ঘটনার প্রেক্ষাপট
আজ থেকে প্রায় ৩২০০ বছর আগের কথা। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের পৃথিবী। চারিদিকে তখন ব্রোঞ্জ যুগের স্বর্ণালী বিকাশ। একদিকে আনাতোলিয়ার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শক্তিশালী হিট্টাইট সাম্রাজ্য, অন্যদিকে ঈজিয়ান সাগরের তীরে মাইসেনিয়ান গ্রিকদের বাণিজ্য আর বীরত্বগাথা। আর নীল নদের তীরে মিশরীয় ফারাওরা তখন গড়ে তুলেছেন নতুন সাম্রাজ্যের অকল্পনীয় ঐশ্বর্য। বিশাল বিশাল পিরামিড, জাঁকজমকপূর্ণ মন্দির আর জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় পৃথিবী তখন এক স্থিতিশীল পথে হাঁটছে। মনে হচ্ছিল, এই সভ্যতাগুলোর শক্তি বুঝি অনন্তকাল ধরে টিকে থাকবে।
কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ বড়ই অদ্ভুত। ভূমধ্যসাগরের শান্ত নীল জলরাশির গভীরে তখন এক ভয়ঙ্কর ঝড় দানা বাঁধছিল। এমন এক ঝড়, যা ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সাম্রাজ্যের পর সাম্রাজ্য, মুছে দেবে শহরের পর শহর। কেউই জানত না, একদল অজানা, পরিচয়হীন নৌ-যোদ্ধা তাদের হিংস্র ঢেউ নিয়ে আছড়ে পড়তে চলেছে সভ্যতার ঠিক самомূলে। এদের কোনো নির্দিষ্ট নাম ছিল না, ছিল না কোনো পরিচিত ভূখণ্ড। মিশরীয়রা তাদের নাম দিয়েছিল ‘সমুদ্র থেকে আসা বিদেশি’ বা ‘সি-পিপল’ (Sea Peoples)। আর এই নামটাই যেন ইতিহাসের বুকে এক জমাট বাঁধা আতঙ্ক হয়ে রইল।
রহস্যের জাল
হঠাৎ করেই যেন সব ওলটপালট হয়ে গেল। খ্রিস্টপূর্ব ১৩শ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূল জুড়ে নেমে এল এক নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ। হিট্টাইট সাম্রাজ্যের গর্ব, তাদের রাজধানী হাতুসা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। সমৃদ্ধ বন্দরনগরী উগারিত থেকে আসা এক মাটির ফলকে পাওয়া যায় তার শেষ রাজার আকুতি, যেখানে তিনি সাইপ্রাসের রাজার কাছে সাহায্য চেয়ে লিখছেন, "শত্রুর জাহাজ এসে গেছে...তারা আমার শহরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে আর ভয়ঙ্কর সব কাজ করেছে।" চিঠিটা শেষ হওয়ার আগেই হয়তো শহরটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
মাইসেনিয়ান গ্রিসের প্রাসাদগুলো একে একে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। সাইপ্রাস, কেনানসহ লেভান্টের উপকূলীয় শহরগুলো একই পরিণতির শিকার হলো। কারা ছিল এই আক্রমণকারীরা? তাদের শক্তি কতটা ভয়ঙ্কর ছিল যে প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যগুলোও তাদের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছিল? মিশরীয় ফারাও তৃতীয় রামেসিসের মেডিनेट হাবু মন্দিরের গায়ে খোদাই করা ছবি ও লিপি থেকে এই রহস্যময় যোদ্ধাদের সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। সেই ছবিতে দেখা যায়, মাথায় পালক লাগানো শিরস্ত্রাণ পরা, ধারালো তলোয়ার আর গোল ঢাল হাতে একদল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। তাদের জাহাজের বহর ছিল বিশাল, আর তাদের আক্রমণের ধরন ছিল নির্মম।
তারা শুধু লুঠতরাজ করতে আসেনি। মিশরীয় লিপি অনুযায়ী, তারা তাদের পরিবার ও মালপত্র গরুর গাড়িতে চাপিয়ে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। এর থেকে বোঝা যায়, তারা ছিল এক যাযাবর শক্তি, যারা পুরনো সভ্যতাকে ধ্বংস করে নতুন বসতি স্থাপন করতে চেয়েছিল। তাদের এই সংঘবদ্ধ আক্রমণ এতটাই আকস্মিক এবং বিধ্বংসী ছিল যে, তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোও কিছু বুঝে ওঠার আগেই পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। মিশরীয় রেকর্ড অনুযায়ী, পেলসেট, শেরডেন, শেকেলেশ, লুকা, তেরেশ-এর মতো বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল এই ‘সি-পিপল’ জোট। কিন্তু এদের আসল উৎস কোথায় ছিল, তা আজও এক বিরাট রহস্য।
ফারাও তৃতীয় রামেসিসের শাসনামলে (আনুমানিক ১১৮৬-১১৫৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এই ভয়ঙ্কর শক্তি মিশরের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছায়। রামেসিস তার মন্দিরের লিপিতে উদ্ধতভাবে ঘোষণা করেন, "কোনো দেশই তাদের অস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারেনি।" সি-পিপল স্থল ও জল—দুই পথেই মিশর আক্রমণের ছক কষেছিল। সভ্যতার শেষ প্রদীপটি তখন নিভু নিভু। সকলের মনে একটাই প্রশ্ন, মিশর কি পারবে এই অজেয় শক্তিকে রুখে দিতে?
