দায়িত্বশীল রাখতে সাহায্য করে।
- জনমত গঠন করা (Shaping Public Opinion): রাজনৈতিক দলগুলি বিভিন্ন મુદ્દા তুলে ধরে এবং সেগুলির উপর জনমত গঠনে সাহায্য করে। তারা সভা-সমিতি, মিছিল, প্রচারমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রচার করে। অনেক সময় সমাজের বিভিন্ন সমস্যাকে তারা জাতীয় স্তরের আলোচনায় নিয়ে আসে। দলের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী (Pressure Groups) এবং আন্দোলনও জনমত গঠনে সহায়তা করে।
- সরকারি সুযোগ-সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া (Providing Access to Government Machinery): সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি দপ্তর বা আধিকারিকদের কাছে পৌঁছানো অনেক সময় কঠিন হয়। এক্ষেত্রে, স্থানীয় স্তরের দলীয় নেতারা সাধারণ মানুষ এবং সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে একটি যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেন। মানুষ সহজেই তাদের সমস্যার কথা স্থানীয় নেতার মাধ্যমে সরকারি আধিকারিকদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। এর ফলে, সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়।
রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা কেন?
আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। কেন তাদের ছাড়া গণতন্ত্র চলতে পারে না, তা বোঝার জন্য আমাদের একটি দলবিহীন পরিস্থিতি কল্পনা করতে হবে।
- দলবিহীন গণতন্ত্রের সমস্যা: যদি কোনো রাজনৈতিক দল না থাকত, তাহলে নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থী হতেন নির্দল বা স্বাধীন। সেক্ষেত্রে, কোনো প্রার্থীই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য বড় কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারতেন না, কারণ তাদের নীতিকে সমর্থন করার জন্য কোনো সংগঠিত গোষ্ঠী থাকত না। সরকার গঠিত হলেও তা হত অত্যন্ত অস্থায়ী, কারণ বিভিন্ন নির্দল সদস্যদের সমর্থন নিয়ে সরকার চালানো খুব কঠিন। প্রত্যেকে নিজের এলাকার স্বার্থ দেখত, দেশের স্বার্থ গৌণ হয়ে যেত।
- নীতির সমন্বয় ও প্রতিনিধিত্ব: রাজনৈতিক দলগুলি সমাজের লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মতামতকে একত্রিত করে কয়েকটি মূল নীতি ও কর্মসূচিতে পরিণত করে। তারা এই সমন্বিত মতামতকে সরকারের সামনে তুলে ধরে। দল না থাকলে, এত বিশাল এবং বৈচিত্র্যময় মতামতকে একত্রিত করা সম্ভব হত না।
- দায়বদ্ধ সরকার গঠন: রাজনৈতিক দলগুলি একটি দায়বদ্ধ বা দায়িত্বশীল সরকার গঠনের জন্য অপরিহার্য। যখন একটি দল সরকার গঠন করে, তখন সেই দলটি তার সমস্ত কাজের জন্য জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। যদি সরকার ব্যর্থ হয়, তাহলে মানুষ পরবর্তী নির্বাচনে সেই দলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু নির্দল প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই সম্মিলিত দায়বদ্ধতা থাকে না।
- বিতর্ক ও আলোচনার মঞ্চ: রাজনৈতিক দলগুলি দেশের বড় বড় সমস্যাগুলি নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনার একটি মঞ্চ তৈরি করে। তারা বিভিন্ন বিকল্প নীতির প্রস্তাব দেয়, যা থেকে জনগণ সেরা বিকল্পটি বেছে নিতে পারে। এটি একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করে।
সুতরাং, এটা স্পষ্ট যে রাজনৈতিক দলগুলি গণতন্ত্রের একটি আবশ্যিক শর্ত। তারা গণতন্ত্রের যন্ত্রকে সচল রাখে এবং সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণকে অর্থবহ করে তোলে।
দলীয় ব্যবস্থা: কত ধরণের হয়?
বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে বিভিন্ন ধরণের দলীয় ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। কোনো দেশে কতগুলো প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল রয়েছে, তার উপর ভিত্তি করে দলীয় ব্যবস্থাকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. একদলীয় ব্যবস্থা (One-Party System)
এই ব্যবস্থায় শুধুমাত্র একটি দলকেই দেশ শাসন করার এবং সরকার গঠন করার অনুমতি দেওয়া হয়। অন্য কোনো দল গঠন বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আইনি অধিকার থাকে না। এটি কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়, কারণ এখানে জনগণের কাছে কোনো বিকল্প থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, চিনে কেবল কমিউনিস্ট পার্টির শাসন করার অধিকার রয়েছে। যদিও আইনত সেখানে ছোট ছোট কিছু দলের অস্তিত্ব আছে, কিন্তু তারা কমিউনিস্ট পার্টির অধীনেই কাজ করে।
২. দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা (Two-Party System)
এই ব্যবস্থায় ক্ষমতা প্রধানত দুটি দলের মধ্যে আবর্তিত হয়। যদিও আরও অনেক ছোট দল থাকতে পারে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে এবং কিছু আসনও জিততে পারে, কিন্তু সরকার গঠনের বাস্তবসম্মত সুযোগ কেবল প্রধান দুটি দলেরই থাকে। বাকি দলগুলির প্রভাব সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং রিপাবলিকান পার্টি হল দুটি প্রধান দল। একইভাবে, যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যেই ক্ষমতার মূল লড়াই হয়।
৩. বহুদলীয় ব্যবস্থা (Multi-Party System)
যখন নির্বাচনে জয়ের জন্য একাধিক দলের সমান সুযোগ থাকে এবং সরকার গঠনে দুইয়ের বেশি দলের ভূমিকা থাকে, তখন তাকে বহুদলীয় ব্যবস্থা বলা হয়। এই ব্যবস্থায়, প্রায়শই কোনো একটি দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না। ফলে, একাধিক দল একত্রিত হয়ে 'জোট' (Alliance or Front) গঠন করে এবং সরকার পরিচালনা করে। এই ধরনের সরকারকে 'জোট সরকার' (Coalition Government) বলা হয়।
ভারত বহুদলীয় ব্যবস্থার একটি আদর্শ উদাহরণ। এখানে বহু জাতীয় এবং আঞ্চলিক দল রয়েছে। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভারতে দুটি প্রধান জোট তৈরি হয়েছিল - ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (NDA) এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট (UPA)। এই ব্যবস্থা সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেয়, কিন্তু অনেক সময় জোট সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে রাজনৈতিক अस्थिरতা দেখা দিতে পারে।
জাতীয় দল এবং রাজ্যস্তরের দল (National and State Parties)
ভারতের মতো একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় দেশে দুই ধরণের রাজনৈতিক দল দেখা যায় - জাতীয় দল এবং রাজ্য বা আঞ্চলিক দল। ভারতের নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India) কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের ভিত্তিতে দলগুলিকে এই স্বীকৃতি দেয়।
জাতীয় দল (National Party)
একটি দলকে 'জাতীয় দল' হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে নিম্নলিখিত শর্তগুলির যেকোনো একটি পূরণ করতে হয়:
- দলটি যদি লোকসভা নির্বাচনে বা চারটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৬% পায় এবং লোকসভায় অন্তত ৪টি আসন জেতে।
- দলটি যদি লোকসভা নির্বাচনে মোট আসনের অন্তত ২% (অর্থাৎ, ১১টি আসন) জেতে এবং এই আসনগুলি অন্তত তিনটি ভিন্ন রাজ্য থেকে জিততে হয়।
- দলটি যদি অন্তত চারটি রাজ্যে 'রাজ্য দল' (State Party) হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে স্বীকৃত জাতীয় দলগুলির মধ্যে রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP), ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (INC), বহুজন সমাজ পার্টি (BSP), ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) (CPI(M)), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (NPP) এবং আম আদমি পার্টি (AAP)।
রাজ্য বা আঞ্চলিক দল (State or Regional Party)
একটি দলকে 'রাজ্য দল' হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে নিম্নলিখিত শর্তগুলির যেকোনো একটি পূরণ করতে হয়:
- দলটি যদি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৬% পায় এবং অন্তত ২টি আসন জেতে।
- দলটি যদি রাজ্যের লোকসভা নির্বাচনে মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৬% পায় এবং রাজ্য থেকে অন্তত ১টি লোকসভা আসন জেতে।
- দলটি যদি বিধানসভা নির্বাচনে মোট আসনের অন্তত ৩% বা অন্তত ৩টি আসন (যেটি বেশি) জেতে।
- রাজ্য থেকে লোকসভার প্রতি ২৫টি আসনের মধ্যে অন্তত ১টি আসন জিতলে।
রাজ্যস্তরের দলগুলি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা রাজ্যের স্বার্থ নিয়ে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC), তামিলনাড়ুতে দ্রাবিড় মুনেত্রা কাঝাগাম (DMK), অন্ধ্রপ্রদেশে তেলেগু দেশম পার্টি (TDP) ইত্যাদি হল প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল। ভারতীয় রাজনীতিতে এই দলগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে জোট সরকারের যুগে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: বিরোধী দলের প্রধান কাজ কী?
