আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো, ভালোবাসা বা সঙ্গ পাওয়ার ইচ্ছেটা কি শুধু আমাদের মানুষদেরই একচেটিয়া? মাঝে মাঝে রাতের আকাশে একা চাঁদটাকে দেখে বা কোনো বৃষ্টির দুপুরে জানলার কাঁচের ওপারে তাকিয়ে আপনারও কি মনে হয় না, ‘ইশ! পাশে যদি কেউ থাকতো!’ এই একাকীত্বের অনুভূতিটা আমাদের সবার মধ্যেই কমবেশি আছে। আমরা সবাই জীবনে এমন একজনকে খুঁজি, যার সাথে মন খুলে কথা বলা যায়, যার কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। কিন্তু যদি এমন হয় যে, এই একা থাকাটা শুধু মনের ব্যাপার নয়, রীতিমতো একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ? যদি এমন কোনো দেশ থাকে, যেখানে আইন করে একাকীত্বকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে?
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, কিছুটা কমেডি আর অনেকটাই ভালোবাসায় মোড়া এমনই এক আইন রয়েছে সুইজারল্যান্ডে। তবে এই আইনটা আমাদের, অর্থাৎ মানুষদের জন্য নয়। এই আইন তাদের জন্য, যারা আকারে ছোট, কিন্তু ভালোবাসার ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে কোনো অংশে কম যায় না। এই আইনের মিষ্টি শিকার হলো পৃথিবীর অন্যতম আদুরে প্রাণী - গিনিপিগ!
একাকীত্বের বিরুদ্ধে সুইজারল্যান্ডের অদ্ভুত মিষ্টি যুদ্ধ!
আপনি হয়তো ভাবছেন, একটা পোষ্যকে নিয়ে আবার এত নিয়মকানুনের কী আছে! কিন্তু সুইস সরকার এই বিষয়ে আমাদের চেয়ে কয়েক কাঠি এগিয়ে। তাদের মতে, ভালোবাসা আর সঙ্গ পাওয়ার অধিকার শুধু মানুষের নয়, প্রতিটি প্রাণীরই আছে। আর সেই ভাবনা থেকেই ২০০৮ সালে তারা এক যুগান্তকারী পশু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের মূল কথাই হলো, যে সমস্ত প্রাণী اجتماعي বা দলবদ্ধভাবে থাকতে ভালোবাসে, তাদের একা রাখা যাবে না। আর এই সামাজিক প্রাণীদের তালিকার প্রথমেই রয়েছে আদরের গিনিপিগ।
সুইজারল্যান্ডে, শুধুমাত্র একটি গিনিপিগ রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি! কারণ, সুইস আইন অনুযায়ী, এই সামাজিক প্রাণীদের জন্য একাকীত্ব এক ধরনের মানসিক নির্যাতন। তাই আইনত, আপনাকে অন্তত একজোড়া গিনিপিগ পুষতেই হবে।
ব্যাপারটা হঠাৎ শুনলে বেশ মজাই লাগে। মনে হয়, যেন কোনো রোমান্টিক কমেডি সিনেমার প্লট। কিন্তু এর পেছনের কারণটা কিন্তু খুবই গভীর এবং সংবেদনশীল। গিনিপিগরা প্রকৃতিগতভাবেই খুব সামাজিক প্রাণী। বন্য পরিবেশে তারা ১০-১২ জনের ছোট ছোট দলে একসাথে বাস করে। একে অপরের সাথে কথা বলা, একসাথে খাওয়া, খেলা করা - এটাই তাদের স্বাভাবিক জীবন। যখন আমরা শখ করে একটা গিনিপিগকে কিনে এনে একা একটা খাঁচায় রেখে দিই, তখন আসলে অজান্তেই আমরা তাকে তার পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিই। ফলে, সে একাকীত্ব এবং অবসাদে ভুগতে শুরু করে, যা তার স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সুইজারল্যান্ডের এই আইনটি আসলে সেই বোবা প্রাণীগুলোর মানসিক স্বাস্থ্যের কথাই ভাবে।
শুধু গিনিপিগই নয়, এই আইনের আওতায় টিয়াপাখি, গোল্ডফিশ এবং আরও কিছু সামাজিক প্রাণীও রয়েছে। যেমন, একটি টিয়াপাখিকে একা রাখতে পারবেন না, তার জন্য একজন সঙ্গী আবশ্যক, যাতে সে নিয়মিতভাবে অন্য পাখির সাথে কথা বলতে পারে। এমনকি অ্যাকোয়ারিয়ামে একা একটা গোল্ডফিশ রাখাও সেখানে നിയമവിരുദ്ധ। ভাবুন তো, কী অসাধারণ মানবিক এক ভাবনা!