সত্যের উন্মোচন
তৃতীয় রামেসিস ছিলেন এক বিচক্ষণ যোদ্ধা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সরাসরি সমুদ্রে এই ভয়ংকর নৌ-যোদ্ধাদের সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন হবে। তাই তিনি এক অভিনব ফাঁদ পাতলেন। তিনি সি-পিপলদের নৌবহরকে নীল নদের বদ্বীপের সরু খাঁড়ির ভেতরে আসতে দেন। যখনই শত্রুপক্ষের জাহাজগুলো ফাঁদে প্রবেশ করে, মিশরীয় নৌবহর তাদের ঘিরে ফেলে এবং তীর থেকে лучন্দাজরা বৃষ্টির মতো তীর ছুড়তে শুরু করে।
ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত এই নৌ-যুদ্ধ, যা ‘ব্যাটল অফ দ্য ডেল্টা’ নামে পরিচিত (আনুমানিক ১১৭৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), তাতে সি-পিপলদের ভয়ঙ্কর পরাজয় ঘটে। তাদের জাহাজগুলো উল্টে দেওয়া হয়, অনেককে বন্দী করা হয়, এবং বাকিরা নিহত হয়। স্থলযুদ্ধেও রামেসিসের বাহিনী তাদের পরাজিত করে। মিশর রক্ষা পায়, কিন্তু এই জয়ের জন্য তাকে বিপুল মূল্য দিতে হয়েছিল। এই যুদ্ধের পর মিশর অর্থনৈতিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে তাদের নতুন সাম্রাজ্যের গৌরব ধীরে ধীরে অস্তমিত হতে শুরু করে।
কিন্তু সি-পিপলদের কী হলো? মিশরীয়দের হাতে পরাজিত হওয়ার পর তারা যেন ইতিহাসের পাতা থেকে উধাও হয়ে যায়। আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, তারা কোনো একক জাতি ছিল না, বরং বিভিন্ন গোত্রের এক জোট ছিল। ধারণা করা হয়, তীব্র খরা, দুর্ভিক্ষ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তারা নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছিল। পেলসেট নামক গোষ্ঠীটি, যাদেরকে বাইবেলের ফিলিস্তিনীয়দের পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়, তারা কেনানের দক্ষিণ উপকূলে বসতি স্থাপন করে। অন্য গোষ্ঠীগুলো হয়তো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।
সি-পিপলদের আক্রমণ ব্রোঞ্জ যুগের সুসংগঠিত বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। তাদের কারণে হিট্টাইট সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়, মাইসেনিয়ান গ্রিস এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করে এবং সমগ্র পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য ও সংস্কৃতি শত শত বছরের জন্য পিছিয়ে যায়। তারা কারা ছিল, ঠিক কোথা থেকে এসেছিল—এই প্রশ্নের قطعی উত্তর আজও মেলেনি। তারা ইতিহাসের এক রহস্যময় স্রোত, যা এসে এক স্বর্ণালী সভ্যতাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, আর রেখে গেছে একরাশ অমীমাংসিত প্রশ্ন।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)