উত্তর: গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রধান কাজগুলি হল: (ক) সরকারের নীতি ও কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করা, (খ) সরকারের ভুলত্রুটি এবং ব্যর্থতা জনগণের সামনে তুলে ধরা, (গ) জনস্বার্থ বিরোধী কোনো আইন বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, (ঘ) বিকল্প নীতি ও কর্মসূচি प्रस्तुत করা এবং (ঙ) সরকারকে স্বৈরাচারী হওয়া থেকে বিরত রাখা এবং দায়িত্বশীল থাকতে বাধ্য করা। একটি শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র অসম্পূর্ণ।
প্রশ্ন ২: জোট সরকার (Coalition Government) বলতে কী বোঝায়? এর সুবিধা ও অসুবিধা কী?
উত্তর: যখন একটি বহুদলীয় ব্যবস্থায় কোনো একটি দল নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না, তখন দুই বা ততোধিক দল একত্রিত হয়ে সরকার গঠন করে। এই ধরনের সরকারকে জোট সরকার বলে।
সুবিধা: জোট সরকার বিভিন্ন আঞ্চলিক ও সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। এর ফলে, সরকারের নীতিতে বিভিন্ন মতামতের প্রতিফলন ঘটে।
অসুবিধা: জোট সরকারের প্রধান অসুবিধা হল রাজনৈতিক अस्थिरতা। শরিক দলগুলির মধ্যে মতবিরোধের কারণে সরকারের পতন ঘটার সম্ভাবনা থাকে। অনেক সময় নীতি নির্ধারণে দেরি হয় এবং শক্তিশালী সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন ৩: রাজনৈতিক দলগুলির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলি কী কী?
উত্তর: ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলি বর্তমানে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলি হল: (ক) দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব: অনেক দলেই শীর্ষ নেতৃত্বের হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে এবং সাধারণ কর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। (খ) বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার: অনেক দলেই একটি নির্দিষ্ট পরিবারের সদস্যরা বংশানুক্রমে দলের শীর্ষ পদগুলি দখল করে রাখে, যা যোগ্য নেতাদের উঠে আসতে বাধা দেয়। (গ) অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব: নির্বাচনে জেতার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের ব্যবহার এবং অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রার্থী করা একটি বড় সমস্যা। (ঘ) আদর্শগত পার্থক্য হ্রাস: বর্তমানে অনেক দলের মধ্যেই আদর্শগত পার্থক্য কমে আসছে, যার ফলে ভোটারদের কাছে অর্থপূর্ণ কোনো বিকল্প থাকছে না।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায় থেকে আমরা গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলির অপরিহার্য ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারলাম। আসুন, মূল বিষয়গুলি আর একবার দেখে নিই:
- রাজনৈতিক দল: এটি এমন একটি সংগঠন যা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে নিজেদের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চায়। এর তিনটি অংশ - নেতা, সক্রিয় সদস্য এবং সমর্থক।
- প্রধান কাজ: দলগুলি নির্বাচনে অংশ নেয়, নীতি নির্ধারণ করে, আইন তৈরি করে, সরকার গঠন ও পরিচালনা করে, বিরোধী ভূমিকা পালন করে, জনমত গঠন করে এবং জনগণের সঙ্গে সরকারের সংযোগ স্থাপন করে।
- প্রয়োজনীয়তা: রাজনৈতিক দল ছাড়া একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র অচল। তারা একটি দায়বদ্ধ সরকার গঠন করে এবং সমাজের বিভিন্ন মতামতকে একত্রিত করে।
- দলীয় ব্যবস্থা: প্রধানত তিন প্রকার - একদলীয় (অগণতান্ত্রিক), দ্বি-দলীয় (যেমন - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) এবং বহুদলীয় (যেমন - ভারত)।
- ভারতের দলীয় ব্যবস্থা: ভারতে বহুদলীয় ব্যবস্থা প্রচলিত। নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি অনুযায়ী দলগুলিকে জাতীয় দল এবং রাজ্য বা আঞ্চলিক দলে ভাগ করা হয়।
রাজনৈতিক দলগুলির অনেক সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, এরাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের অংশগ্রহণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক দলগুলির অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং তাদের কার্যপদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনা অত্যন্ত জরুরি।