যদি সঙ্গী মারা যায়? ভালোবাসার এই ‘ঘটকালি’ পরিষেবা!
এখন আপনার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসছে, সবই তো বুঝলাম, কিন্তু দুটো গিনিপিগের মধ্যে যদি একটা বয়সের কারণে বা অসুস্থ হয়ে মারা যায়, তখন কী হবে? তাহলে কি পুলিশ এসে অপর গিনিপিগের মালিককে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবে? এখানেই গল্পের সবচেয়ে মজার এবং মিষ্টি অংশটা লুকিয়ে আছে।
এই সমস্যার সমাধানের জন্য সুইজারল্যান্ডে গড়ে উঠেছে অভিনব এক পরিষেবা - ‘গিনিপিগ ভাড়া দেওয়ার এজেন্সি’! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। আপনার সঙ্গীহীন হয়ে পড়া একাকী গিনিপিগের জন্য আপনি একজন নতুন বন্ধু বা সঙ্গী ভাড়া করে আনতে পারবেন। বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে যারা বিধবা বা বিপত্নীক গিনিপিগদের জন্য নতুন সঙ্গী খুঁজে দেওয়ার কাজ করে। অনেকটা আমাদের দেশের ‘ম্যাচমেকিং’ বা ঘটকালি পরিষেবার মতোই।
এই এজেন্সিগুলো আপনার বয়স্ক গিনিপিগের জন্য তার মেজাজ ও বয়স অনুযায়ী একজন মানানসই সঙ্গী খুঁজে দেয়। কারণ, একটা বয়স্ক, শান্তশিষ্ট গিনিপিগের সাথে খুব অল্পবয়সী বা ছটফটে সঙ্গীকে দিলে তাদের মধ্যে বনিবনা নাও হতে পারে। তাই এই ‘ডেটিং’ সেশনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, তারা একে অপরকে পছন্দ করছে কিনা। আপনার নিঃসঙ্গ প্রাণীটি তার জীবনের শেষ দিনগুলো যাতে একাকীত্বে না কাটায়, তার জন্যই এই অভিনব ব্যবস্থা। আর যখন আপনার পোষ্যটিও মারা যাবে, আপনি চাইলে সেই ভাড়া করা সঙ্গীটিকে এজেন্সিতে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে পারেন। এর ফলে আপনাকে নতুন করে আবার একজোড়া গিনিপিগ কিনতে হয় না এবং আপনিও আইন ভাঙার দায়ে অপরাধী হন না।
এই ছোট্ট, মিষ্টি আইনটা আমাদের কী শেখায়? এটা শুধু একটা দেশের পশুপ্রেমের উদাহরণ নয়, এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভালোবাসা আর সঙ্গের প্রয়োজন সবারই আছে - তা সে মানুষ হোক বা ছোট্ট একটা প্রাণী। একাকীত্ব যে কতটা যন্ত্রণার হতে পারে, তা হয়তো আমরা মানুষরা বুঝি, কিন্তু সুইজারল্যান্ড সেই অনুভূতিটাকে আইন করে সম্মান জানিয়েছে। ওরা প্রমাণ করে দিয়েছে, ভালোবাসা শুধু কবিতা বা গল্পে নয়, দেশের আইনেও জায়গা করে নিতে পারে। তাই পরেরবার যখন আপনার পোষ্যটির দিকে তাকাবেন, শুধু তার খাবার বা স্বাস্থ্যের কথাই ভাববেন না, তার মনের কথাও একটু বোঝার চেষ্টা করবেন। কে জানে, হয়তো সেও আপনার মতোই একজন ভালোবাসার সঙ্গী চাইছে!